Follow us

মানবপাচার আইন আরও কঠোর করতে চায় সরকার

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015-06-04
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কক্সবাজারের টেকনাফে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের তালিকা অনুযায়ী মানবপাচার চক্রের ৩ জনকে পুলিশ শুক্রবার গ্রেফতার করেছে। ২৯ মে,২০১৫
কক্সবাজারের টেকনাফে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের তালিকা অনুযায়ী মানবপাচার চক্রের ৩ জনকে পুলিশ শুক্রবার গ্রেফতার করেছে। ২৯ মে,২০১৫
বেনার নিউজ

সাগর পথে বাংলাদেশিদের পাচার নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার মধ্যে মানবপাচার রোধে সরকার বিদ্যমান আইন সংশোধন করে তা আরও কঠোর করার কথা জানিয়েছে। এর আগে গত ২৭ মে মানবপাচার সংক্রান্ত মামলার বিচারের জন্য দেশের বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

তবে বিদ্যমান মানবপাচার আইন ২০১২ যথেষ্ট শক্তিশালী ও যুগোপযোগী বলে মনে করছেন এই খাতের বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এ সংক্রান্ত অপরাধের বিচারের জন্য মাত্রাভেদে আইনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডসহ বিভিন্ন রকম শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

“আইনটির যথাযথ প্রয়োগ না করে নতুন আইন প্রণয়ন করার উদ্যোগ কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়,” বেনারকে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক।

তাঁর মতে, মানবপাচার আইনের সঠিক ব্যবহার হলে ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ বিষয়ে তৎপর থাকলে মানবপাচার অনেক কমে আসবে।  

গতকাল ৪ জুন বাংলাদেশ সচিবালয়ে শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমুর সভাপতিত্বে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় মানবপাচার রোধে আইনটি সংশোধনের বিষয়ে কমিটির সদস্যরা মত দেন।

“আমরা মানবপাচার ও মাদকদ্রব্য পাচারসহ বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। মানবপাচারকারীদের কঠিন শাস্তি দিতে আইনের বিধি-বিধান পরিবর্তন করা হবে,” সভা শেষে সাংবাদিকদের জানান আমির হোসেন আমু।

মাদক পাচার ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তি দিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্যেও বিধি-বিধানে পরিবর্তন করার কথা বলেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মানবপাচারকারীদের ধরতে কার্যকর পদক্ষেপ নিয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করেছে।

সভায় প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, পানি সম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু ও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, পুলিশের মহা-পরিদর্শক একেএম শহীদুল হক, র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ ও বিজিবির মহাপরিচালক আজিজ আহমেদ সহ অন্যান্য সংস্থার প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন।

সাগর পথে থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ায় মানবপাচারের চলমান ঘটনাগুলোর মধ্যে সংকট সমাধানে ৩০ মে ব্যাংককে  আন্তর্দেশীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
বৈঠক থেকে ফিরে পররাষ্ট্রসচিব শহীদুল হক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সাগর থেকে উদ্ধার বাংলাদেশিরা স্বেচ্ছায় নয়, জোরপূর্বক পাচারের শিকার হয়েছে।

২০১২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রথম মানবপাচার প্রতিরোধ আইন পাস হয়। এ আইনের ৬ ধারা অনুসারে মানবপাচার নিষিদ্ধ করে এর জন্য অনধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।  

একই সঙ্গে আইনের ৭ ধারা অনুসারে, সংঘবদ্ধ মানবপাচার অপরাধের দণ্ড মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা কমপক্ষে সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড।  

এ ছাড়া এ আইনের ৮ ধারা অনুসারে, অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা চেষ্টা চালানোর দণ্ড হিসেবে অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে তিন বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে।  

মানবপাচার আইন ২০১২-এর ৯ ধারা অনুসারে, জবরদস্তি বা দাসত্বমূলক শ্রম বা সেবা প্রদান করতে বাধ্য করার দণ্ড অনধিক ১২ বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে।  

আইনের ১০ ধারা অনুসারে, মানবপাচার অপরাধ সংঘটনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, চুরি ও আটক করার দণ্ড এবং মানবপাচারের অপরাধ সংঘটনের অভিপ্রায়ে বা যৌন শোষণ ও নিপীড়নের শাস্তি অনধিক ১০ বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ২০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে।

এ আইনের ১১ ধারা অনুসারে, পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনো ধরনের যৌন শোষণ বা নিপীড়নের জন্য আমদানি বা স্থানান্তরের দণ্ড অনধিক সাত বছর এবং কমপক্ষে পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড ও কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড রাখা হয়েছে।  

কোনো ব্যক্তিকে তার দেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে বিক্রি বা পাচারের উদ্দেশ্যে লুকিয়ে রাখা, আশ্রয় দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে সহায়তা করা হলে মানবপাচার হিসেবে গণ্য হবে। এ ছাড়া মানবপাচার আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির অধিকার হরণ করে জবরদস্তিমূলক শ্রম আদায়, দাসত্বমূলক আচরণ, পতিতাবৃত্তি বা যৌন শোষণ বা নিপীড়নের মাধ্যমে কোনো ব্যক্তিকে শোষণ বা নিপীড়ন করা হলে মানবপাচার হিসেবে গণ্য হবে।

২০১২ সালের আগে মানব পাচারবিষয়ক কোনো সুনির্দিষ্ট আইন ছিল না। তখন দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মানবপাচার অপরাধের বিচার করা হতো।

ওই আইনের অধীন অপরাধগুলো আমলযোগ্য, আপসের অযোগ্য এবং জামিন অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এ আইনের অধীনে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে কোনো ব্যক্তি পুলিশ অথবা ট্রাইব্যুনালের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন।

আইনের আওতায় গত ২৭ মে মানব পাচার অপরাধের দ্রুত বিচারে বাংলাদেশের সাত বিভাগে সাতটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ‘মানব পাচার অপরাধ দমন’ নামের এই ট্রাইব্যুনাল গঠনের জন্য জনপ্রশাসন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে এই প্রস্তাব পাঠিয়েছে আইন মন্ত্রণালয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের জানান, এসব ট্রাইব্যুনাল চালানোর জন্য কোনো বিধি প্রণয়নের প্রয়োজন হলে তাও করা হবে।

সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাত বিভাগে একটি করে ট্রাইব্যুনাল হবে। জেলায় জেলায় না হয়ে বিভাগীয় পর্যায়ে মানবপাচারের মামলাগুলোর বিচার হলে ভিকটিমের বিচার পাওয়া সহজ হবে।

বর্তমানে এ সংক্রান্ত মামলা সংশ্লিষ্ট জেলার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হচ্ছে।

মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনের ২১ (২) ধারায় বলা হয়েছে, ট্রাইব্যুনাল গঠন না হওয়া পর্যন্ত সরকার প্রত্যেক জেলার নারী ও শিশু দমন ট্রাইব্যুনালকে ওই জেলার মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল হিসেবে নিয়োগ করতে পারবে। এ আইনের অধীনে সংঘটিত কোনো অপরাধের অভিযোগ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে। আইনে দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ পদমর্যাদার বিচারককে নিয়ে যেকোনো জেলায় ট্রাইব্যুনাল গঠনের কথাও বলা আছে।

সরকারের হিসাবে, মানবপাচার নিয়ে বর্তমানে ৫৫৭টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২৫৭টি মামলায় অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে, বিচার হয়েছে মাত্র ১২টি মামলার।

বিচার দ্রুত ও কঠোর করতে ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দেওয়ার কয়েক দিনের মাথায় গতকাল আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় মানবপাচার রোধে বিদ্যমান আইন সংশোধনে সরকারের সিদ্ধান্তের কথা জানানো হলো।

“এখন পর্যন্ত মানবপাচারকারীদের শাস্তির ঘটনা খুবই কম। ট্রাইব্যুনাল হলে বিচারকাজ দ্রুত হবে,” বেনারকে জানান বাংলাদেশে মানবপাচার ও অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসাদুজ্জামান।

“প্রথমে দেশের কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারিভাবে মানুষকে বিদেশে যাওয়ার সুবিধা নিশ্চিত ও নিরাপদ করতে হবে। এ ছাড়া পাচারকারীদের যে কোনোভাবে আইনি প্রক্রিয়ায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে,” বেনারকে জানান বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির সদস্য ফাহিমা নাসরিন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন