Follow us

বাংলাদেশে বাল্যবিবাহ বাড়ছে, স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে মা ও শিশুরা

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015-06-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার মেয়েরা রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রেসক্লাবেরর সামনে মানববন্ধন করছে, বিভিন্ন নারী সংগঠনের কর্মিরা।৩ ডিসেম্বর,২০১৪
বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে সোচ্চার মেয়েরা রাস্তায় নেমে এসেছে। প্রেসক্লাবেরর সামনে মানববন্ধন করছে, বিভিন্ন নারী সংগঠনের কর্মিরা।৩ ডিসেম্বর,২০১৪
এএফপি

মর্জিনা (ছদ্মনাম)। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগরের গাবুরা ইউনিয়নে একটি গ্রামের মেয়ে। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে আর আর তার পরের বছরেই গর্ভধারণ। ১৪ বছর বয়স কিশোরী মেয়েটি মা হতে গিয়ে অকালেই হারায় তার প্রথম সন্তান। তারপরের বছর আবারও গর্ভধারণ।

কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় জন্ম নেওয়া শিশুটিও পৃথিবীর আলো দেখেনি। বিয়ের চতুর্থ বছরে আবারও মা হন মর্জিনা। এবার বেঁচে যায় তার সন্তানটি।ততদিনে কিশোরী মা মর্জিনার শরীর ভীষণভাবে ভেঙে পড়েছে। অসংখ্য রোগ বাসা বেঁধেছে শরীরজুড়ে। আর বাচ্চাটিরও সারাক্ষণ অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে।

মর্জিনা জানান, তার গ্রামে ১৫ বছর বিয়ের জন্য অনেক বেশি বয়স। বেশিরভাগ মেয়েদের ১৩-তেই বিয়ে দেওয়া হয়।
এমন চিত্র বাংলাদেশের এখনও অধিকাংশ অঞ্চলে, অধিকাংশ গ্রামেই লক্ষ্য করা যায়।

উন্নয়নের অনেক সূচকে ঈর্ষনীয় সাফল্য অর্জন করলেও বাংলাদেশে বাল্য বিবাহের হার এখনো উদ্বেগজনক। ২০১৪ সালে ইউনিসেফের প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাল্যবিবাহের হারে দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষে বাংলাদেশ। এরই মাঝে মেয়েদের বিয়ের বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ করার প্রস্তাব সে উদ্বেগকে কয়েকগুন বাড়িয়ে দেয়।

বিশ্লেষকরা বলছেন দরিদ্রতা, পুরোনো ধ্যান-ধারণা, সামাজিক কাঠামো, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং নিরাপত্তাহীনতাই বাল্যবিবাহের জন্য দায়ী।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, আমাদের বেশিরভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করেন। তারা অজ্ঞতা, সামাজিক সংস্কার আর দরিদ্রতার কবলে পড়ে সন্তানদের অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

ইউনিসেফের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছর বয়স হওয়ার আগেই ৩৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের মধ্যে ৭৪ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে। এদেশে বাল্যবিবাহের গড় হার ৬৫ শতাংশ। ১৫ বছরের কম বয়সী মেয়েদের বিয়ের এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেশি দেশ ভারতের বাল্যবিবাহের গড় হার ৫০ শতাংশ, নেপালে ৫৭ শতাংশ এবং আফগানিস্তানে ৫৪ শতাংশ।

এতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে ১৫ বছরের কম বয়সী বিবাহিত মেয়েদের ২০ শতাংশ ২৪ বছর বয়স হওয়ার আগেই দুই বা ততধিক সন্তানের মা হয়ে যান। এর ফলে প্রসূতি মৃত্যুর হার এবং অপুষ্টিজনিত সমস্যাও বেশি হচ্ছে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেছেন, এখনই বাল্য বিবাহের পরিমান না কমালে নারীর প্রতি সহিংসতা, মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি, অপরিণত গর্ভধারণ, প্রসবকালীন শিশু মৃত্যুঝুঁকি, প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যা, নারী শিক্ষার হার হ্রাস, স্কুল থেকে ঝরে পড়ার হার বৃদ্ধি, নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা ও সুযোগ কমে যাওয়াসহ নানাবিধ নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে।

এছাড়াও সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হবে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।

ড. নেহাল করিম বলেন, “অজ্ঞতা, সংস্কারবদ্ধতার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা এবং আইনের শাসনের অভাবের কারণে সমাজে বাল্য বিবাহের পরিমান বাড়ছে। দেশে সকল অনিয়ম, অন্যায় রোধে আইন আছে। কিন্তু তার প্রয়োগ নেই। সমাজে পেশী শক্তির ব্যবহার বেড়েই চলেছে। তাদের ভয়ে তটস্থ থাকে সাধারণ মানুষ। আইনের শাসন প্রয়োগের মাধ্যমেই কেবল বাল্য বিবাহ সহ সকল অনিয়ম দূর করা সম্ভব। না হলে প্রতিযোগিতার বিশ্বে পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ।”

মেয়েরা বাল্য বিবাহের শিকার বেশি হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, “বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, স্পিকার, সংসদ উপনেতা মহিলা- একারণে দেশের নারী উন্নয়ন ত্বরান্বিত হচ্ছে এমন ধারণা সঠিক নয়। উন্নয়নের পূর্ব শর্ত আইনের শাসন। সেটি না থাকলে সমাজে নানা সমস্যা বিষ ফোঁড়ার মত গজাবে।”

লক্ষ্য করা যায়, বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বাল্য বিবাহের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১৩ বছর বয়স থেকে শুরু হয় মেয়ের বিয়ের তোড়জোড়। মেয়েদের স্কুলমুখী করতে বিনা মূল্যে বই বিতরণ থেকে শুরু করে উপবৃত্তি দেওয়াসহ নানা পদক্ষেপ নিলেও ১৩-১৫ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের হার কমানো যাচ্ছে না। এর অন্যতম কারণ দারিদ্রতা নয়, সামাজিক নিরাপত্তার অভাবও, অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

জানা যায়, বিয়ের ক্ষেত্রে উপযুক্ত বয়স প্রমাণে জন্ম নিবন্ধনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও স্থানীয় নেতাদের সহায়তায় অথবা টাকার বিনিময়ে তা যোগাড় করে থাকে অভিভাবকরা।

মর্জিনার বাবা দিনমজুর আবু ইছা বেনারকে বলেন, “লেখাপড়ায় ভাল না হলেও মর্জিনা দেখতে সুন্দর। এলাকার বখাটে ছেলেরা বিভিন্ন সময় বিরক্ত করত। আর চারিদিকে মেয়েদের ধর্ষণের খবর বাবা হিসেবে আমাকে চিন্তায় ফেলত। তাই মেয়েকে দ্রুত বিয়ে দেই।”
জানা যায়, বড় মেয়ের জীবনে এমন সমস্যার পরেও তিনি তার দ্বিতীয় কন্যা বিলকিসকেও মাত্র ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়েছেন। ১৫ বছর বয়সী বিলকিসও এখন এক সন্তানের জননী।

“অভাবে পড়ে বিলকিসকে শহরে এক বাড়িতে গৃপরিচালিকার কাজে পাঠানো হয়। কিন্তু গৃহকর্তা তাকে যৌন নির্যাতনের চেষ্টা করত। এমনকি তাদের বাড়িতে আসা অতিথিরাও। মেয়ের মুখে এসব অভিযোগ শুনে তাকে কাজে না পাঠিয়ে বিয়ে দিতে বাধ্য হই।” বলেন মর্জিনার মা হাসিনা বেগম।

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বলেন, “সমাজে এ ধরনের সমস্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এসব কারণে বাল্য বিবাহ বাংলাদেশে মহামারি আকার ধারন করেছে। যা নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পাশাপাশি এতে নারীর প্রতি সহিংসতার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এসব বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পাশাপাশি নারীর নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে।”

স্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, অল্প বয়সে মা হওয়ার কারণে শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিকভাবেও ভেঙে পড়েন তারা। পূর্ণ মানসিক বিকাশের আগে মা হওয়ার কারণে সন্তানের প্রতি সঠিক মনোযোগ তারা দিতে পারেন না। ফলে অল্প বয়সী মায়ের সন্তানরা সঠিকভাবে বেড়ে ওঠে না।

হলি ফ্যামেলি হাসপাতালের অধ্যাপক ড. রওশন আরা বলেন, “বিয়ের জন্য মেয়েদের শারীরিক ঘটনের পূর্ণতা অত্যন্ত জরুরি। ১৮ বছরের আগে কোনভাবেই একজন মেয়ের শরীর পূর্ণতা পায় না। অল্পবয়সী মায়েরা নানা ধরনের শারীরিক সমস্যায় ভুগতে থাকেন। রোগাক্রান্ত শিশুরও জন্মের কারণ অল্পবয়সী মা।”

আর মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বাল্যবিবাহের শিকার মানুষ শারীরিক ও মানসিক বিকাশ না হওয়ায় ব্যক্তিত্ব সমস্যায় ভুগতে থাকে। ফলে তারা একসময় রাষ্ট্রের জন্যও সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়।

এ বিষয়ে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ বেনারকে বলেন, “বাল্য বিবাহের শিকার ছেলে কিংবা মেয়ে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ সাধনের আগে বৈবাহিক জীবনে প্রবেশ করায় এক ধরনের মানসিক চাপে পড়ে। এই চাপ এক ধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। তারা উৎকণ্ঠা, বিষন্নতা, সমন্বয়হীনতা প্রভৃতিতে ভুগতে থাকে। যা পরবর্তিতে ব্যক্তিত্ব সমস্যা তৈরি করে। তারা তখন পরিবারের প্রতি, সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সঠিকভাবে পালনে ব্যর্থ হয়। আর তখনই এসব মানুষগুলো রাষ্ট্রের জন্য বোঝা হয়ে যায়।”

গত বছর লন্ডনে অনুষ্ঠিত বাল্যবিবাহ বিষয়ক বৈশ্বিক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অঙ্গীকার করেন, ২০২১ সালের মধ্যে ১৫ বছরের নিচে মেয়েদের বিবাহ বন্ধ করা হবে এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সব ধরনের বাল্যবিবাহ বন্ধ হবে।

এরপরেই ১৯২৯ সালের বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসংক্রান্ত আইনটি যুগোপযোগী করার জন্য আইনের খসড়া করেছে মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যাতে বলা হয়েছে বিশেষ পরিস্থিতিতে অভিভাবক বা আদালতের অনুমতিতে ১৬ বছর বয়সেও মেয়েকে বিয়ে দেওয়া যাবে। ছেলেদের ক্ষেত্রেও বিয়ের বয়স ২১ থেকে কমিয়ে ১৯ করার কথা প্রস্তাব রাখা হয় তাতে। বর্তমানে সে খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ের মতামতের (ভেটিং) জন্য আছে। তবে  আইনটি নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে পড়েছে সরকার।

বাংলাদেশে বাল্য বিবাহ মহামারি আকার ধারণ করেছে উল্লেখ করে মেয়েদের বিয়ের সর্বনিম্ন বয়স কমিয়ে ১৮ থেকে ১৬ করার প্রস্তাব বাতিল করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)।

এইচআরডব্লিউর নারী অধিকার গবেষক হিদার বার বলেন, বাল্যবিবাহ বাংলাদেশে মহামারীর আকার ধারণ করেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পরিস্থিতি আরো খারাপ হচ্ছে। তিনি বলেন, আরেকটি প্রজন্ম হারিয়ে যাওয়ার আগেই সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, “বাল্য বিবাহ শুধু মায়ের স্বাস্থ্য নষ্ট করে না। সমাজের স্বাস্থ্যও নষ্ট করে। তাই দেশের উন্নয়ন করতে হলে বাল্য বিবাহ রোধ করতে হবে। আর বিয়ের বয়স কমানোর সিদ্ধান্ত হবে আত্মঘাতী।”

তবে বাল্য বিবাহ প্রসঙ্গে বিষয়ে নারী ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেছেন, “বিয়ের বয়স কমানোর বিষয়ে প্রস্তাবিত আইনটি মতামতের ভিত্তিতেই চূড়ান্ত করা হবে। ওই আইনে বাল্যবিবাহ যারা করবেন, সেই বিয়ে যারা পরিচালনা করবেন অথবা তা আয়োজনে সম্পৃক্ত থাকবেন, তারা সবাই দণ্ডের আওতায় আনার সুপারিশও আছে। আইনটি পাস হলে সমাজে বাল্য বিবাহের সংখ্যা আরো কমে আসবে। তবে এর পাশাপাশি সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই ধরণের সমস্যা সমাধান করতে হবে। সমাজের পরিবর্তন আনতে হলে যারা নেতৃত্বদানকারী তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।”


তিনি বলেন, “বখাটেদের হাত থেকে মেয়েদের বাঁচাতে বিয়ে কোন সমাধান নয়। এর জন্য প্রশাসনসহ সমাজের সকল স্তরকে সচেতন থাকতে হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন