Follow us

টাকা ফেরত পাওয়ার স্বার্থে তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করলেন না অর্থমন্ত্রী

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-09-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন। ফাইল ফটো।
ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন। ফাইল ফটো।
বেনার নিউজ

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার বিষয়ে আবারও পিছু হটলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বৃহস্পতিবার প্রতিবেদনটি প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও একদিন আগে বুধবার অর্থমন্ত্রী আরও সময় চাইলেন।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর অর্থমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, বৃহস্পতিবার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। আগেও তিনি কয়েকদফা আগাম তারিখ ঘোষণা করে শেষমেষ পিছিয়ে যান।

“টাকা ফেরত পাওয়ার স্বার্থে এবং কৌশলগত কারণে তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বৃহস্পতিবার প্রকাশ হচ্ছে না,” সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত। বুধবার সচিবালয়ে ক্রয় কমিটির বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী এই তথ্য জানান।

অর্থমন্ত্রী আরও জানান, রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম এই মুহূর্তে প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তাই একটু সময় নেওয়া হচ্ছে।

“টাকা যেহেতু ফেরত আসছে এবং ফিলিপাইনের আদালতে বাংলাদেশের করা মামলার রায় যেহেতু আমাদের অনুকূলে আসছে, তাই একটু সময় নেওয়া হবে,” জানান আবুল মাল আবদুল মুহিত।

20160921-Finance-Minister300.jpg

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ছবি: অর্থ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট

পাইপলাইনে আরও ৮০ মিলিয়ন ডলার থাকার কথা উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, “সেটিও আমরা ফেরত পাবো। তাছাড়া যে টাকা সেদেশের ক্যাসিনোতো গেছে তাও আমরা ফেরত আনার চেষ্টা করছি।”

মুহিত বলেন, “আমাদের তরফ থেকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্টকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতকে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পাওনা টাকা ফেরত না দিয়ে তিনি আসবেন না।”

তবে রিজার্ভ চুরির মাধ্যমে বেরিয়ে যাওয়া পুরো টাকা ফেরত আসবে কিনা, তা নিয়ে অবশ্য অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় আছে।

“কিছু টাকা ফেরত পাওয়া গেলেও বাকি টাকা কোথায়, কার কাছে আছে তা চিহ্নিত করা যায়নি। অতএব, ওই টাকা উদ্ধার করাটা সহজ হবে না,” গত সোমবার বেনারকে জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

গত ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে সরিয়ে নেয় সাইবার অপরাধীরা। এর মধ্যে ২ কোটি ডলার শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুরুতেই আটকে দিয়ে পরে তা ফেরত দেয়।

বাকি ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশনের জুপিটার শাখার কয়েকটি হিসাব থেকে চলে যায় দেশটির ক্যাসিনোতে। ফিলিপাইনের বিভিন্ন সংস্থা চুরি যাওয়া অর্থের কিছু অংশ নানাভাবে উদ্ধার করে। ইতিমধ্যে গত সোমবার বাংলাদেশকে দেড় কোটি ডলার ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে ফিলিপাইনের একটি আদালত।

এ ঘটনায় গত ১৫ মার্চ সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডিও বিষয়টি তদন্ত করছে।

সরকারের তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সুইফটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক লেনদেন করে আসছে। কিন্তু গত বছরের জুনে সুইফট প্রস্তাব প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট বা আরটিজিএস (আর্থিক লেনদেনর আরেকটি ব্যবস্থা) চালুর প্রস্তাব দেয়। এই পদ্ধতিতে দেশের ভেতর ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লেনদেন করা যায়।

“আরটিজিএস পদ্ধতি সুইফটের সঙ্গে যুক্ত করায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এন্টি ভাইরাস সিস্টেম সরিয়ে ফেলা হয়। আর এরই মাধ্যমে বাইরে থেকে হ্যাকিংয়ের সুযোগ সৃষ্টি হয়,” বেনারকে জানান মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ওই গভর্নর আরও বলেন, “আরটিজিএস চালু করাটা অপ্রয়োজনীয় ছিল। সুইফট কেন এই প্রস্তাব দিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংক কেন এর ভালোমন্দ পর্যালোচনা না করে এবং কারিগরি দিকগুলো খতিয়ে না দেখে তা গ্রহণ করল, এটা বিস্ময়কর ব্যাপার মনে হয়।”

তাঁর মতে, শুধু অভ্যন্তরীণ লোক দিয়ে এই চুরি সংঘটিত করা সম্ভব নয়, অবশ্যই বাইরের লোকজন যুক্ত আছে।

সিআইডি মূলত অর্থ চুরির ক্ষেত্রে ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা খতিয়ে দেখছে। এ প্রসঙ্গে সিআইডির পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহেল বাকি বেনারকে জানান, “বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু ত্রুটি ও দুর্বলতা ছিল। যারা দায়িত্বে ছিলেন তারা ইচ্ছাকৃতভাবে না তাদের অজ্ঞতা বা অনভিজ্ঞতার কারণে এতোবড় ঘটনা ঘটেছে, তা এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।”

এ ঘটনায় কারা দায়ী, তা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে আরও দুই তিন মাস সময় লাগবে বলে জানান সিআইডির ওই কর্মকর্তা।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় সাংসদ আব্দুল ওয়াদুদ দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ জানতে চান।

এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, “ওই ঘটনায় যাদের সন্দেহ করা হচ্ছে তাদের অন্য বিভাগে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি তদন্তে দেখা যায়, তাদের সম্পৃক্ততা ছিল, তাহলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে”।

ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরি প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়ে অবদান রেখেছেন

 

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন