ক্ষমতাসীন দলের তিন নেতা ‘বন্দুকযুদ্ধে’ খুন হওয়ায় তোলপাড়

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.08.19
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-crossfire হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সাংবাদিক সম্মেলনে ছাত্র লীগ নেতা আরজু হত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ১৯ আগষ্ট,২০১৫
বেনার নিউজ

বরাবরের মতো দাগী অপরাধী কিংবা বিরোধী শিবিরের কোনো নেতা-কর্মি নয়, এবার খোদ ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতা র‍্যাবের কথিত ক্রসফায়ারের শিকার হলেন।

রাজধানীতে ছাত্রলীগের বর্তমান নেতা  আরজু মিয়া ও মাগুরায় সাবেক নেতা মেহেদী হাসান আজিব কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।  এ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে ক্ষোভ চলাকালে  মঙ্গলবার যুবলীগ নেতা জাকির হোসেনকে একইভাবে হত্যার অভিযোগ ওঠে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বেনারকে বলেন, ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর থেকে ২০০৪ পযর্ন্ত দেশে তেমন ক্রসফায়ার ছিল না। ২০০৪ সালের পর থেকে এ পযর্ন্ত কথিত বন্দকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে নিহতের সংখ্যা দেড়হাজার অতিক্রম করেছে।

গত তিনদিনে র‌্যাব ও পুলিশের সঙ্গে কথিত যুদ্ধে অন্তত তিনজন নিহত হলেন, যারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মী।

র‌্যাব-পুলিশের কথিত যুদ্ধের ঘটনাগুলোকে হত্যাকাণ্ড দাবি করে আসছিল বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো, এমনকি সুশীল সমাজও। এবার ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের মধ্য থেকে একই অভিযোগ উঠল।

নিহতদের  স্বজনেরা বলেছেন, তাঁদের ধরে নিয়ে হত্যা করে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র নাটক সাজানো হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মাঠ পর্যায়ের নেতারা বলছেন, তাঁরা বিচারবহির্ভূত এসব হত্যাকাণ্ড মেনে নেবেন না।

অবশ্য এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে অবস্থান নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বুধবার বলেছেন, “কয়েকটা বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। সে বন্দুকযুদ্ধে কয়েকজন মারা গেছে। আমরা কোনো সন্ত্রাসীকে ছাড় দেব না।”

আর সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। অ্যাকশন শুরু হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য বেনারকে  বলেন, “কেউ খারাপ কাজ করলে দল তাকে ছাড় দেবে না।”

কিছুদিন ধরে সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় একাধিক খুনোখুনির ঘটনা ঘটেছে।

গত এক সপ্তাহে বাড্ডায় ঝুট ব্যবসা নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে আওয়ামী লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের তিন নেতা হত্যা, জাতীয় শোক দিবসের দিন কুষ্টিয়ায় এক যুবলীগ নেতা হত্যা, চাঁদপুরের কচুয়ায় চাঁদার দাবিতে স্কুলের শিক্ষক ও ছাত্রীদের ওপর যুবলীগের হামলা, হাজারীবাগে ছাত্রলীগ নেতার এক কিশোরকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

এর আগে মাগুরায় ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে মায়ের পেটে শিশু গুলিবিদ্ধ হওয়ার মতো ঘটনাও ঘটে।

আইনশৃঙ্খলার অবনতিশীল পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের আশ্রয় নিচ্ছেন বলে  অভিযোগ করেছেন  আইনও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। গণমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে বুধবার তিনি এ অভিযোগ করেন।


আরজু মিয়া

রাজধানীর হাজারীবাগে গত মঙ্গলবার ভোর সাড়ে চারটার দিকে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা যান হাজারীবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি আরজু মিয়া (২৮)। রাজা মিয়া (১৬) নামে এক কিশোরকে চুরির অভিযোগে পিটিয়ে হত্যার প্রধান আসামি ছিলেন আরজু মিয়া।

হাজারীবাগ থানা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনায় নিন্দা ও ক্ষোভ জানানো হয়েছে। এর সভাপতি ইলিয়াসুর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক সাদেক হামিদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, আরজু মিয়াকে সামান্য অজুহাতে র‌্যাবের কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছে। তাঁরা এই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চেয়েছেন।

“শিশুহত্যার ঘটনায় আমরা শোকাহত। কিন্তু চুরির অপরাধে সাধারণ আমজনতা তাকে গণপিটুনি দিয়েছে। দোষ পড়েছে ছাত্রলীগ নেতার ওপর,” বেনারকে জানান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান।

তারপরও সে যদি দোষী হয়ে থাকে, তবে তদন্তের মাধ্যমে যথাযোগ্য শাস্তি হওয়া উচিত।  কিন্তু বিচারবহির্ভূত এই হত্যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না বলে মত দেন সাইফুর রহমান।

নিহতের ভাই মাসুদ রানা বেনারকে বলেন, “আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে আগে কোনো মামলা ছিল না, জিডিও নেই। তাঁকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।”


মেহেদী হাসান

গত ২৩ জুলাই মাগুরায় ছাত্রলীগের গোলাগুলিতে মায়ের জঠরে শিশু গুলিবিদ্ধ ও একজন বৃদ্ধ নিহত হওয়ার মামলার দুই নম্বর আসামি মেহেদী হাসান ওরফে আজিবর শেখ (৩৪) সোমবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে মাগুরার পুলিশের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

আজিবরের বাবা আবদুল মালেক পক্ষাঘাতগ্রস্ত মুক্তিযোদ্ধা। আজিবরের বৃদ্ধ মা রূপবান বেগম  সাংবাদিকদের বলেন, “আমার স্বামী দেশ স্বাধীন করে কী করল?  ওই রাজনীতি করতি যাইয়েই তো আমার ছেলেডার জীবন গেল।”

আজিবরের স্ত্রী হুসনে আরা দম্পতির চার বছর ও আড়াই বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে ।


জাকির হোসেন

কুষ্টিয়ায় শোক দিবসের অনুষ্ঠানে যুবলীগকর্মী সবুজ হত্যা মামলার সন্দেহভাজন এক আসামি জাকির হোসেন (৩০) মঙ্গলবার গভীর রাতে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন।

নিহত যুবলীগ নেতা জাকির হোসেনের বাড়ি মিরপুর উপজেলার আহাম্মদপুর গ্রামে।

সবুজ হত্যা মামলা ছাড়াও জাসদ নেতা পাঞ্জের হত্যা মামলার অন্যতম আসামি ছিলেন তিনি।

পুলিশ বলছে, জাসদ নেতা পাঞ্জের হত্যার প্রধান আসামি দুলালের ‘ডান হাত’ ছিলেন জাকির। তিনি দুলালের ‘অবৈধ অস্ত্রের কারবারেও’ জড়িত ছিলেন।


কেউ বিশ্বাস করে না

র‌্যাব ও পুলিশের বন্দুকযুদ্ধে বা ক্রসফায়ারে নিহতের ঘটনাগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড দাবি করে তার বিরুদ্ধে বরাবরই সরব দেশি ও বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

“সবচেয়ে বড় কথা ক্রসফায়ারের এসব গল্প অবিশাস্য, সাধারণ মানুষও এই গল্প বিশ্বাস করে না। এটা বিশ্বাসযোগ্য করতে চাইলে কথিত অভিযানের সময় ম্যাজিস্ট্রেট বা বিশ্বাসযোগ্য কাউকে সঙ্গে নেওয়া উচিত,” বেনারকে জানান ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

তবে পুলিশ সদর দপ্তরের সাম্প্রতিক এক বক্তব্যে বলা হয়, ক্রসফায়ারের ঘটনাগুলো নির্বাহী বিভাগ তদন্ত করে এ পযর্ন্ত বিচারবহিভূর্ত হত্যার কোনো  প্রমান পায়নি।


আইন ও সালিশ কেন্দ্র

গত কয়েকদিনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কয়েকজন নিহত হওয়ার পর বুধবার এক বিবৃতিতে মানবাধিকার সংগঠন আইনও সালিশ কেন্দ্রের  নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন,  “সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কথায় এবং আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর কাজে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, “বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। এ ধরনের পদক্ষেপ সন্ত্রাসীদের মদদদানকারী ক্ষমতাবানদের রক্ষার প্রচেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়।”

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে সেই ব্যবস্থা আইনানুগভাবে পালন করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনটি।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।