Follow us

কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়লেও অবদান স্বীকৃতি পাচ্ছে না

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015-06-15
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পটুয়াখালিতে নারী শ্রমিকরা ফসলের মাঠে কাজ করছে। মে, ২০১৫
পটুয়াখালিতে নারী শ্রমিকরা ফসলের মাঠে কাজ করছে। মে, ২০১৫
বেনার নিউজ

শ্রমশক্তি জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এক দশকে যেখানে কৃষিক্ষেত্রে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে, সেখানে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। মাঠভিত্তিক কৃষিকাজ ও গৃহভিত্তিক কৃষিকাজ—এ দুটি পর্যায়েই নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও বাস্তবে কৃষিতে নারীর অবদান এখন পর্যন্ত স্বীকৃতি পায়নি।

“কৃষি খাতের ২১টি কাজের ধাপের মধ্যে নারীর অংশগ্রহণ ১৭টিতে, অথচ কৃষিকাজে নারীর স্বীকৃতি নেই বললেই চলে,” বেনারকে জানান কর্মজীবী নারীর সভাপতি শিরীন আখতার।

মানবজাতির বিবরণ সংক্রান্ত মানচিত্রে দেখা যায়, ১৪২টি উদ্যান সমাজের (হর্টিকালচার সোসাইটিস) অর্ধেকেরই চাষাবাদ নারীর অধীন ছিল। মূলত নারীর হাত ধরেই কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন হয়েছে। আধুনিক যুগেও কৃষিতে তাদের অংশগ্রহণ আরও বেড়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো’র (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রম জরিপ অনুযায়ী, ২০১০ সালে দেশে কৃষিকাজে নিয়োজিত ২ কোটি ৫৬ লাখ শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ ছিলেন নারী।
তার এক দশক আগে ২০০০ সালে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৮ লাখ। অর্থাৎ এক দশকের ব্যবধানে কৃষিকাজে যুক্ত হয়েছেন ৬৭ লাখ নারী।

জরিপ অনুযায়ী ১০ বছরের ব্যবধানে কৃষিতে নারী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ, পক্ষান্তরে পুরুষের অংশগ্রহণ কমেছে সাড়ে ৩ শতাংশ। কৃষিকাজে পুরুষের সমান অংশগ্রহণ করেও নারীর পরিচয় থাকছে কেবল গৃহিণী হিসেবে।

বিবিএস এর রিপোর্ট অনুযায়ী, কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত আছে ৬৮.১ শতাংশ নারী। তারা কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ার তিনটি পর্যায় যথা-প্রাক বপন প্রক্রিয়া, বীজ বপন ও ফসল উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং ফসল-উত্তর প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত থাকেন।

তা ছাড়া ফসল উত্তরণ প্রক্রিয়ায় মাড়াই, বাছাই, শুকানো ও আহারযোগ্য করে তোলার কাজের বেশির ভাগ দায়িত্বই পালন করেন নারী। এ ছাড়া কৃষির অবিচ্ছেদ্য অংশ গবাদিপশু পালন ও কৃষি সরঞ্জামাদি তৈরি তথা ডালি, ঝাড়ু, কুলা, চালুনি ইত্যাদি তৈরিতে নারী বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।

তা ছাড়া ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সার হিসেবে ছাইয়ের ব্যবহার, লম্বা বাঁটযুক্ত কোদাল, বেলচা, সাধারণ লাঙল, শস্যচক্র এ সবই নারীর উদ্ভাবন।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ নারী গৃহসহ কৃষিকাজে সরাসরি অবদান রাখছেন। কিন্তু তাদের শ্রমকে শ্রমশক্তি হিসেবে গণ্য করা হয় না। কারণ তাদের এ কাজের জন্য কোনো পারিশ্রমিক দেওয়া হয় না।

কৃষিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে দরিদ্র ভূমিহীন এবং উপজাতি নারীদের বেশি সম্পৃক্ত হতে দেখা যায়। উপজাতি নারীরা ফসল লাগানো, পরিচর্যা এবং ফসল কাটার মৌসুমে দল বেঁধে মাঠে কাজ করেন।

“কৃষিকাজে সম্পৃক্ত নারী একই সঙ্গে ঘরের কাজ ও কৃষিকাজ সম্পাদন করেন। তারপরও এ দেশে কৃষিক্ষেত্রে নারীর অবদান অদৃশ্য ও অস্বীকৃত রয়ে গেছে,” বেনারকে জানান বাগেরহাটের ফকিরহাট সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শিরিন আক্তার।  

তাঁর মতে, কৃষিকাজে সম্পৃক্ত নারী কৃষক মজুরি প্রাপ্তিতে কোনও কোনও ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদের নামমাত্র মজুরি দেওয়া হয়। অবশ্য সরকারি সব কাজে নারী ও পুরুষের মজুরী সমান।এখানে বৈষম্য সৃষ্টির সুযোগ নেই।

কৃষিতে নারী শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় কর্মজীবী নারী সংগঠনের নেতারা দীর্ঘদিন ধরে কৃষি শ্রম আইন ও একটি কৃষি কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের প্রতি দাবি জানিয়ে আসছেন।

“আমরা পুরুষ শ্রমিকের মতই সমান কাজ করি। কিন্তু মজুরি নিতে বা চাইতে গেলে নারীদের ২০–৩০ টাকা কম দেওয়া হয়। আগে এই প্রবণতা অনেক বেশি ছিল। এখন তা বেশ কমেছে,” বেনারকে জানান বাগেরহাট সদরের বেমরতা গ্রামের নারী শ্রমজীবী ময়না খাতুন (৩৮)।

এদিকে কর্মজীবী নারীর দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, কৃষি খাতকে গতিশীল করতে হলে সঠিক বিবেচনার ভিত্তিতে কৃষাণি নারীদেরও ‘কৃষক কার্ড’ দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। দিতে হবে তাদেরও সরকারি কৃষি প্রণোদনা।

“আমরা নারী কৃষি শ্রমিকদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদান করা, একই ধরনের কাজে পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করা, সরকারি কৃষি কর্মকাণ্ডে নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া, কৃষিকাজে নারী শ্রমিকদের পেশাগত স্বাস্থ্য নিশ্চিত করাসহ আরও বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছি,” জানান শিরিন আক্তার।  

তিনি বলেন, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরে কৃষি খাতে অংশগ্রহণকারী নারী শ্রমিকের সংখ্যাগত তথ্য নেই, যা দুঃখজনক বটে।

শ্রমশক্তির সংখ্যা অনুযায়ী ২৯ শতাংশ নারী অবৈতনিক পারিবারিক কাজে নিয়োজিত থাকার পরও শ্রমশক্তির অংশ হিসেবে অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছেন। এমনকি গৃহপালিত পশুপালন থেকে শুরু করে কৃষি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের আয়ের টাকার ভাগও নারীকে দেওয়া হয় না।

এদিকে অতীতে বাজেটেও নারীকে কৃষির কেন্দ্রবিন্দুতে রাখতে এবং কৃষি খাতের অন্যতম উৎপাদক হিসেবে গণ্য করতে এইখাতে সর্বমোট বরাদ্দের ২৬.৫৩ শতাংশ নারীদের কল্যাণে ব্যয়ের কথা বলা হয়েছে। তা ছাড়া আগে থেকেই জাতীয় কৃষি নীতিতে নারীর জন্য প্রশিক্ষণ এবং অর্থায়নে সহায়তা করার কথা বলা হয়ে আসছে।কিন্তু কার্যত এ ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হয় নি।

“এটা অনস্বীকার্য যে, কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণের ফলে একদিকে যেমন দেশের খাদ্যনিরাপত্তা বাড়ছে অন্যদিকে মাথাপিছু আয়ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাদের অবদান ও স্বীকৃতির বিষয়টি কীভাবে আরও নিশ্চিত করা যায়, সেই চেষ্টা শুরু হয়েছে,” জানান কৃষিসচিব শ্যামল কান্তি ঘোষ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন