Follow us

এটিএম বুথ জালিয়াতির অভিযোগে ছয় ইউক্রেনের নাগরিক গ্রেপ্তার

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-06-04
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
 এটিএম বুথে জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলনের অভিযোগে ছয়জন ইউক্রেনের নাগরিক গ্রেফতার। ঢাকা ৪ জুন, ২০১৯।
এটিএম বুথে জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলনের অভিযোগে ছয়জন ইউক্রেনের নাগরিক গ্রেফতার। ঢাকা ৪ জুন, ২০১৯।
ছবি: ডিএমপি ফেসবুক পেইজ

ডাচ বাংলা ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে টাকা উত্তোলনের অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়েছেন ইউক্রেনের ছয় নাগরিক ।  তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মোট সাত ইউক্রেনীয় নাগরিক বাংলাদেশ থেকে টাকা চুরি করে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলো। তাদের একজনকে এখনও ধরা সম্ভব হয়নি।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১ জুন সন্ধ্যায় রাজধানীর খিলগাঁও তালতলা এলাকার ডাচবাংলা ব্যাংকের একটি বুথ থেকে জালিয়াতি করে টাকা উত্তোলন করার সময় ইউক্রেনের এক নাগরিককে আটক করেন বুথের নিরাপত্তাকর্মী ও জনতা। পরে তাকে পুলিশের হাতে সোপর্দ করা হয়।

তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে পান্থপথের হোটেল ওলিও ড্রিম হ্যাভেনে অভিযান চালিয়ে তার সহযোগী আরও পাঁচ নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- ভ্যালেনটাইন (পাসপোর্ট নম্বর ইওয়াই ০৫১৫৬২), ওলেগ (পাসপোর্ট নম্বর ইএক্স ০৮৯৯৬৩), ডেনিস (পাসপোর্ট নম্বর এফএল ০১৯৮৩৪) নাজেরি (পাসপোর্ট নম্বর এফটি ৫০০৫০১), সারগি (পাসপোর্ট নম্বর এফএইচ ৪২৪৩৯৪) ও ভোলোবিহাইন (পাসপোর্ট এফটি ৩৭৯৯৮৩)।

তবে ভিটালি (পাসপোর্ট নম্বর এফই ৮০৪৪৪৮) নামে আরেক ইউক্রেনিয়ান পালিয়ে গেছে।  তাকে ধরার জন্য রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক হোটেলগুলোতে অভিযান চালানো হচ্ছে বলে বেনারকে জানান ডিবি পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মাহবুবুল আলম। তিনি বলেন, “আটক ছয় নাগরিককে জিঞ্জাসাবাদ করার জন্য রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। তবে ঈদের পর তাদের জিঞ্জাসাবাদ করা হবে। তারা কেউ ইংরেজি বলতে পারে না। রুশ ভাষায় কথা বলে।”

মাহবুবুল আলম আরও বলেন, “রুশ ভাষা বলতে পারে এমন একজন দোভাষীকে তাদের জিঞ্জাসাবাদে সহয়তার জন্য ভাড়া করেছি। উনি ঈদের জন্য ঢাকার বাইরে গেছেন। ঈদের ছুটির পর আমরা ওদের জিঞ্জাসাবাদ করবো।”

তিনি বলেন, “এরা কোন কিছু বলছে না। আমাদের কাছে মনে হচ্ছে এরা খুব উঁচু স্তরের অপরাধী। এরা সহজে কিছু বলবে না।”

মাহবুবুল আলম বেনারকে বলেন, “এরা ডিসকাউন্ট নামের এক ধরনের কার্ড ব্যবহার করে এটিএম মেশিনের সাথে সার্ভারের সংয়োগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর রোমিং মোবাইল ফোনে কল করে ইউক্রেনে অবস্থানকারী হ্যাকারদের নির্দেশনা মোতাবেক এটিএম মেশিন থেকে টাকা উত্তোলন করে।”

তিনি বলেন, তারা আইফোন ব্যবহার করে যেগুলো আনলক করার জন্য আমরা ঢাকার সবচে নামকরা টেকনিশিয়ানদের সহয়তা নিয়েছি। কিন্ত তারা বলছে, এই ফোন আনলক করলে ভেঙ্গে যাবে।

ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা রয়ে গেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে সরকার গঠিত তদন্ত কমিটির অন্যতম সদস্য ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ বেনারকে বলেন, “বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্ত চলেছেই। সেই তদন্ত কবে শেষ হবে তার কোন ঠিক নেই। সেকারণে অনেকের মধ্যে এই ধারণা জন্মেছে যে, এখান থেকে টাকা চুরি করা সহজ। অর্থা বাংলাদেশ একটি ‘ইজি ফিশিং গ্রাউন্ড’।”

তিনি বলেন, “সেকারণে বিদেশি হ্যাকাররা এখানে টাকা চুরি করতে আসছে। ইউক্রেনিয়ানরা ধরা পড়েছে। এর আগে নাইজেরিয়াসহ অন্যান্য আফ্রিকান দেশের নাগরিকরা বাংলাদেশে এসে বিভিন্ন ব্যাংকের এটিএম মেশিন থেকে জালিয়াতি করে টাকা তুলতে গিয়ে ধরা পড়েছে।”

এটিএম মেশিন থেকে টাকা তোলার প্রযুক্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, “একজন ব্যবহারকারী যখন তার কার্ড এটিএম মেশিনে প্রবেশ করিয়ে পাসওয়ার্ড দেয় তখন ওই এটিএম মেশিনের কম্পিউটারের সাথে সার্ভারের সংযোগ স্থাপিত হয়। গ্রাহক যখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থের আদেশ দেয় ওই পরিমাণ টাকার বেশি অর্থ থাকলে তখন কেন্দ্রীয় সার্ভার এটিএম মেশিনের ওই কম্পিউটারকে টাকা বের করে দেয়।”

তিনি বলেন, “ইউক্রেনিয়ান ও রাশিয়ার হ্যাকাররা প্রযুক্তিতে অনেক শক্ত। তারা টাকা তুলতে গিয়ে যে কাজটি করেছে সেটি হলো তারা কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এটিএম মেশিনের কম্পিউটারের কমান্ড নিয়ে নিয়েছে। এরপর তাদের ইচ্ছামত টাকা তুলেছে। ''

তিনি বলেন, “একজন গ্রাহককের টাকা তোলা, টাকার পরিমাণ দেখা ছাড়া আর অন্যকোন কিছুর জন্য এটিএম মেশিনে অ্যাকসেস থাকা উচিৎ নয়।”

অধ্যাপক কায়কোবাদ বলেন, “আমরা প্রযুক্তির ক্ষতিকর দিক এবং ঝুঁকিগুলোকে বিবেচনায় না নিয়ে খুব তাড়াতাড়ি অনলাইনে গেছি। অনলাইনে রুপান্তরিত করলে কি কি ঝুঁকি আসতে পারে সেগুলো মাথায় না রেখে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ডিজিটালাইজড করা হয়েছে।”

তিনি বলেন, “তার ফলাফল হলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ চুরি। এরপর মাঝে মধ্যেই নাইজেরিয়া এবং অন্যান্য আফ্রিকার দেশের নাগরিকরা এটিএম বুথ থেকে টাকা জালিয়াতি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। সুতরাং, আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখনও ঝুঁকি রয়েছে।”

তার মতে, “সাইবার নিরাপত্তার এই ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হলে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা। বাংলাদেশের যেসকল বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স পড়ানো হয় সেখানকার শিক্ষক, গবেষকদের নিয়ে আমাদের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও সুরক্ষিত করার উপায় বের করতে হবে।”

এদিকে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বেনার নিউজের কাছে দাবী করেন, “ইউক্রেনের নাগরিকের এটিএম মেশিন থেকে অবৈধভাবে টাকা তোলার ঘটনার সাথে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের হাত রয়েছে। এখানে আমরা হিডেন কোবরার সংশ্লিষ্টতা পেয়েছি।”

উল্লেখ্য, মোল্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির অপরাধ বিষয়ক অংশের তদন্তের সাথেও সংশ্লিষ্ট।

তিনি বলেন, “নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবের টাকা চুরিতে এই হিডেন কোবরার সংশ্লিষ্টতা আছে।”

 

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন