একদিকে ক্রসফায়ার আরেকদিকে গনপিটুনি, নাগরিকরা শঙ্কিত

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.08.20
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-killing শিশু নির্যাতন ও হত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছেন অনেকেই। খ্রিস্টান এসোসিয়েশন প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধনে অংশ নেয়। ১৬ আগষ্ট,২০১৫
বেনার নিউজ

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মধ্যে মানুষের আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নরসিংদীতে গত বুধবার গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ছয়জন, যাঁদের সন্দেহ করা হচ্ছে ডাকাত বা ছিনতাইকারী হিসেবে। বৃহস্পতিবার এক আদিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে, এর আগে হাজারীবাগে মোবাইল চুরির অভিযোগে শিশু রাজা মিয়াকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটে।

র‍্যাব–পুলিশের বিরুদ্ধে ক্রসফায়ার ছাড়াও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে প্রায় প্রতিদিন, দেশের কোনো না কোনো এলাকায়। একদিকে গণপিটুনিতে হত্যা, আরেকদিকে ক্রসফায়ারের নামে মানুষ খুনের বিষয়গুলো নিয়ে মানবাধিকার সংগঠনসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।  


নাগরিকদের শংকা

“দেশে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও নিরাপত্তা না থাকায় মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে । ফলে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড,” বেনারকে জানান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, যিনি মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিস কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক।

তাঁর মতে, একদিকে মানুষের মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা।

সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি শিশু নির্যাতনের ঘটনাসহ বীভৎস কয়েকটি ঘটনায় বিরোধী দল বিএনপিসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ দাবি করে আসছে, দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

“একের পর এক এসব গণপিটুনি, হত্যা বা ক্রসফায়ার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিই শুধু নয়, একই সঙ্গে চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গণতন্ত্রহীনতাকেও নির্দেশ করে,” জানান বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।  

তিনি চরম নৈরাজ্যকর এই পরিস্থিতি থেকে দেশকে রক্ষায় দেশবাসীকে ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ে নামার আহ্বান জানান।

“সমাজের মধ্যে একটি অপরাধের বিচার না হলে আরেকটি অপরাধ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটা যাতে আর না ঘটে সে জন্য সরকার কঠোর হয়েছে, এগুলো আর ঘটবে না আশা করা যায়,” বেনারকে জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের।


চাঁপাইনবাবগঞ্জে নিহত চার

গত বুধবার সন্ধ্যার পর চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলায় ছিনতাইকারী সন্দেহে পিটিয়ে চারজনকে হত্যা করা হয়। সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া এলাকায় মোকরোমপুর সেতুর কাছে গণপিটুনিতে তারা মারা যান।

“মোটরসাইকেল ছিনতাইয়ের সময় একটি দলের চারজনকে ধরে পেটায় জনতা। এরপর তারা মারা যায়,” সাংবাদিকদের জানান ওসি ফিরোজ আহমেদ।


ডাকাত সন্দেহে দুজনকে পিটিয়ে হত্যা

বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মনোহরদী উপজেলার চরমান্দিয়া গ্রামে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে দুজনের মৃত্যু ঘটে।

ওই গ্রামে কিছুদিন ধরে ডাকাতের উৎপাত চলছিল বলে স্থানীয়রা জানায়। এরই একপর্যায়ে এদিন ধাওয়া করে সন্দেহভাজন কয়েকজনকে ধরে ফেলে গ্রামবাসী।  


“এ সময় অন্যরা পালিয়ে গেলেও দুজনকে ধরে পিটুনি দেয় এলাকাবাসী । এতে ঘটনাস্থলে তাদের মৃত্যু হয়,” জানান মনোহরদী থানার ওসি মাহমুদুর রহমান।


চুরির সন্দেহে গণপিটুনি, অত:পর মৃত্যু

মারধরের ১২ দিন পর জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলায় এক আদিবাসী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। মৃত শ্যামলাল সিং (৪০) উপজেলার বেতগাড়ী গ্রামের বাঁধন সিং এর ছেলে।

শ্যামলালের স্ত্রী গীতা সিং অভিযোগ করেন, “গত ৭ আগস্ট বেতগাড়ী গ্রামের টুটুল আকন্দ তার শ্যালো মেশিনের পার্টস চুরি হয় বলে শ্যামলালকে তিনি সন্দেহ করেন।

“সেই অভিযোগে টুটুলের নির্দেশে একই গ্রামের সেকেন্দার আলী নামে এক ব্যক্তি শ্যামলকে লাঠি দিয়ে বেদমভাবে প্রহার করেন ।”

সেই থেকে শ্যামলাল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে বুধবার ১৯ আগস্ট তাকে পাঁচবিবি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। বৃহস্পতিবার সকালে জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্যামলালের মৃত্যু হয়।


গাজীপুরে যুবককে পিটিয়ে হত্যা

গাজীপুরে র‍্যাবের জ্যাকেট পরা কয়েকজনের পিটুনিতে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে বলে  অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করে র‍্যাবের কর্মকর্তারা বলেছেন, অজ্ঞাত পরিচয় কয়েকজনের হামলায় আহত যুবককে উদ্ধার করে তারা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।


‘রাষ্ট্রের উপর মানুষ আস্থা হারাচ্ছে’

“একটা রাষ্ট্র কোনো পরিস্থিতিতেই তার কোনো অভিযুক্ত নাগরিককে বিনা বিচারে মেরে ফেলতে পারে না, এটা স্পষ্টভাবেই রাষ্ট্রের সঙ্গে জনগণের কৃত চুক্তির ভয়ংকর লঙ্ঘন,” বেনারকে জানান ব্লগার জাহেদ–উর–রহমান।

তাঁর মতে, “বিনা বিচারে রাষ্ট্র যখন তার কোন নাগরিককে মেরে ফেলে এবং বিচারের ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলে তখন ওটাকে আর রাষ্ট্র বলতে ইচ্ছে করে না; ওটা তখন স্রেফ “মগের মুল্লুক”।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।