তাড়া খেয়ে অনলাইনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে হিযবুত তাহরির

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.08.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-hizbut রাজধানীর দক্ষিণখানের আইনুসবাগ মসজিদে লিফলেট বিতরণের সময় হিযবুত তাহরিরের দুই সদস্যকে আটক করে ঢাকা মহানগর পুলিশ । আলতামাস আহম্মেদ ওরফে বাবু (বামে) ও জানে আলম ওরফে রুবেল। আগষ্ট,২০১৫
বেনার নিউজ

আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তাড়া খেয়ে এখন অনলাইনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ ঘোষিত হিযবুত তাহরিরের সদস্যরা। আগামি ৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন সম্মেলন করবে এমন প্রচারণা চালাচ্ছে তারা। লিফলেট বিতরনকালে রোববার ধরা পড়েছে দুইজন।

আবার হিযবুতের সাবেক কর্মীদের অনেকেই বিভিন্ন নামের উগ্র জঙ্গি সংগঠনে যোগ দিয়েছে বলে তথ্যপ্রমাণ রয়েছে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাছে।

সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া আনসারুল্লাহ বাংলাটিমের বেশ কয়েকজন সদস্য হিযবুতের সাবেক কর্মী বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার দায়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০০৯ সালে হিযবুতকে নিষিদ্ধ সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করে। তবে এর পরের ছয় বছর ধরেই বাংলাদেশে হিযবুতের নানা কার্যক্রম চলেছে।

মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল করে, দেওয়ালে পোস্টার লাগিয়ে নিজেদের অস্তিত্বের বার্তা দিচ্ছে সংগঠনটি। সর্বশেষ রাজধানীর দেওয়ালে ৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন সম্মেলনের ঘোষণা দিয়ে পোস্টার সেঁটেছে নিষিদ্ধ ওই সংগঠনটি।

গত রোববার বিকেলে রাজধানীর দক্ষিণখানের আইনুসবাগ মসজিদে লিফলেট বিতরণের সময় হিযবুত তাহরিরের  দুই  সদস্যকে আটক করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরা হচ্ছে আলতামাস আহম্মেদ ওরফে বাবু ও জানে আলম ওরফে রুবেল।

“ গ্রেপ্তার দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা গেছে, আগামী ৪ সেপ্টেম্বর তাঁরা অনলাইনে একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছে। সে জন্য প্রচারণার কাজ করছিল তাঁরা,”  বেনারকে জানান ডিবির উপকমিশনার (উত্তর) শেখ নাজমুল আলম।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে অনেক সদস্য একসঙ্গে যুক্ত হয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টিকে হিযবুত তাহরির অনলাইন সম্মেলন হিসেবে বলছে।

“এভাবে লাইভ স্ট্রিমিং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একসঙ্গে অনেক লোক যুক্ত থাকতে পারেন, এটা সম্ভব, ” বেনারকে জানান অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল্লাহ ওরফে কাজল।

৪ সেপ্টেম্বর অনলাইন সম্মেলনের ঘোষণা দিয়ে এর মধ্যেই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার দেওয়ালে পোস্টার লাগিয়েছে হিযবুত তাহরির। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি (মিরপুর রোডের দিকে) এলাকার দেওয়াল থেকে পোস্টারের ছবি তুলে ফেসবুকে পোস্ট করেছেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম।

ফেসবুকে দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, সায়েন্সল্যাব ছাড়াও রাজধানীর কলাবাগান, ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুরের কাটাসুর এলাকায় হিযবুতের পোস্টার তাঁর চোখে পড়েছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের এই ধরণের প্রকাশ্য কর্মকাণ্ড উদ্বেগজনক বলে মনে করেন তিনি।

“আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় ফিজিক্যালি সংগঠিত হতে না পেরে হিযবুত এখন অনলাইনকে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। শুধু যোগাযোগ নয়, তাঁরা সাংগঠনিক আনুষ্ঠানিকতাগুলোও অনলাইনে পালনের চেষ্টা করছে,”  বেনারকে জানান উপ কমিশনার শেখ নাজমুল আলম।

পরিবর্তিত পরিপ্রেক্ষিতে  ডিবিও অনলাইনে হিযবুতের কার্যক্রমের ওপর নিবিড় নজরদারী করছে বলে মন্তব্য করেন উপকমিশনার নাজমুল। প্রয়োজনে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।


ইসলামী চিন্তাবিদরা কিছু বলতে চান না

এদিকে যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিতে হিযবুত আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে ইসলামী দল বা চিন্তাবিদদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া রয়েছে, তবে প্রকাশ্যে তারা কিছু বলতে চান না।

“ইসলামের চার খালিফা যে আঙ্গিকে রাষ্ট্র চালিয়েছেন তাই খেলাফত রাষ্ট্র ব্যবস্থা। এই ধরণের রাষ্ট্রে একজন খলিফা দেশ পরিচালনা করবেন পুরো কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে। যেখানে আইন, আদালত, অর্থ ব্যবস্থা সবই হবে শরীয়া ভিত্তিক, ” বেনারকে জানান ইসলামী ঐক্যজোটের মহাসচিব মুফতি ফয়জুল্লাহ।

হিযবুত তাহরির ঘোষিত খেলাফত ব্যবস্থা সম্পর্কে মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন,  “আমি ওদের লক্ষ্য সম্পর্কে সেভাবে জানি না। তা ছাড়া  নিষিদ্ধ সংগঠন সম্পর্কে কিছু বলা ঠিক না।”

তবে নাম  প্রকাশ না করার শর্তে একজন চিন্তাবিদ বলেন,  “জামায়াতে ইসলামী যেভাবে ইসলামের কথা বলে মানুষের সমর্থন লাভের চেষ্টা করছে হিযবুতের ধরণটাও একই। এগুলো সব ক্ষমতা লাভের বুলি মাত্র। ”

ওই চিন্তাবিদকে নাম প্রকাশের অনুরোধ জানালে তিনি বলেন,  “বোঝেন তো নিষিদ্ধ সংগঠন। ওদের বিরুদ্ধে কিছু বললে পরে আমার কিছু হলে তার দায় নেওয়ার জন্য তো আপনাকে (প্রতিবেদকক) খুঁজে পাওয়া যাবে না। ”

এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি  হিযবুতের একটি পোস্টারের ছবি ও খবর ছাপা হওয়ায় একটি জাতীয় দৈনিককে (ডেইলী স্টার) সরকার সতর্ক করে দিয়েছিলো সে বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন।



হিযবুত থেকে জঙ্গি

ডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, হিযবুত নিষিদ্ধ হওয়ার পরে এদের অনেকেই জঙ্গিদের দলে যোগ দিয়েছেন। হিযবুতের বেশিরভাগ সদস্যই ছিল উচ্চশিক্ষিত ও স্বচ্ছল পরিবার থেকে আসা এবং বয়সে তরুণ। এখন এই সদস্যদের অনেকেই আনসারুল্লাহ বাংলা টিম বা আইএস’ এ যোগ দিয়েছে বলে তথ্য রয়েছে।

ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় জানান, গত ৭ জুন রাতে রাজধানীর অভিজাত বনানী ডিওএইচএস’র নিজের বাড়ি থেকে আইএস সদস্য সন্দেহে ফিদা মুনতাসির সাকেরকে (২৪) গ্রেপ্তার করা হয়।

এ সময় তার কাছ থেকে একটি কম্পিউটার সিপিইউ,  ৩টি ল্যাপটপ,  ৩টি মোবাইল ফোন ও একটি পাসপোর্ট জব্দ করা হয়েছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে মুনতাসির হিজবুত তাহরিরের সাবেক সদস্য।

এর আগে গত ৩১ মে থেকে আইএস সন্দেহে গ্রেপ্তার হন আরেক সেনা কর্মকর্তার ছেলে আব্দুল্লাহ আল গালিব (২৫)।

ডিবির উপকমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন,  গালিব আইএস’র আদলে জুনুদ আত-তাওহিদ ওয়াল খিলাফা নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলার চেষ্টা করছিলেন। ওই সংগঠনটি তাদের ওয়েবসাইটে নিজেদের সশস্ত্র প্রশিক্ষণের দৃশ্যই আপলোড করে রেখেছে। এই গালিবও হিযবুতের সাবেক সদস্য।

এ ছাড়া ২০১৩ সালে ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ ছাত্রও হিযবুতের সাবেক সদস্য বলে জানান উপকমিশনার নাজমুল।

এই পাঁচজন হলেন- ফয়সাল বিন নাঈম ওরফে দীপ (২২), মাকসুদুল হাসান ওরফে অনিক (২৩), এহসান রেজা ওরফে রুম্মন (২৩), নাইম শিকদার ওরফে ইরাদ (১৯) ও নাফিস ইমতিয়াজকে (২২)।

রাজীবকে হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দীতেও তারা হিযবুত তাহরীরের সাবেক সদস্য হিসেবে নিজেদের দাবি করেছেন। হিযবুত নিষিদ্ধ হলে তারা আনসারুল্লাহ বাংলা টিম নামে সংগঠিত হন।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।