পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.12.15
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-du পাকিস্তানের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছিন্ন করল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
অনলাইন

পাকিস্তানের সঙ্গে  সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের  সিন্ডিকেট। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ১৪ ডিসেম্বর, যেদিন শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস।

একাত্তরে  পরাজয়ের মুর্হূর্তে ১৪ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে বেশ কয়েকজন শিক্ষককে ধরে নিয়ে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসররা। ২৫ মার্চ কালোরাতেও তাদের  হামলার  মূল লক্ষ্য  ছিল  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নয় মাস সারা দেশে হত্যাযজ্ঞের পাশাপাশি ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর তাদের বিশেষ নজর ছিল।

বিভিন্ন তথ্যসূত্র থেকে এক হাজার ৭০ জন শহীদ বুদ্ধিজীবীর তালিকা পাওয়া যায়। শহীদদের এ কাতারে আছেন কবি-সাহিত্যিক, লেখক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, গবেষক ও শিক্ষাবিদরা, যাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করে হানাদার ও তাদের দোসররা। তাঁদের তুলে নেওয়া হয় ঘর বা দপ্তর থেকে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রয়েছেন  শিক্ষক মুনীর চৌধুরী, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী, আনোয়ার পাশা (বাংলা সাহিত্য), গোবিন্দ চন্দ্র দেব (দর্শনশাস্ত্র), আবুল খায়ের (ইতিহাস), জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, হুমায়ূন কবীর, রাশিদুল হাসান (ইংরেজি সাহিত্য), সিরাজুল হক খান (শিক্ষা), এ এন এম ফাইজুল মাহী (শিক্ষা), সাজিদুল হাসান (পদার্থবিদ্যা), ফজলুর রহমান খান (মৃত্তিকা বিজ্ঞান), এন এম মনিরুজ্জামান (পরিসংখ্যান), এ মুকতাদির (ভূ-বিদ্যা), শরাফত আলী (গণিত), এ আর কে খাদেম (পদার্থবিদ্যা), অনুদ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য (ফলিত পদার্থবিদ্যা), এম এ সাদেক, এম সাদত আলী (শিক্ষা), সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য, গিয়াসউদ্দিন আহমদ (ইতিহাস), এম মর্তুজা (চিকিৎসক) প্রমুখ।

তাঁদের অনেকের ক্ষতবিক্ষত লাশ ১৬ ডিসেম্বরের পর বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়। এ ক্ষেত্রে মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমির কথা উল্লেখযোগ্য। অনেকেরই সন্ধান আজও মেলেনি।

" আমরা বলে আসছি-পাকিস্তানের কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠান, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় বা কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পহেলা ডিসেম্বর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো ধরনের সম্পর্ক রক্ষা সম্ভব নয়," বেনারকে জানান সিন্ডিকেট সভাপতি ও উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।

সিন্ডিকেটে  বিস্তারিত আলোচনা পর সম্পর্কচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

"একই ধরনের পদক্ষেপ যেন অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নেয়, সেজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত দেশের ৩৭টি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে জানানোর পরিকল্পনা রয়েছে," বেনারকে  জানান  বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেডারেশনের সভাপতি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ, যিনি সিন্ডিকেটেরও একজন  সদস্য।

গতকাল সোমবার বেলা ৩টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে জরুরি সিন্ডিকেট বৈঠক শুরু হয়।  সভায় পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের প্রস্তাব তোলা হয়, বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত চলে এই বৈঠক।

বৈঠক শেষে  উপাচার্য সাংবাদিকদের জানান, পাকিস্তানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশটির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'যত ধরনের সম্পর্ক রয়েছে', তা ছিন্ন করার বিষয়ে সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গত ২২ নভেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী বদর বাহিনী প্রধান আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকরের পর 'উদ্বেগ' প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় পাকিস্তান। এরপর ঢাকায় পাকিস্তানি হাই কমিশনারকে ডেকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে 'কড়া প্রতিবাদ' জানানো হয়।

এর এক সপ্তাহের মধ্যে পাকিস্তানও বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে ডেকে একাত্তরে গণহত্যার দায় অস্বীকার করে।

উপাচার্য বলেন, "অথচ এসব ঘটনার প্রত্যক্ষ প্রমাণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে। এই প্রত্যক্ষ প্রমাণ সারা পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভগুলোতে আছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও একাত্তরের ঘটনার প্রমাণ  রয়েছে। তারপরও  এই ধরনের মিথ্যাচার দুঃখজনক ।”

"ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে এ ধরনের মিথ্যার সঙ্গে আপোষ করা অসম্ভব ব্যাপার," বলে মন্তব্য করেন তিনি।

"বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র  হিসাবে আজ গবর্বোধ করছি। এটা সময়োপযোগি সিদ্ধান্ত ," বেনারকে  জানান  ঢাকা  বিশ্ববিদ্যালয়ের  সাবেক ছাত্র ও একটি  বেসরকারি  কলেজের  শিক্ষক এস এম সালাউদ্দিন   ।

সিন্ডিকেট বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আরেফিন বলেন, “ সিন্ডিকেটের প্রথম সিদ্ধান্ত হচ্ছে- একাত্তরে গণ্যহত্যার জন পাকিস্তান নিঃস্বার্থ ক্ষমাপ্রার্থনা না করা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা কোনো কিছুর সঙ্গে আর সর্ম্পক থাকবে না”।

'এমনকি গবেষণা বিষয়েও কোনো ধরনের সম্পর্ক নয়,' জানিয়ে উপাচার্য বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ছাত্র প্রতিনিধি, শিক্ষক প্রতিনিধি, শিক্ষক-ছাত্র বিনিময় প্রতিনিধি এবং যেসব স্মারক চুক্তি হয়েছে, সেগুলো আজ থেকে সব স্থগিত।"

তার মতে , "বুদ্ধিজীবীদের হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত, ৩০ লক্ষ মানুষ হত্যার সঙ্গে যারা জড়িত-তাদের দেশ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র পাকিস্তান।"

“সেই পাকিস্তান যখন বলে একাত্তরে কোনো গণহত্যা ঘটেনি এবং কোনো গণহত্যার সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা জড়িত নয়-তখন আমরা বুঝতে পারি যে, একাত্তরে যারা গণহত্যা চালিয়েছিল এদেশে তারা দ্বিতীয় বার গণহত্যা চালাচ্ছে।”

অধ্যাপক আরেফিন বলেন, পাকিস্তানের সরকারের  গঠিত হামিদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টসহ পাকিস্তানে বহু পত্রপত্রিকা ও নথিপত্রে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার প্রমাণ রয়েছে ।

ত্রিদেশীয় চুক্তি অনুযায়ী, গণহত্যায় নেতৃত্ব দেওয়া যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত পাক বাহিনীর ১৯৫ সেনা সদস্যের বিচার করার শর্তে ফেরত দেওয়া হলেও স্বাধীনতার পর ৪৪ বছরেও তাদের বিচারের ব্যবস্থা করেনি পাকিস্তান।

এ প্রসঙ্গে  আরেফিন সিদ্দিক বলেন, “তাই আমাদের সিদ্ধান্ত-ওই ১৯৫ জনের বিচার করতে হবে, একইসঙ্গে এদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাদের মরনোত্তর বিচার করতে হবে।”

পাকিস্তানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় ও কূটনৈতিক সম্পর্কসহ সব ধরনের সম্পর্কচ্ছেদের জন্য সরকারের প্রতিও অনুরোধ জানান তিনি।

এছাড়া জাতিসংঘ ও সার্কসহ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থায় পাকিস্তানের সদস্যপদ বাতিলের দাবি জানাতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় সিন্ডিকেটের সভা থেকে ।

সভায় বলা হয়, সার্ক চার্টারেও রয়েছে এক দেশ অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করবে না। কিন্তু যখন মানবতাবিরোধীদের বিচার হচ্ছে, বিচার প্রক্রিয়া চলছে-তখন পাকিস্তান বক্তব্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেছে।

এদিকে গণহত্যার দায় অস্বীকার করার ঘটনাকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে পাকিস্তানের ‘নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ’ আখ্যায়িত করে দেশটির সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জানিয়ে আসছে  গণজাগরণ মঞ্চ, সেক্টর  কমান্ডাস ফোরাম, একাত্তরের  ঘাতক  দালাল  নির্মূল কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যরা।


যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত হবে

আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকরের পর থেকে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার  দাবি উঠেছে।

প্রয়োজনে আইন পরিবর্তন করে যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেছেন, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের কারণে জামায়াতে ইসলামীকেও নিষিদ্ধ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।   

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৪৪তম বার্ষিকী উদযাপনের আগে যখন জামায়াত নিষিদ্ধ ও যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্তের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে, তখনই মন্ত্রীর এই বক্তব্য এলো।

মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “সকল যুদ্ধাপরাধীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বর্তমান সংবিধানে না হলে প্রয়োজনে তা পরিবর্তন করে যুদ্ধাপরাধীদের সকল সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হবে।”

বাংলাদেশে জামায়াতের ‘রাজনীতি বন্ধেরও’ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ধর্মীয় দল হিসেবে নয়, যুদ্ধপরাধী দল হিসেবে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হবে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।