অনিয়মের অভিযোগে বিএনপি প্রার্থীদের সিটি নির্বাচন বর্জন

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.04.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-citypoll বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ দলীয় প্রার্থী তাবিথ আউয়াল ও মির্জা আব্বাসের স্ত্রীকে নিয়ে নয়াপল্টনের কার্যালয়ে বেলা ১২টার দিকে নির্বাচন বয়কটের ঘোষণা দেন। ২৮এপ্রিল,২০১৫
বেনার নিউজ

নির্বাচনের পরিবেশ ও ফলাফল নিয়ে শেষ পর্যন্ত শঙ্কাই সত্য হয়েছে। ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন অনিয়ম হয়েছে। আর এসব অভিযোগে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সমর্থিত তিন মেয়র প্রার্থী ভোট শুরুর চার ঘন্টার মাথায় নির্বাচন বর্জন করে।

অবশ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বলেছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাপক ভোটার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। এ জন্য তিনি নির্বাচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের মিডিয়া সেন্টারে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে সিইসি বলেন, “আমি ও আমার কয়েকজন সহকর্মী কয়েকটি কেন্দ্র পরিদর্শন করেছি। সাধারণ ভোটারদের কাছে জানতে চেয়েছি ভোট দিতে আসতে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না। ভোট দিতে আসতে কেউ ভয়ভীতি দেখিয়েছে কি না তাও জানতে চেয়েছি। কেউ কোনো অভিযোগের কথা জানাননি।”

শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তিনটি সিটি করপোরেশনেই এগিয়ে আছেন সরকার—সমর্থক মেয়র প্রার্থীরা। এঁরা হলেন ঢাকা উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আ জ ম নাছির। তিন সিটি করপোরেশনে কাউন্সিলর পদেও বিজয়ীদের প্রায় সবাই সরকারি দল সমর্থক।

মঙ্গলবার সকাল আটটায় ভোট নেওয়া শুরু হয়, চলে টানা বিকেল চারটা পর্যন্ত। তবে বিএনপি দুপুর বারোটার দিকে ঢাকায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।

এর কিছু আগে চট্টগ্রামেও নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয় ওই দলটি। সেখানকার বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ মনজুর আলম রাজনীতি থেকেও গতকাল অবসরের ঘোষণা দেন।

“ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবার প্রমাণ হলো, এ দেশের মানুষের ভোটের অধিকার নেই। সুষ্ঠু তো দূরের কথা, নির্বাচন একেবারে অর্থহীন করে দেওয়া হয়েছে,” গতকাল সংবাদ সম্মেলনে জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ।

মওদুদ আহমেদ বলেন, “সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আমরা সেনা মোতায়েনের দাবি জানিয়ে আসছিলাম। নির্বাচন কমিশন প্রথমে এই সিদ্ধান্ত নিলেও পরে সরকারের মন রক্ষা করতে গিয়ে জানায়, সেনাসদস্যরা প্রস্তুত থাকবেন। তবে ডাকলে তাঁরা যাবেন।”  

তিন সিটি করপোরেশনের এই নির্বাচন ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি ছিল শঙ্কা। সকালে ভোট শুরুর পর নানা জায়গা থেকে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ আসতে থাকে। কিছু কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ স্থগিত হয়।

বিএনপির বাইরে আরও কয়েকজন মেয়র প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের কথা জানান। তাঁরাও নির্বাচনে বিভিন্ন কেন্দ্র দখল, পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া, ব্যালটবাক্স দখল, জালভোট, ভোটারদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।

“আমরা ভোট কেন্দ্রে ঢুকে দেখি আমাদের ভোট অন্য কেউ দিয়ে দিয়েছেন। এরপর আমরা ক্ষোভ প্রকাশ করেও প্রতিকার পাইনি,” বেনারকে জানান কাউন্সিলর প্রার্থী এস এম নাজিমউদ্দিনের ভাবি আসিয়া সুলতানা বিথী।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সুরিটোরা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের ভোটার তিনি। প্রার্থীর স্ত্রী ফিরোজা বেগম ও ভাবি বিথী ভোট দিতে না পেরে এসময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

“আমরা মহল্লার মেয়ে, মহল্লার বউ। দেবরকে ভোট না দিতে পারলে কাউকে ভোট দিতে দেব না,” ক্ষোভের সঙ্গে জানান বিথী। এরপর তিনি প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ বাঁধা দেওয়ায় ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান।

একতরফা এ নির্বাচনে সরকার সমর্থকেরা বিরোধী কর্মীদের বেশিরভাগ ভোটকেন্দ্রের কাছেই আসতে দেননি। অনেকটা ফাঁকা মাঠে প্রশাসনের সহযোগিতায় উন্মুক্ত কারচুপি করেছেন তাঁরা। কোথাও কোথাও কারচুপিতে অংশ নিয়েছেন কর্তব্যরত নির্বাচন কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদস্যরাও।

বিএনপি কিংবা তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকেরা এই পরিস্থিতি প্রতিরোধ করা তো দূরের কথা, কোনো প্রতিবাদও করতে পারেনি। সেই সুযোগে সরকার সমর্থকেরা কারচুপির প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে অনেকগুলো কেন্দ্রে নিজেদের মধ্যে সংঘাতেরও সৃষ্টি করেন।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অধীন কবি নজরুল কলেজ কেন্দ্রে এমনই এক সংঘর্ষের মধ্যে আটকে পড়েছিলেন ঢাকায় কর্মরত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত। পরে বিজিবি গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার পর রাষ্ট্রদূত সেখান থেকে বের হন।

এ ছাড়াও একাধিক কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ও দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ঢাকা উত্তরের কাফরুল কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী মাহমুদা আক্তার ও বিদ্রোহী প্রার্থী মতি মোল্লার সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়।

পুরান ঢাকায় বাংলাদেশ ললিতকলা একাডেমি কেন্দ্রে ভোটারদের ওপর এক সাংসদের গানম্যানের গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে। তাতে অন্তত একজন আহত হয়েছেন।

এ সব ঘটনার তথ্য ও চিত্র সংগ্রহ করতে গণমাধ্যমকর্মীদের বাধা দিয়েছেন সরকার সমর্থকেরা।  কোনো কোনো কেন্দ্রে তাঁদের মারধর করা হয়েছে। এ সব ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা ছিল সরকার সমর্থকদের অনুকূলে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ঢাকা ও চট্টগ্রামে অন্তত ২০ জন সাংবাদিক অপ্রীতিকর ঘটনার মুখে পড়েছেন বা লাঞ্ছিত হয়েছেন।

চট্টগ্রামে কয়েকটি কেন্দ্রে ককটেল বিস্ফোরণ ও সংঘাতের ঘটনা ঘটে। ঢাকা ও চট্টগ্রামের একাধিক কেন্দ্রে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিতও রাখতে হয়।

অবশ্য এই অবস্থার মধ্যেও অনেক কেন্দ্রে ভোটাররা গিয়ে ভোট দিতে পেরেছেন। সকাল থেকে দুপুর ১১টা পর্যন্ত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া সব কেন্দ্রেই ভোটাররা গিয়ে নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন।

বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় কূটনীতিকদের মধ্যে এক ধরনের স্বস্তি এসেছিল। স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হলেও তা সবার অংশগ্রহণমূলক হওয়ায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তাঁরা আশাবাদী হয়েছিলেন। কিন্তু গতকাল নির্বাচনের হালচাল দেখে তাঁরা হতাশ হয়েছেন বলে তাঁদের মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে।

মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া স্টিফেন্স ব্লুম বার্ণিকাট গতকাল এক টুইট বার্তায় বলেছেন, “যে কোনোভাবে জেতা প্রকৃতপক্ষে কোনো জয় নয়।”

যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত রবার্ট গিবসন এক টুইট বার্তায় বলেছেন, “নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে সুস্পষ্টভাবে অবাধ ও নিরপেক্ষ করা নিশ্চিত করতে সব দলকে অবশ্যই ভবিষ্যত নির্বাচন নিয়ে একসঙ্গে কাজ করা উচিৎ।”

মার্কিন দূতাবাসও এক বিবৃতিতে হতাশা ব্যক্ত করে নির্বাচনে অনিয়মের সব ঘটনার স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি বলে মন্তব্য করেছে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।