Follow us

প্যারিস হামলাঃ সন্ত্রাসবাদের নতুন মোড়

রোহান গুণারত্না, মন্তব্য প্রতিবেদন
2015-11-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সাধারন মানুষ।
প্যারিসে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের শ্রদ্ধা জানাচ্ছে সাধারন মানুষ।
এএফপি

গত শুক্রবার প্যারিস হামলার ঘটনা তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘ মেয়াদী প্রভাব ফেলেছে। প্যারিস-স্টাইল এই হামলার মডেল ভবিষ্যতে আইসিস ও তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী আল-কায়দা ও অন্যান্য জঙ্গি গ্রুপের জন্য অনুসরনীয় হয়ে উঠতে পারে।

প্যারিস দিয়েই শুরু হলো সিরিয়ান জঙ্গিদের প্রত্যাঘাত। এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকা থেকে আগত সিরিয়া ভ্রমনকারী ও যুদ্ধে অংশগ্রহনকারীরা যখন নিজ দেশে ফিরে যাবে তা হবে নতুন হুমকি ও ঝুঁকির ঘটনা।

ফিরে আসা জঙ্গিদের সক্ষমতাকে পর্যবেক্ষণ ও অনলাইনে তাদের প্রভাব বিস্তার রোধের জন্য ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলির তুলনায় এশিয়া-আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির তুলনামূলক দূর্বলতা আরো ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে।

এশিয়ায় আইসিসের আনুগত্য ঘোষণাকারী প্রায় অর্ধ শত গ্রুপের উত্থান ঘটেছে। যারা এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলেও বিস্তার ঘটাতে পারে।


‘যারা শিক্ষা গ্রহন করতে চায় তাদের জন্য সতর্ক বার্তা’

প্যারিসে ১৩ নভেম্বরের আক্রমনে ১২৯জন নিহত হয়েছে, আহত ৩৫২ তারমধ্যে ৯৯ জন অন্তত গুরুতরভাবে আহত। সংঘটিত এই আক্রমন ক্যাফেতে-স্টেডিয়ামে-কনসার্ট হলে যা ছিলো ২০০৮ সালের মুম্বাই আক্রমনের হুবুহ অনুকরণ। সেখানেও ক্যাফে, রেল স্টেশন, হোটেলে ও হাসপাতালে আক্রমন চালানো হয়েছিল।

দুটি ক্ষেত্রেই আত্নঘাতী হামলাকারী স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র বহন করে এবং লোকজনকে আটকে রেখে বন্দি করে ঠান্ডা মাথায় হত্যাকাণ্ড ঘটায়। দুটি ঘটনারই পরিকল্পনা করা হয়েছে পাশ্ববর্তি প্রতিবেশি দেশ থেকে। প্যারিসের ক্ষেত্রে বেলজিয়াম থেকে, মুম্বাই-এর ক্ষেত্রে পাকিস্তান থেকে। যে পরিকল্পনাকে সনাক্ত ও নজরে রাখা ছিলো দুঃসাধ্য।

প্যারিস আক্রমনের দায় স্বীকার করে হামলাকারীদের আইএস বর্ননা করেছে ‘তাদের খেলাফতের বিশ্বস্ত একটি সৈন্যদল’ এবং ‘পাপী ও বেশ্যালয়ের রাজধানীকে তারা লক্ষ্য করেছে’।

তারা আরো বলেছে, ‘যারা ফ্রান্সের পথ অনুসরণ করবে তারা ইসলামিক স্টেটের লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় থাকবে...এই হামলা  ঝড়ের শুরু মাত্র,যারা শিক্ষা গ্রহন করতে চায় তাদের জন্য সতর্ক বার্তা’।

আইএস নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ডের বাইরে তাদের ইউরোপীয় নেটওয়ার্ক ফ্রান্সে আঘাত হানার মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করলো।


মোড় ফেরা

হামলাকারীরা দেখাতে পেরেছে আইএসের আক্রমনের সক্ষমতা, ইরাক ও সিরিয়ার বাইরে দূর দেশে। তাদের নির্মমতায় প্রতিফলিত হয়েছে আইএসের মনস্থিরতা ও নিজস্ব রীতির। তাদের আরো হামলার হুমকিতে প্রদর্শিত হয়েছে ফ্রান্সে নির্বাসিত উত্তর-আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসী কমিউনিটির বিদ্রোহী অবস্থান থেকে সামরিকীকরণের রূপান্তর।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো নয়, তবে ইউরোপের নির্বাসিত মুসলিম অভিবাসীরা বিচ্ছিন্ন ছিটমহলে বাস করে। তাদের একটি সামান্য অংশ আল-কায়দা ও আইএসের আদর্শে গভীরভাবে প্রভাবিত।

ইউরোপ সব সময় মানবাধিকারকে নিরাপত্তার উর্ধে স্থান দিয়ে এসেছে। কিন্তু প্যারিসের ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে ইউরোপে সন্ত্রাসবাদের টার্নিং পয়েন্ট। এই আক্রমনের ফলে সেখানে এমন সব কঠিন আইন চালু হবে তাতে অভিবাসীদের আটকের ক্ষেত্রে ও তাদের মৌলিক অধিকার অর্জনের ক্ষেত্রে ও অভিবাসী হবার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে।

আক্রমনের পূর্ব মূহুর্ত পর্যন্ত সিরিয়া ও ইরাক থেকে আগত শরনার্থীদের ব্যপারে ইউরোপে মিশ্র-প্রতিক্রিয়া ছিল।কিন্তু এখন, জার্মানী চাপের মধ্যে পড়লো অন্যান্য ইউরোপীয়দের অবস্থানে সামিল হতে এবং দূর্গ হিসেবে গড়ে তোলার ইউরোপীয় ধারনায় যুক্ত হতে।

মুম্বাই-এর মতোই প্যারিস ছিলো হাইব্রীড আক্রমনের ক্ষেত্র, যেখানে আক্রমনকারীরা দুই দক্ষতা নিয়ে অংশ নিয়েছে। সশস্ত্র এবং আত্নঘাতী। যখন কেউ অস্ত্রের সঙ্গে আত্নঘাতী প্রবনতাকে যুক্ত করে আক্রমন চালায় তখন সাধারন পুলিশের ইউনিট অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। তারা এই অতি মনোবল সম্পন্ন সন্ত্রাসীদের অস্ত্র ও আত্নঘাতী বোমা শরীরে বাধা অবস্থায় আক্রমনকে প্রতিহত করার প্রশিক্ষণ পায় নি।

সন্ত্রাসীদের প্রতিহত করতে হলে মারার জন্য ও মরার জন্য ইচ্ছুক হতে হবে। আরো উন্নত প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র প্রাপ্ত বিশেষ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।সন্ত্রাসবাদী তরঙ্গ মোকাবেলা করার জন্য বিশ্বব্যাপী সরকারসমূহকে বিশেষ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে।

নরম লক্ষ্য

১০ মাস আগে জানুয়ারীতে শার্লি হেবদো আক্রমনের সময় ফ্রান্সের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দূর্বলতা ধরা পড়ে। এর আগে ফান্স কূটনৈতিক ও সরকারী স্থানের সুরক্ষার দিকে নজর দিয়েছে, কিন্তু আইএস লক্ষ্য বস্তু করেছে সাধারন কমিউনিটি ও বিনোদন কেন্দ্র গুলো।

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এখন কমিনিটিকেও যুক্ত করতে হবে কোথাও কেউ সন্দেহজনক ব্যাপার দেখলে বা টের পেলে তারা যেন সহজেই খবর দিতে পারে।
প্রতিটি আক্রমনের পেছনে অনেকগুলি ধারাবাহিক কার্যক্রম থাকে। প্রপাগান্ডা, নিয়োগ, অর্থায়ন, যান-বাহনের ব্যবস্থা, নিরাপদ আশ্রয়, প্রশিক্ষণ, যোগাযোগ, ভ্রমন, একাধিক পরিচয়, লক্ষ্যবস্তু পর্যবেক্ষণ ও মহড়া। সর্বসাধারনের নজদারী ও সতর্কতায় অভ্যস্ততা বাড়িয়ে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসীদের তৎপরতা আক্রমনের আগেই সনাক্ত করা সম্ভব।

কোনো সন্ত্রাসী আক্রমন সফল হয়না, যদিনা কমিউনিটি সেটা সমর্থন করে। কমিউনিটি তাদের রসদ যুগিয়ে থাকে। সরকার এবং সন্ত্রাসী উভয়ে তাদেরকে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।যদি সন্ত্রাসীরা তাদের উগ্র আদর্শ কমিউনিটিতে ছড়িয়ে দিতে পারে, তাহলে তারা সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে, প্রচার চালায়, সমর্থন দেয় ও অংশ নেয় সন্ত্রাসী কাজে অন্য কোনো কমিউনিটির বিরুদ্ধে বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে।

প্রতিটি সফল সন্ত্রাসী আক্রমন একটি করে গোয়েন্দা ব্যর্থতা। ফ্রান্সে পর পর দুটি ঘটনায় সেখানকার জনগন নিরপত্তা ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাতেই বলবে। এই পরিবর্তনে শুধু মাত্র মানব গোয়েন্দা ক্ষমতা বাড়ালেই হবে না, বাড়াতে হবে প্রযুক্তিগত ক্ষমতা।

সরকারের লোকজন আইএসের যোগাযোগের ভাষা বুঝতেই পারে না। সরকার যেনো আইন করে উদ্যোগ নেয় সিলিক্যান ভ্যালীর প্রযুক্তি কোম্পানীগুলোকে নিরাপত্তার নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে সক্রিয় করতে যাতে সন্ত্রাসীদের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মনিটর করতে সক্ষম হয়।


এশিয়ার জন্য করনীয়

পশ্চিমা ও পূর্বের উভয় অঞ্চলের দেশগুলি আইএসের ঝুঁকির মুখে। কোনো দেশ বাদ নেই।

প্যারিসে সাফল্যের পর যারা আইএসের সাথে প্রতিযোগিতা করছে, বিশেষ করে আল-কায়দা ইউরোপের বাইরে আঘাত হানতে পারে। মধ্যপ্রাচ্য উত্তর-আফ্রিকা ও এশিয়ায়  ব্যপক ভ্রমন ও যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন হুমকির বিস্তার ঘটতে পারে। আইএসের আদর্শ মুসলমানদের সামান্য অংশকে অনুপ্রানিত করতে পারে টরন্টো থেকে প্যারিস, জাকার্তা থেকে সিডনীতে থাকা কাউকে।

এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের সরকারগুলোকে কাউন্টার টেরোরিজম মোকাবেলায় অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা নিয়মিত শেয়ারের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এর বাইরে, কমিউনিটিকে সক্রিয় ও সচেতন করে তোলা ও সন্ত্রাসীদের পূনর্বাসন প্রক্রিয়ার কৌশল নিতে হবে। অনলাইনে আরো দক্ষ প্রচার-প্রপাগাণ্ডা চালাতে হবে যাতে উগ্রবাদের দিকে কেউ ঝুকে না যায়। সরকার যখন কচ্ছপের মতো চলে সন্ত্রাসীরা তখন গতি লাভ করে।

ফ্রান্সও ব্যতিক্রম নয়, বিশ্বব্যাপী সরকারসমূহের কোনো প্রস্তুতি নেই কিংবা অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিয়ে বসে আছে, তাতে আইএসের  যোগাযোগ ও ঘরোয়া সৃষ্ট সন্ত্রাসীদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা সম্ভব নয়। এইসব আক্রমন সরকারসমুহের ব্যর্থতার পরিনতি। কৌশল নিতে হবে সাংঘর্ষিক এলাকাগুলোকে স্থিতিশীল করা এবং পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াকে বিস্তার না হতে দেয়া।

সারা বিশ্বকেই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে এইসব মানবতা বিরোধী সন্ত্রাসবাদী দল ও ব্যক্তিবিশেষের তৎপরতা প্রতিহত করার জন্য।

*রোহান গুণারত্ন সিঙ্গাপুরে এস রাজারত্নম স্কুল অফ ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োল্যান্স এন্ড টেরোরিজম রিসার্চ-এর প্রধান হিসেবে কর্মরত।
*মন্তব্য প্রতিবেদন মূলত লেখকের নিজস্ব, বেনার নিউজের মতামত নয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন