গ্রামীণ ব্যাংকের ১২ পরিচালকের নয়টিই শূন্য, আইনি জটিলতা, হাইকোর্টে রিট

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.04.30
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-Yunus গ্রামীন ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ ইউনূস। দারিদ্র বিমোচনে অবদান রাখায়​ নোবেল শান্তি পুরস্কার গ্রহন অনুষ্ঠানে ২০০৬ সালের ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের রাজধানী অসলোয় বক্তৃতা করেন। ১০ ডিসেম্বর,২০০৬ ​
বেনার নিউজ

এবার উচ্চ আদালতে গেছে গ্রামীণ ব্যাংকের নয়জন পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণার বিষয়টি। ২৯ এপ্রিল থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে  অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের কাছে জবাব চেয়েছেন উচ্চ আদালত।

এর আগে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দানের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল জাতীয় রাজস্ব বোর্ড–এনবিআর। এ বিষয়ে তিনি ছয় মাসের জন্য  উচ্চ আদালতের সুরক্ষা পান গত ২ এপ্রিল থেকে।

গত ২৯ এপ্রিল একটি রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের নির্বাচিত নয়জন পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চান হাইকোর্ট।

এর আগে গত ৩০ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয় গ্রামীণ ব্যাংকের নয়জন নির্বাচিত পরিচালকের পদ শূন্য ঘোষণা করে চিঠি দেয়। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি তাঁদের মেয়াদ শেষ হয়। ওই চিঠির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন ব্যাংকের পরিচালক তাহসিনা খাতুন।

“যেহেতু নতুন কেউ নির্বাচিত হননি, সুতরাং আমরাই পর্ষদে থাকব। কারও কাছে তো দায়িত্বটা দিতে হবে। কার কাছে দেব?” বেনারকে জানান তাহসিনা খাতুন।

প্রায় ৯০ লাখ গ্রাহকের গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদ থেকে বয়সের কথা বলে এর প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সরিয়ে দেয় সরকার। এ নিয়ে দেশে ও বিদেশে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। ড. ইউনূসের পর ব্যাংকটির নেতৃত্ব নিয়ে অচলাবস্থা চলছে।

ব্যাংকে এখন পর্যন্ত নিয়মিত ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ দেয়নি সরকার। এর আগে পছন্দের লোক হিসেবে সরকার ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ দেয় খন্দকার মোজাম্মেল হককে। তিনিও ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে প্রায় ১৭ মাস আগে পদত্যাগ করেন। যদিও সরকার বলছে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা হয়নি। এ বিষয়টি নিয়েও ধূম্রজাল রয়েছে। তিনি অফিস করছেন না, কিন্তু গত বছরের অক্টোবরে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সবশেষ সভায় অংশ নেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, সমাজের বিশিষ্ট কয়েকজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগের প্রস্তাব দিয়েও সরকার কাউকেই এই পদ নিতে রাজি করাতে পারেনি।

এখন ভারপ্রাপ্ত এমডি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এস এম মহিউদ্দিন, যিনি মহাব্যবস্থাপক থেকে পদোন্নতি পেয়ে ডিএমডি হয়েছেন। আগের এমডি মোহাম্মদ শাহজাহান অবসরে চলে যাওয়ার পর থেকেই তিনি ভারপ্রাপ্ত এমডি।

গ্রামীণ ব্যাংকের ১২ সদস্যের পর্ষদের মধ্যে সরকারের নিয়োগ দেওয়া দুই পরিচালক হচ্ছেন একজন সচিব এবং বেসরকারি ব্যাংকের একজন এমডি।

বাকি নয়জন নারী সদস্য হলেন চট্টগ্রামের সাজেদা বেগম, সিলেটের মোছাম্মদ সুলতানা বেগম, কুমিল্লার রেহানা আক্তার, গাজীপুরের সালেহা খাতুন, দিনাজপুরের পারুল বেগম, বগুড়ার মেরিনা আক্তার, পটুয়াখালীর মোমেনা খাতুন, যশোরের শাহিদা আক্তার এবং ময়মনসিংহের তাহসিনা খাতুন।

এর আগে ড. ইউনূস ও গ্রামীণের সব প্রতিষ্ঠানের ওপর সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। সাবেক সচিব মামুন-উর-রশীদের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ীই গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচনের নতুন বিধি করা হয়।

ওই বিধি অনুযায়ী পরিচালক নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দিতেও কেউ রাজি হচ্ছেন না। অর্থাৎ গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে সরকার যতগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে, কোনোটিতেই সফল হতে পারেনি।

সরকার গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য গত বছরের ৬ এপ্রিল ‘গ্রামীণ ব্যাংক (পরিচালক নির্বাচন) বিধিমালা’ প্রণয়ন করে। ছয় মাস, অর্থাৎ গত ৬ অক্টোবরের মধ্যে ভোটের মাধ্যমে সরকার ব্যাংকটির পরিচালক নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংককে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকও এ কাজ করতে রাজি হয়নি।

সরকার পরে প্রজ্ঞাপন দিয়ে গত নভেম্বরে বিধিমালা সংশোধন করে বাংলাদেশ ব্যাংককে এ দায়িত্ব থেকে সরিয়ে আনে। সংশোধিত বিধিমালায় বলা হয়, তিন সদস্যের একটি নির্বাচন কমিশন গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন অনুষ্ঠানটি করে দেবে।

এ পর্যন্ত সরকার নির্বাচন কমিশনই গঠন করতে পারেনি। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রামীণ ব্যাংকের পরিচালক নির্বাচন করে দেওয়ার জন্য কোনো অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজই রাজি হচ্ছেন না।

“গ্রামীণ ব্যাংক (পরিচালক নির্বাচন) বিধিমালা অনুসারে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগ পর্যন্ত নির্বাচিত পরিচালকরা দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। তাই তাঁদের পদ খালি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের চিঠি  অবৈধ,” বেনারকে জানান রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী মোস্তাফিজুর রহমান খান।

বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি কাজী মো. ইজারুল হক হক আকন্দের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের বেঞ্চ এ বিষয়ে বুধবার অর্থ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্টদের রুল দেন।

এর আগে ২ এপ্রিল আগামী ছয় মাস ড. ইউনূসের কাছ থেকে  দান কর আদায়ে স্থগিতাদেশ দেন উচ্চ আদালত।

এনবিআর দাবি করে, ২০১১-১২, ২০১২-১৩ ও ২০১৩-১৪ করবর্ষে জমা দেওয়া বার্ষিক আয়কর বিবরণীতে প্রদর্শিত দানের অর্থের ওপর ড. মুহাম্মদ ইউনূস কর দেননি।

এই সময়ে তিনি ৭৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা দান করেছেন। কিন্তু এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, দান কর বাবদ ১৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা জমা করেননি ড. ইউনূস।

এ নিয়ে গত ৫ মার্চ উচ্চ আদালতে রেফারেন্স মামলা করেন ড. ইউনূসের আইনজীবীরা। এই রেফারেন্স মামলার আলোকে উচ্চ আদালত এই স্থগিতাদেশ দিয়েছেন।

“যেহেতু উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে, তাই এনবিআরের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই”,  জানতে চাইলে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যক্তিগত কর পরামর্শক মাহবুবুর রহমান বেনারকে একথা বলেন।

মাহবুবুর রহমান  বলেন,  তিনি (ড.  ইউনূস) বিপুল অর্থ প্রবাসী আয় হিসেবে দেশে এনেছেন, যা করমুক্ত। আর যে টাকা তিনি দান করেছেন, তাতে কর অব্যাহতি দেওয়া রয়েছে।

নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূস এভাবে ব্যক্তিগতভাবে এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশেষায়িত ব্যাংক পদে পদে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

“সরকারের উচিত হবে ব্যাংকটিকে তার মতো করে চলতে দেওয়া,” বেনারকে জানান সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান।

সাবেক এই সচিবের মতে, গ্রামীণ ব্যাংকের পর্ষদ নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের সদস্যদের মতামত ছাড়া যে আইন-কানুন করা হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।