হাইকোর্টের নির্দেশে ঐতিহাসিক ‘যশোর রোড’ নামটি ফিরে আসছে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.08.26
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-jessore ১৯৭১ সালে শরণার্থীরা এই যশোর রোড ধরে সীমান্ত পারি দিয়েছিল।
বেনার নিউজ

অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের মন্ত্রী খান-এ সবুর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রধানমন্ত্রী শাহ আজিজুর রহমানের স্মরণে নামকরণ করা দুটি স্থাপনার নাম বদলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত দিয়েছে হাইকোর্ট। দুজনেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা ছিলেন।

গত ২৫ আগষ্ট আদালত নির্দেশনা দেয়, খুলনা মহানগরীর ‘খান-এ-সবুর’  সড়কের নাম হবে ‘যশোর রোড’।  মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় এই নামেই পরিচিত ছিল ওই সড়কটি। পুরানো ‘যশোর রোড’  নাম ব্যবহার করতে খুলনা সিটি করপোরেশনের মেয়রকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত ।

পাশাপাশি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শাহ আজিজুর রহমান’  মিলনায়তনের নামও প্রত্যাহার করতে বলেছে হাইকোট। তবে নতুন নাম কী হবে তা ঠিক করবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

২০১২ সালে একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই দুই ক্ষেত্রে নাম পরিবর্তনের অন্তর্বর্তী আদেশ দিলেও তা কার্যকর না হওয়ায় আবেদনকারীরা গত সপ্তাহে পূনরায় দৃষ্টি আকর্ষণ করায় আদালত উক্ত নির্দেশনা দেন।

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশ হাতে পেলে তাঁরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।  


যশোর রোডের অতীত ও গিন্সবার্গের কবিতা

বাংলাদেশের খুলনা বিভাগ থেকে কলকাতার দমদম পর্যন্ত যশোর সড়ক ধরেই একাত্তরে লাখো মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল ভারতে। তাদের দুর্দশা দেখেই মার্কিন কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা-‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’, যা ওই সময় বিশ্বকে নাড়া দেয়। ওই কবিতাটিকে পরে গানে রুপান্তর করা হয়েছিল।

কবিতার কয়েকটি লাইন এরকম-

“ Millions of souls nineteenseventyone
homeless on Jessore road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan.”

উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, অ্যালেন গিন্সবার্গ মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে ভারতের কলকাতায় এসেছিলেন। কলকাতার বেশ কয়েকজন সাহিত্যিকের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল, যাঁদের একজন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি সুনীলের বাড়িতেই উঠেছিলেন।

তখন বাংলাদেশ থেকে অনেক শরণার্থী পশ্চিমবঙ্গ ও সীমান্তবর্তী অন্যান্য শহরে আশ্রয় নিয়েছিল। সে সময় অধিকাংশ শরণার্থী ব্রিটিশ রাজের সময়কার পূর্ব বাংলা ও পশ্চিমবঙ্গের সংযোগকারী এই সড়ক ধরেই আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে এসে পৌছায় ।

গিন্সবার্গ কলকাতা থেকে যশোর সীমান্তে যান। তার সাথে সুনীলও ছিলেন। তারা যশোর সীমান্ত ও এর আশপাশের শিবিরগুলোতে বসবাসকারী শরণার্থীদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করেন।

এই অভিজ্ঞতা থেকেই গিন্সবার্গ এই কবিতাটি লিখেছিলেন। এই দীর্ঘ কবিতার সাথে সুর দিয়ে এটিকে গানে রূপ দিয়েছিলেন তিনি।

আমেরিকায় ফিরে গিয়ে তার বন্ধু বব ডিলান ও অন্যান্য কয়েকজন  বিখ্যাত গায়কের সহায়তায় এই গান গেয়ে তিনি কনসার্ট করেছিলেন। এভাবেই বাংলাদেশী শরণার্থীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করেন গিন্সবার্গ।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর এই সড়ক হয়েই বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ কলকাতা থেকে শত্রুমুক্ত যশোরে পৌঁছান।

স্বাধীনতার পর সেই সড়কের নাম পাল্টে ফেলা হয়। মুসলিম লীগের নেতা খান-এ-সবুর,  যিনি পাকিস্তান আমলে ছিলেন আইয়ুব খানের মন্ত্রী,  তাঁর নামেই এই সড়কটির নামকরণ হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দালাল আইনে বিচার শুরুর সময় প্রকাশিত ছয়শ স্বাধীনতা বিরোধী অপরাধীর তালিকায়ও তার নাম ছিল।

“তবে খুলনা অঞ্চলের উন্নয়নে তাঁর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা বিরোধী হলেও তিনি কারও ক্ষতি করেননি,”  জানান খুলনার প্রবীণ আইনজীবী সৈয়দ আলী আশরাফ।


মামলার প্রেক্ষাপট

স্বাধীনতা বিরোধীদের নামে স্থাপনা,  সড়ক, অবকাঠামোর নামকরণ স্থগিত চেয়ে ২০১২ সালে হাই কোর্টে একটি রিট করেছিলেন ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন ও লেখক-সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ১৪ মে হাই কোর্ট রুলসহ অন্তর্বর্তী আদেশ দেয়।

আদালতের ওই নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না জানিয়ে মুনতাসীর মামুন ও শাহরিয়ার কবীর গত রোববার আবার আদালতে যান। তাঁদের রিট আবেদনের শুনানি করে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমানের বেঞ্চ গত মঙ্গলবার স্বাধীনতা বিরোধী বলে পরিচিত ওই দুজনের নাম ব্যবহারে স্থগিত আদেশ দেন।

সেই সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নামে থাকা সড়ক, স্থাপনা ও অবকাঠামোর নাম পরিবর্তনের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, পরিবর্তনের পর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে সেসবের নামকরণ কেন করা হবে না এবং যারা ওই নামকরণের জন্য দায়ী, তাদের কেন বিচারের আওতায় আনা হবে না- তা জানতে চেয়ে রুলও জারি করা হয়।

“ দেশে এখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে । তাদের নামে স্থাপনার নামকরণ হওয়ার মাধ্যমে ইতিহাস বিকৃতি হচ্ছে। এসব কারণে আদালত তাদের নাম প্রত্যাহারের আদেশ দিয়েছে, ” বেনারকে জানান আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী এ কে রাশেদুল হক।

আদালতের ওই নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে না জানিয়ে রিট আবেদনকারীরা ফের আবেদন করলে আদালত এ নির্দেশনা দেন বলে জানান ওই আইনজীবী।

“খুলনায় এখনও কেন রাজাকার খান এ সবুরের নামে সড়ক থাকবে,  কুষ্টিয়ায় কেন শাহ আজিজের নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তন থাকবে?  হাইকোর্ট নির্দেশ দিলেও এতোদিন তা বহাল ছিল। তাই আমরা বিষয়টি আদালতের নজরে নিয়েছি,”  বেনারকে জানান ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন, যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক।

তাঁর মতে, যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় বিরোধিতা করেছে, তাঁদের নামে এ দেশে কোনও স্থাপনার নাম থাকতে পারে না।   

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।