জাপানি কুনিও হত্যাকান্ডে এবার জেএমবি নেতার আদালতে স্বীকারোক্তি, আগের গ্রেপ্তার প্রশ্নবিদ্ধ

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.12.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-japanese হোশি কুনিওকে রংপুরের মুন্সিপাড়ায় কবর দেয়া হয়। এখনো অনেকেই তাঁর কবর দেখতে যান।
বেনার নিউজ

জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও ও মাজারের খাদেম রহমত আলী হত্যাকাণ্ড এবং বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা রুহুল আমিনকে হত্যা চেষ্টায় জড়িত প্রধান ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে পুলিশ। এই তিনটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে দেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা রংপুরে।

এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের বলেন, বিএনপি–জামায়াত এই হত্যার সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া এই ঘটনায় র‍্যাব স্থানীয় বিএনপির নেতাসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে রংপুর কারাগারে রেখেছে।

এদিকে গতকাল পুলিশ নতুন করে জানাচ্ছে, এ ঘটনায় জেএমবি জড়িত। গ্রেপ্তার হওয়া ওই ব্যক্তির নাম মাসুদ রানা। সে জঙ্গি সংগঠন জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে রংপুর পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিআইজি হুমায়ূন কবির এ তথ্য জানান ।

“গত সোমবার মাসুদ কাউনিয়ার বিচারিক হাকিম শফিউল আলমের আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে,” মঙ্গলবার বেনারকে জানান রংপুরের সরকারি কৌশলী (পিপি) আব্দুল মালেক।

জবানবন্দির বিষয়ে বিস্তারিত না বললেও জাপানি নাগরিকসহ তিন হত্যাকাণ্ড বা হত্যাচেষ্টায় জড়িত থাকার কথা মাসুদ উল্লেখ করেছে বলে জানান পিপি।


আটকের কোনো তথ্য পুলিশ দেয় নি

তবে মাসুদকে কবে ও কোথা থেকে আটক করা হয়েছে, এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেয়নি পুলিশ। তবে পুলিশের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, মাসুদ রানাকে (৩৮) গত বৃহস্পতিবার কাউনিয়ার কল্যাণী ইউনিয়নের পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়ায় তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

মাসুদ কোনো আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পান নি। গত ৩ ডিসেম্বর তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও পুলিশ কিছু জানায়নি। আজ স্থানীয় সাংবাদিকেরা দলবেধে ডিআইজির কাছে গেলে তিনি কিছু তথ্য দেন। বলেন যে, সে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে। কিন্তু কবে, কোথা থেকে গ্রেপ্তার তা বলতে চাননি। এক পর্যায়ে তিনি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া থেকে বিরত থাকেন।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তা হুমায়ূন বলেন, “জিজ্ঞাসাবাদে নিশ্চিত হয়ে জবানবন্দি নেওয়ার পর আজ সাংবাদিকদের অবহিত করা হল।”

“মাসুদ রানা জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার এবং তিনি হোশি কুনিও হত্যাকারীদের অন্যতম। ওই জাপানিকে তিনিই গুলি করেন বলে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে জানিয়েছেন,” সাংবাদিকদের বলেন হুমায়ুন কবির।

পুলিশের ভাষ্যমতে, মাসুদ রানা রংপুরের পীরগাছা উপজেলার কল্যাণী ইউনিয়নের পশুয়া টাঙ্গাইলপাড়া গ্রামের আব্দুল মালেকের ছেলে। তিনি কুনিওকে হত্যার কথা স্বীকার করেছেন।

“এ ধরণের স্পর্শকাতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীকে আরও সতর্কতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে প্রশ্ন না ওঠে,” বেনারকে জানান নাগরিক উদ্যোগের সমন্বয়কারি শরিফুজ্জামান শরীফ।  

এদিকে ডিআইজি হুমায়ুন কবির বলেন, রংপুরের কাউনিয়ায় মাজারের খাদেম রহমত আলীকে কুপিয়ে হত্যা ও রংপুর নগরের আরকে রোডে বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের সহকারী (পিএ) রুহুল আমিনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টা চালিয়েছেন এই একই ব্যক্তি।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে ডিআইজি আরও বলেন, “ইতিমধ্যে জাপানি নাগরিক হত্যা ঘটনার আলামত ও সাক্ষ্যপ্রমাণ পেয়েছি। আশা করি খুব শিগগির প্রকৃত ঘটনা আপনাদের জানাতে পারব।”

এই হত্যা মামলার সঙ্গে এর আগে গ্রেপ্তারকৃতদের প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, এসব ঘটনার সঙ্গে একটি বিরাট সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে। সবকিছুই বেরিয়ে আসবে।  

গত ৩ অক্টোবর সকালে রংপুর শহরের উপকণ্ঠে কাউনিয়া উপজেলার কাচু আলুটারি গ্রামে দুর্বৃত্তদের গুলিতে খুন হন জাপানি নাগরিক হোশি কুনিও। এ ঘটনায় কাউনিয়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রেজাউল করিম বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।


এখনো আটক রয়েছে ৫ জন

কুনিও হত্যার সঙ্গে এর আগে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এরা হলেন, কুনিওর ব্যবসায়িক সহযোগী হুমায়ুন কবির ওরফে হীরা, মহানগর বিএনপির সদস্য রাশেদ-উন-নবী খান ওরফে বিপ্লব, মহানগর যুবদলের সদস্য রংপুর শহরের শাহীপাড়ার রাজিব হাসান ওরফে মেরিল সুমন (২৮), শহরের জুম্মাপাড়ার নওশাদ হোসেন ওরফে ব্ল্যাক রুবেল (২৬) ও শালবন মিস্ত্রিপাড়ার কাজল চন্দ্র বর্মণ ওরফে ভরসা কাজল (৩২)।

এর মধ্যে শেষের তিনজনকে গত ১২ নভেম্বর দিবাগত রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সদর উপজেলার সাতনইল ও বিদিরপুর এলাকা থেকে অস্ত্রসহ আটক করে র‍্যাব-৫। এই পাঁচজন বর্তমানে রংপুরের কারাগারে রয়েছেন।

এদিকে গত ১০ নভেম্বর রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় মাজারের খাদেম হত্যা ও গত ৮ নভেম্বর রংপুরে বাহাই সম্প্রদায়ের এক নেতাকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার এই দুই ঘটনায় ইতিমধ্যে ছয় ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।

কাউনিয়ার খাদেম হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত তিন ব্যক্তি হলেন, কাউনিয়ার মধুপুর ইউনিয়ন জামায়াতের সদস্য মোর্শেদ আলী, শহিদুল ইসলাম ও আবু রায়হান ওরফে রঞ্জু।


এদিকে বাহাই সম্প্রদায়ের নেতা ও রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী রুহুল আমিনকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় গ্রেপ্তার দেখানো তিন আসামিও কারাগারে রয়েছেন।

এরা হলেন, হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণি কর্মচারী ইউনিয়নের সাংগঠনিক সম্পাদক আশিকুর রহমান ওরফে নয়ন, শহরের ধাপ এলাকার আবু রায়হান ও সজল।  

ঢাকায় ইতালির নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মধ্যে ৩ অক্টোবর রংপুরের কাউনিয়ায় হত্যা করা হয় জাপানি কুনিও হোশিকে। দুটি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তিন ব্যক্তি মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। এ নিয়ে দেশে–বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।