ভারতের ট্রেণে বাংলাদেশি নারী হত্যার ঘটনায় তোলপাড়

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.04.27
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-woman ২০ এপ্রিল বেনাপোল বন্দরে স্বজনদের কাছে নার্গিসের লাশ হস্তান্তরের সময় তোলা ছবি।
বেনার নিউজ

আজমির শরিফ দর্শনের তীব্র বাসনায় জন্মান্ধ মা আর নয় বছরের সন্তানকে নিয়ে ভারতে গিয়েছিলেন বাংলাদেশের নার্গিস বেগম (৩৪)। কিন্তু মুসলমানদের ধর্মীয় সে তীর্থস্থান দেখার আগেই এক নারকীয় হত্যাকান্ডের শিকার হন তিনি। বৈধভাবে ভারত যাওয়া নার্গিসকে হত্যার আগে গণধর্ষণ, এমনকি বিভিন্ন অঙ্গহানি করা হয়েছে বলে অভিযোগ তার পরিবারের। একের পর এক সীমান্ত হত্যার পর ভারতের এক ট্রেণে ঘটা এ হত্যাকান্ডে দেশজুড়ে তোলপাড় চলছে। প্রশ্ন উঠেছে ভারতে বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়েও।

এদিকে ঘটনার ৪১দিন পরে গত ২০ এপ্রিল নার্গিসের পঁচা-গলা লাশ হস্তান্তর করে ভারত। আর প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশকে দেওয়া ময়না তদন্তের প্রতিবেদনে তারা জানায় ‘খুন ও ধর্ষণ’র ঘটনা ঘটেনি। তবে নিহতের পরিবারের দাবি অনুযায়ী পরবর্তি করণীয় করবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বহির্বিশ্বের কাছে ভাবমূর্তি রক্ষায় ভারতের উচিত এ ঘটনার ন্যায় বিচার ও ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা।

এ বিষয়ে ভারতের দিল্লীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী বেনারকে বলেন, নিহত নার্গিসের বিষয়টি নিয়ে দুদেশের মধ্যে আলোচনা চলছে।

তবে দূতাবাসের ডেপুটি হাইকমিশনার সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী বলেন, নার্গিসের পরিবারের পক্ষ থেকে ‘ধর্ষণ ও হত্যা’র অভিযোগের পর বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্তের জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়। এরপর ভারতের করা ময়না তদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেয়েছি। সেটি বাংলাদেশে পাঠানোও হয়েছে। ক্ষতিপূরণ বা বিচার চেয়ে নিহতের পরিবারের আবেদনের প্রেক্ষিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তি পদক্ষেপ নেব।

সেদিন যা ঘটেছিল

নার্গিসের মা আনোয়ারা বেগম ওরফে মনিবালার (৬৫)বর্ণনা অনুযায়ী, ৯ মার্চ নার্গিসের চিকিৎসা ও আজমির শরীফ দেখার জন্য পাসপোর্ট ও ভিসা করে নার্গিস মেয়ে কাকলী (৯) ও মা মনিবালাকে নিয়ে ভারতে যান।এর পরদিন ট্রেনে দিল্লি হয়ে আজমিরের উদ্দেশ্যে রওনা হন। কিন্তু ভোর সাড়ে তিনটা নাগাদ কানপুর স্টেশনে ট্রেণ থামলে এক দল যাত্রী তাদের বলেছিলেন ‘দিল্লি এসে গেছে!’

একথা শুনে হুড়মুড় করে মেয়ে আর অন্ধ মাকে প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে ট্রেনের ভেতর থেকে মালপত্র আনতে আবার ঢুকেছিলেন নার্গিস। কিন্তু ট্রেনের ভেতরের কয়েকজন মুখ চেপে ধরে তাকে আটকে রাখে, যা দেখতে পায় কাকলী। প্ল্যাটফর্ম থেকে গোঙানির শব্দও শুনতে পান অন্ধ মা। কিন্তু ততক্ষণে মা আর অবুঝ শিশুকে ফেলে তিনজনের বাংলাদেশি পাসপোর্ট, অর্থ আর মালামালসহ নার্গিসকে নিয়ে যায় ‘কলঙ্কিত’ সে ট্রেণ।
মনিবালার ভাষায়, ‘এরপর নানাজনের সাহায্য চাইলেও ‘পাগল’ বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। নানা পথ ঘুরে কিভাবে যেন বর্ডার পার হয়ে দেশে আসছি জানিনা।’

হঠাৎ নার্গিসের লাশের খবর

নিহতের মামী রাহেলা বেগম বেনারকে বলেন, ‘নাতিসহ মনিবালা ফেরার দিন দশেক পরেই বেনাপোল বন্দর থেকে নার্গিসের লাশ আনার সংবাদ দেয় স্থানীয় পুলিশ। ভাবিনি নার্গিস লাশ হয়ে ফিরবে। অনেক কষ্টে লাশ নিয়ে গোসল করানোর সময় দেখি, তার  ২টি চোখ উপড়ানো, ডানপাশের স্তন কাটা ও পিঠের নিচে কেটে কিডনিগুলো বের করে নেওয়া। শুধু তাই নয়, একটি হাত ও একটি পা ভাঙ্গা এবং শরীরের অনেক স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নও ছিল।’

তিনি বলেন, ‘লাশ হস্তান্তরের সময় ভারতের পুলিশ ময়নাতদন্তের কোনও প্রতিবেদন, এমনকি তার পাসপোর্টটিও দেয়নি। দাফনের আগে খুলনার স্থাণীয পুলিশও আমাদের কাছে ময়না তদন্ত ছাড়া পচা-গলা লাশটি দাফনের অনুরোধ জানায়।’
এই নৃসংশ হত্যা ও ধর্ষণের সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণের জন্য খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের কাছে আবেদন করেছেন বলেও জানান রাহেলা।

তবে ঘটনাস্থল এবং ময়নাতদন্ত ভারতে হওয়ায় এদেশে মামলা করার সুযোগ নেই বলে জানান খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র এডিসি শেখ মনিরুজ্জামান মিঠু।তবে নার্গিস পরিবারের আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার কেডিএ অ্যাপ্রোচ রোডের গলিতে গোলপাতার বেড়া এবং টিনের ছাউনির তৈরি একটি বাড়িতে থাকতেন নার্গিস। রাজমিস্ত্রির কাজ করা স্বামী আবুল কালামের সঙ্গে ছাড়াছাড়ির পর সেলাই এবং অন্যের বাড়িতে কাজ করে মা ও মেয়ের দেখাশোনা করতেন তিনি।

ভারত ভীতি আর ভাবমূর্তি সংকট

এদিকে এ ঘটনায় ভারত সফরের বিষয়ে এ ধরনের ভীতি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে। মিরপুরের বাসিন্দা নাসিমা খাতুন বেনারকে বলেন, কিছুদিন ধরেই কয়েকজন বন্ধু মিলে ভারতে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিলাম। ভিসা আবেদনও করেছি। কিন্তু যে দেশ বিদেশিদের নিরাপত্তা দিতে পারে না, সেখানে যাওয়ার আগে অবশ্যই আরেকবার ভেবে দেখব।

এ ঘটনায় ভারত ভাবমূর্তি সংকটে পড়বে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন বেনারকে বলেন, ভারতে বিদেশী পর্যটকদের আক্রান্ত হওয়ার খবর নতুন নয়। বহির্বিশ্বে নিজেদের মূল্যবোধ রক্ষায় ভারতের উচিত নার্গিসের বিষয়টি সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিপূরণ দেওয়া। বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও মানবিক এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা হিসেবে দেখা উচিত। এছাড়া বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও দেশটির দায়িত্ব।

তবে কোনভাবেই বিষয়টি দুদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে আঘাত করবে না বলেও জানান তিনি।
এ বিষয়ে ড. দেলোয়ার আরো বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনাটি দুদেশের সরকার পর্যায়ের নয়, এমনকি সীমান্ত হত্যার মত স্পর্শকাতরও নয়। এটি নাগরিক পর্যায়ের অপরাধের ঘটনা। বিচারের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।