Follow us

মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে অপপ্রচার রোধে নতুন আইন

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-08-22
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়। আগস্ট ২২, ২০১৬।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পাস করা হয়। আগস্ট ২২, ২০১৬।
ইয়াসীন কবির

মুক্তিযুদ্ধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালে অথবা এ ধরনের অপপ্রচারে মদদ দিলে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে ডিজিটাল আইনের খসড়া প্রস্তুত করা হয়েছে, যার প্রাথমিক অনুমোদনও দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

নতুন ওই আইনে, যেকোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে জাতির জনক, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, আদালত কর্তৃক মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত মীমাংসিত কোনো বিষয়ে প্রচারণা বা প্রোপাগান্ডা চালালে উল্লেখিত শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।

গত প্রায় দুই বছর ধরে প্রস্তুতির পর গতকাল সোমবার আইনের খসড়াটি মন্ত্রিসভার বৈঠকে ওঠানো হয়। মন্ত্রিসভা এটি ভেটিংসাপেক্ষে প্রাথমিক অনুমোদন দিয়েছে।

তবে আলোচিত এই আইনটি অন্য কয়েকটি আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় আরও পর্যালোচনা করার পরামর্শ দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ও এর সংশোধনীগুলো বাতিল করে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। “এই নতুন আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সাইবার অপরাধ বন্ধ করা,” সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাদ

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের বিতর্কিত ৫৪, ৫৫, ৫৬ ও ৫৭ ধারা ওই আইন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে আইসিটি আইনে ইতোমধ্যে দায়ের হওয়া মামলাগুলো ওই আইন অনুযায়ী চলবে।

সাংবাদিক প্রবীর সিকদারকে গ্রেপ্তার, রিমান্ড এবং পরবর্তী সময়ে একইভাবে দ্রুতগতিতে জামিনের ঘটনায় তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের এসব ধারা বাতিলের দাবি ওঠে।এগুলোর মধ্যে চরম বিতর্কিত হচ্ছে ৫৭ ধারা।

২০০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে প্রণীত এই আইনের ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে: ‘কোনো ব্যক্তি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন, যাহা মিথ্যা ও অশ্লীল বা সংশ্লিষ্ট অবস্থা বিবেচনায় কেহ পড়িলে, দেখিলে বা শুনিলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হইতে উদ্বুদ্ধ হইতে পারেন অথবা যাহার দ্বারা মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে বা করিতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করা হয়, তাহা হইলে তাহার এই কার্য হইবে একটি অপরাধ।’

খসড়া পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আইসিটি আইনের এই ৫৭ ধারায় অপরাধের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং শাস্তির মাত্রাও কমেছে।

বিএনপি আমলের আইনটির ৫৪, ৫৬, ৫৭ এবং ৬১ ধারার অপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১০ বছর কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা জরিমানা। ওই আইনটি রহিত করে নতুন আইনের ১৯ ধারায় মানহানি, মিথ্যা অশ্লীল ও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার জন্য শাস্তি কমিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর কারাদণ্ড, দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ ছাড়া ৫৭ ধারার অপরাধ সম্পর্কে নতুন আইনের ১৯ ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইটে বা ইলেকট্রনিক বিন্যাসে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধি অনুযায়ী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মানহানি ঘটালে তা অপরাধ বলে গণ্য হবে।

নতুন আইনে আরও বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইটে বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক বিন্যাসে মিথ্যা বা অশ্লীল কিছু সম্প্রচার করলে এবং তা মানুষের মনকে বিকৃত, দূষিত করলে, মর্যাদাহানি ঘটালে বা সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করলে তা অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে।

এ ছাড়া স্বেচ্ছায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করলে তা অপরাধ হবে, তবে ব্যতিক্রম হিসেবে বলা হয়েছে, প্রকৃত ধর্মীয় উদ্দেশ্য সংরক্ষণের জন্য এই ধারা প্রযোজ্য হবে না।

“স্বরাষ্ট্র, তথ্য, মুক্তিযুদ্ধ, ডাক ও টেলিযোগাযোগসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,” বেনারকে জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি আরও বলেন, আইনটি নিয়ে যাতে বিভ্রান্তি না হয় এবং স্বচ্ছতা থাকে সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।

জেলজরিমানায় ভরপুর আইন

খসড়া আইনে অতি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো বা রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সাইবার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি ১৪ বছর, সর্বনিম্ন ২ বছর; ১ কোটি টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

কম্পিউটার, মোবাইল ও ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধ করলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর, সর্বনিম্ন এক বছর; তিন লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া কম্পিউটার বা মোবাইলে প্রতারণা ও হুমকি, প্রতারণা বা ঠকানোর উদ্দেশ্যে অন্যের তথ্য ব্যক্তিগত বলে দেখানো, পর্নোগ্রাফি, মানহানি, শত্রুতা সৃষ্টিসহ বিভিন্ন ধরনের সাইবার অপরাধের জন্য আলাদা শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে নতুন আইনে।

কোনো ব্যক্তির বিনা অনুমতিতে ছবি তুললে বা তা প্রকাশ করলে দুই বছর জেল, দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় শাস্তির বিধান থাকছে।

খসড়া আইনে ডিজিটাল নিরাপত্তা এজেন্সি গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। যার প্রধান থাকবেন একজন মহাপরিচালক, যিনি জরুরি পরিস্থিতিতে যেকোনো সম্প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে পারবেন।

আইনজ্ঞদের আপত্তি

“ভাবমূর্তি কতটা ক্ষুণ্ন হয়েছে, ইজ্জতে কতটা আঘাত লেগেছে, মানের কয় সের হানি ঘটেছে ইত্যাদি পরিমাপ করা যায় না। এসব অপরাধের জন্য তাই কারাদণ্ড দেওয়ার বিধান থাকা উচিত নয়,” বেনারকে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।

তিনি বলেন, কারো কথায় বা লেখায় কারো মনে কী আঘাত লেগেছে, পুলিশ যদি তার পেছনে দৌড়াতে থাকে বা ভাবমূর্তি রক্ষার দায়িত্বে গোয়েন্দা নিয়োজিত থাকে, তাহলে তা দুঃখজনক। কথায় কথা শাস্তির বিধান থাকলে বাক স্বাধীনতা থাকে না।

আইনের এই খসড়া তৈরির সঙ্গে জড়িত তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মোস্তফা জব্বার বেনারকে বলেন, “আমরা ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ক্ষুণ্ন না হয় সেটি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছি।”

অসংগতি দূর করতে পর্যালোচনা

“আইনটি প্রাথমিক অনুমোদন দেওয়ার কারণ হচ্ছে অন্যান্য আইনের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য বিধান করা। এ ছাড়া বিভিন্ন অপরাধের জন্য শাস্তির যে মাত্রা প্রস্তাব করা হয়েছে, সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা,” বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম।

তবে মোস্তফা জব্বার বলেন, এই আইনটি একটি সামগ্রিক আইন।এটা কার্যকর করতে চাইলে বেশ কয়েকটি পুরোনো আইন বদলাতে হবে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন