Follow us

বৈদেশিক অনুদান আইন নিয়ে দেশি–বিদেশি সংস্থার উদ্বেগ–উৎকণ্ঠা

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-10-20
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বেসরকারি সংস্থাগুলো বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন বিলে সম্মতি না দেওয়ার দাবি জানায় রাষ্ট্রপতির কাছে। অক্টোবর ০৯, ২০১৬।
বেসরকারি সংস্থাগুলো বৈদেশিক অনুদান রেগুলেশন বিলে সম্মতি না দেওয়ার দাবি জানায় রাষ্ট্রপতির কাছে। অক্টোবর ০৯, ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

বৈদেশিক অনুদানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বিলটি পুনর্বিবেচনা করার দাবি জানিয়ে আসছে দেশের প্রায় সবকটি বেসরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর তিনটি মোর্চা। এই দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিউইয়র্ক ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ।

সবগুলো সংগঠন রাষ্ট্রপতির কাছে বিলটিতে সম্মতি না দেওয়ার দাবি রেখেছিল। কিন্তু গত ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সংসদে পাস হওয়া এই বিলে তাঁর সম্মতি দিয়েছেন। ফলে বিলটি এখন আইনে পরিণত হয়ে গেছে।

বেসরকারি ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আইনটিতে বাক স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন ও সংবিধানে উল্লেখিত মৌলিক অধিকার খর্ব করার মতো বেশ কয়েকটি ধারা-উপধারা রয়েছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে তারা বিলটিতে সম্মতি না দিতে রাষ্ট্রপতির কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের উদ্বেগ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত বুধবার এক বিবৃতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিলটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য জাতীয় সংসদের কাছে অনুরোধ জানায়। এতে বলা হয়, আইনটি কার্যকর হলে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে তাদের সবকিছু অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর কাছে যেতে হবে।

আবার কোন বিষয় অনুমোদনের জন্য কতদিন সময় সে বিষয়ে আইনে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ফলে হয়রানির আশংকা রয়েছে বলে মনে করে এইচআরডব্লিউ।

আন্তর্জাতিক এই মানবাধিকার সংগঠনের পরিচালক (এশিয়া) ব্রাড আডামস বলেন, আইনটি কার্যকর হলে বেসরকারি সংস্থাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। সরকার মুখে বাক স্বাধীনতা ও বহুমতের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বললেও আইনটি কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা করবে বলে মত দেন তিনি।

তিনি বলেন, আইনটি সুশীল সমাজের বিশেষ করে মানবাধিকার সংগঠনের ওপর আঘাত। এনজিওগুলোকে সরকার শত্রুর মতো মনে করছে বলে মত দেন তিনি।

এর আগে গত সোমবার ঢাকা সফররত বার্লিন ভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারপার্সন হোসে কার্লোস উগাজ সানচেজ মোরিনো এই আইনের কারণে নাগরিক সমাজের কথা বলার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

এ প্রসঙ্গে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বেনারকে বলেন, “বেসরকারি সংস্থাগুলো সরকারের অধীনে। তারা সংসদ ও সংবিধান সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলবে বা অবমাননা করবে—এটা হতে পারে না।”

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেন, আইনে কোনো অস্পষ্টতা ও সীমাবদ্ধতা থাকলে বিধি করার সময় সেগুলো দেখা হবে। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন যে, আইন সংশোধনের সুযোগ নেই।

ক্ষোভের শুরু যেখান থেকে

গত বছরের ২৫ অক্টোবর টিআইবির ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান সংসদকে ‘পুতুল নাচের নাট্যশালা’ বলে মন্তব্য করেন। তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংসদে সরকারি ও অকার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।

এই মন্তব্যকে ঘিরে সংসদে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংসদীয় কমিটি টিআইবিকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায়। তবে টিআইবি ক্ষমা চায়নি।

এরপর সংসদীয় কমিটি আইনে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ‘কটাক্ষমূলক মন্তব্য ও অপরাধ’ সম্পর্কিত এই বিধান যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

টিআইবির দিকে ইঙ্গিত করে সুরঞ্জিত বলেন, “এই আইনের পর কোনো বেসরকারি সংস্থা অবমাননাকর মন্তব্য করলে তাদের লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।”

সমালোচনা উদ্বেগ যেসব বিষয়ে

গত ৫ অক্টোবর বিলটি পাস হওয়ার পর কড়া সমালোচনা করছে মানবাধিকার সংগঠন ও বেসরকারি সংস্থাগুলো। গত ৯ অক্টোবর এসব সংস্থা সংবাদ সম্মেলন করে বলেছে, ‘এটা প্রতীয়মান হয়েছে যে, বেসরকারি সংস্থাগুলোর বৈদেশিক অনুদান সংগ্রহ ও ব্যবহারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নামে সরকার মূলত: সার্বিকভাবে স্বেচ্ছাসেবামূলক উদ্যোগকে নিরুৎসাহিত করতে এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করতেই বেশি আগ্রহী।’

বিলটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ, নারী ও শিশু পাচার, মাদক ও অস্ত্র পাচারসহ এমন কিছু অপরাধের উল্লেখ করা হয়েছে, যেগুলোর প্রত্যেকটি বিষয়ে আলাদা আইন আছে। এমনকি ওই সব আইনে মৃত্যুদণ্ডের মতো শাস্তির বিধানও রয়েছে।

যে ধারা নিয়ে বেশি আপত্তি

বিলটিতে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে ১৪ ধারা নিয়ে, যেখানে বলা হয়েছে সংবিধান এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিদ্বেষমূলক ও অশালীন কোনো মন্তব্য করলে প্রচলিত আইনে অপরাধ বলে গণ্য হবে। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো এনজিও বা ব্যক্তিকে সতর্ক হওয়া বা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া থেকে শুরু করে এনজিওটির নিবন্ধন বাতিল, স্থগিত এমনকি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বন্ধের নির্দেশ দিতে পারবেন এনজিও ব্যুরোর মহাপরিচালক।

এসব শাস্তি এনজিওগুলোর রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড, সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদে অর্থায়নসহ বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে আইনে উল্লেখ আছে।

মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বেনারকে বলেন, “আইনটি মানবাধিকার ও সুশাসন নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলোর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগলে এই আইনটির অপব্যবহার ও অপপ্রয়োগ হবে।”

আইনটিতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের জন্য বিদেশ থেকে কোনো ধরনের অনুদান আনতে চাইলে এনজিও বিষয়ক ব্যুরোর অনুমতি নিতে হবে। সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন বন্ধের বিষয়টি মাথায় রেখে আইনটি করা হলেও তা স্বেচ্ছাসেবামূলক বা চ্যারিটি কর্মকাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে বেসরকারি খাত সংশ্লিষ্টরা মত দিচ্ছেন।

“এতে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের জন্য ব্যক্তির মাধ্যমে অনুদান আসার প্রবাহ একদিকে কমতে পারে, অন্যদিকে বাড়তে পারে ব্যাংকের বাইরে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানোর প্রবণতা,” বেনারকে জানান গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী।

এদিকে সুলতানা কামাল মনে করেন, আইনে ব্যক্তি ও সংগঠনকে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর প্রশ্ন—একজন ব্যক্তিকে কেন এনজিও ব্যুরোর অনুমতি নিতে হবে?

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন