বাংলাদেশকে জাপান বিশাল ঋণ সহায়তা দিচ্ছে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.12.14
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-japan ১৩ ডিসেম্বর ঋণচুক্তিতে স্বাক্ষর করেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন, বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত মাসাতু ওয়াতানাবি এবং বাংলাদেশস্থ জাইকা অফিসের প্রধান প্রতিনিধি হাইকো হাতিয়েদা।
বেনার নিউজ

বিদ্যুৎ, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন খাতের ছয় প্রকল্পে  বাংলাদেশকে নামমাত্র সুদে ও সহজ শর্তে ৮ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে জাপান, যা বাংলাদেশের জন্য এযাবৎ কালের সবচেয়ে বড় জাপানি ঋণ।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হিসাবে, স্বাধীনতার পর থেকে গত বছরের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৪২ বছরে বাংলাদেশের উন্নয়নে একক দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি সহায়তা দিয়েছে জাপান।

ওই সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও দাতাগোষ্ঠি অনুদান ও আর্থিক সহায়তা দিয়েছে প্রায় ৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।  এর সিংহভাগ বিশ্বব্যাংক ও এডিবি দিলেও দেশ হিসেবে  জাপান ছিল শীষে ।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত জাপানের কাছ থেকে মোট ৪২৭ কোটি ডলার ঋণসহায়তা পাওয়া গেছে। আর ৩১১ কোটি ডলার এসেছে অনুদান হিসেবে। অন্যদিকে সাড়ে ২৪ কোটি ডলারের সমপরিমাণ খাদ্যসহায়তা দিয়েছে জাপান।

এবার জাপানি মুদ্রার হিসেবে ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৩২৬ কোটি ৫০ লাখ ইয়েন। গত রোববার এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ জন্য জাপানের সঙ্গে বিনিময় নোট ও ঋণচুক্তি করেছে সরকার। এবারের ঋণ সহায়তাই এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি বলে দুই দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ।

”বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর টোকিও সফরের সময় জাপান সরকার পাঁচ বছরে ছয় বিলিয়ন ডলারের (৬০০ কোটি ডলার) যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, এটি তারই প্রতিফলন,” চুক্তি সইয়ের পর সাংবাদিকদের জানান দেশটির রাষ্ট্রদূত মাসাতো ওয়াতানাব।


‘অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে এই সহায়তা’

“নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হতে আমাদের অনেক বিনিয়োগ দরকার। জাপানি এই সহায়তা আমাদের অর্থনীতিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে, “ বেনারকে জানান অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগী সংস্থার (জাইকা) আবাসিক প্রতিনিধি মিকিও হাতায়েদা অনুষ্ঠানে  বলেন, ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে করা ৩৫তম ঋণ প্যাকেজে ঋণের পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৯৮ কোটি ইয়েন। এবার ৩৬তম ঋণ প্যাকেজের আওতায় ১৩ হাজার ৩২৬ কোটি ইয়েনের চুক্তি হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডির জ্যেষ্ঠ সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন এবং জাইকার পক্ষে আবাসিক প্রতিনিধি মিকিও হাতায়েদা এ চুক্তিতে সই করেন।  

এই ঋণের জন্য বার্ষিক সুদের হার হবে মাত্র ০.০১ শতাংশ। ঋণ শোধ করতে হবে ৪০ বছরে। ঋণ চুক্তিতে রেয়াতকাল ধরা হয়েছে ১০ বছর; অর্থাৎ চুক্তির প্রথম দশ বছর পর থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে।

এবারের প্যাকেজের আওতায় প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে নেওয়া ‘বিদেশি বিনিয়োগ উন্নয়ন প্রকল্পে’ অর্থায়ন করা হবে প্রায় এক হাজার ২৯ কোটি টাকা।  

বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নেওয়া হয়েছে এই প্রকল্প। এর ১ হাজার ৫১৬ কোটি টাকার মধ্যে জাপান দেবে ১ হাজার ২৯ কোটি টাকা। জাপানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে এই প্রকল্পের আওতায়।


যে সব প্রকল্পে ঋণ দেয়া হচ্ছে

ছয় প্রকল্পের মধ্যে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বড় হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রধান পাওয়ার গ্রিড শক্তিশালীকরণ প্রকল্প। এর আকার ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৬৩ শতাংশ অর্থাৎ ২ হাজার ৮৪৪ কোটি টাকা ঋণ দেবে জাপান।

পশ্চিমাঞ্চল বাংলাদেশ সেতু উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ হাজার ৯১৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা ঋণ দেবে জাপান। এর মাধ্যমে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে ৬১টি সেতু প্রতিস্থাপন ও নির্মাণ করা হবে।

মাতৃসেবা, শিশুস্বাস্থ্য (এমএনসিএইচ) এবং স্বাস্থ্য উন্নয়ন প্রকল্পের ১ হাজার ৩৯৭ কোটি টাকার মধ্যে জাপানের ঋণ ৮১ শতাংশ বা ১ হাজার ১৩৮ কোটি টাকা।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নেওয়া ‘আরবান বিল্ডিং সেফটি প্রোজেক্ট’ এর জন্য ৭৮৫ কোটি টাকা দেওয়া  হবে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ‘উপজেলা গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রোজেক্ট’ ৯৫৭ কোটি টাকা পাবে এই প্যাকেজ থেকে। উপজেলা সুশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের মোট ব্যয় ১ হাজার ১১৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাপানের ঋণ ৯৫৭ কোটি টাকা। উপজেলা ভবন নিরাপত্তা প্রকল্পের ৯১২ কোটি টাকার মধ্যে জাপান দেবে ৭৮৫ কোটি টাকা।


জাপান বরাবরই বেশি সাহায্য দিয়ে এসেছে

স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় জাপান। অবকাঠামো ও কারিগরী প্রকল্পেই জাপানের কাছ থেকে বেশি সহায়তা পাওয়া গেছে।

তবে ১৯৭৫-৭৬ অর্থবছর পর্যন্ত শুধু খাদ্যসহায়তাই দিয়েছে জাপান। এ সময় পর্যন্ত সাত কোটি ডলারের বেশি খাদ্যসহায়তা দিয়েছে দেশটি। এর প্রায় পুরোটাই অনুদান হিসেবে এসেছে।

১৯৭৬-৭৭ অর্থবছরে জাপানের কাছ থেকে প্রথম ৯০ লাখ ডলার ঋণ পায় বাংলাদেশ। এর পর থেকে খাদ্য, অনুদান ও ঋণসহায়তা সমান্তরালে পেতে থাকে বাংলাদেশ।

তবে ২০০২-০৩ অর্থবছরের পর থেকে আর খাদ্যসহায়তা পায়নি বাংলাদেশ। তবে জাপানি সাহায্যের বেশির ভাগই সহজ শর্তে, স্বল্প সুদের ঋণ। বর্তমানে জাপান শুধু উন্নয়ন প্রকল্পেই ঋণ ও অনুদান দিয়ে থাকে। এভাবে বদলে গেছে বাংলাদেশকে দেওয়া জাপানের উন্নয়ন সহায়তার চিত্র।

২০০৯-২০১০ থেকে ২০১৩-২০১৪ অর্থবছরে অর্থাৎ এই পাঁচ অর্থবছরে ১০০ কোটি ডলারের বেশি ঋণ ও অনুদান পাওয়া গেছে।

”জাপানের সহায়তা নেওয়ায় বাংলাদেশের বড় সুবিধা হলো, কার্যত এর কোনও সুদ পরিশোধ করতে হয় না,” বেনারকে জানান ইআরডির একজন কমকতা।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।