নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে খুঁজছে বাংলাদেশ ব্যাংক

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2015.08.27
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-woman নারী উদ্যোক্তাদের অনেকেই এখন ব্যাঙ্ক ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। আগষ্ট,২০১৫
বেনার নিউজ

দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে (এসএমই)  নারী উদ্যোক্তা ঋণ আগামী পাঁচ বছরে ১০ ভাগ বাড়ানোর লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক,  যা গত ছয় বছরে ৬ শতাংশ বেড়েছে।

২০০৯ সাল থেকে এক শতাংশ হারে এই ঋণের হার বৃদ্ধি পাওয়ায় এখন তা দুই শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
“বাংলাদেশ ব্যাংকের নারীবান্ধব উদ্যোগের ফলে বিগত বছরগুলোতে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে বিশেষ করে ঋণ বিতরণে বিশেষ সাফল্য অর্জিত হয়েছে,”  বেনারকে জানান ব্যাংকের গভর্ণর আতিউর রহমান।

তবে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা আশানুরূপ বৃদ্ধি না পাওয়ায় হতাশ তিনি।

উল্লেখ্য, এ বছরের শুরুতে দেশের ৬৪টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় নয় হাজার শাখায় ২৭ হাজার উদ্যোক্তা নির্বাচনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু গত ছয়মাসে ব্যাংকগুলো ১০১৪ জন আগ্রহী নারী উদ্যোক্তাকে নির্বাচন করেছে।

“বছরের মাঝামাঝি এ অর্জন আশাব্যঞ্জক বলে মনে হয় না। আমি বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই বিভাগকে এ বিষয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে আরও নিবিড়ভাবে কাজ করতে বলেছি,”  জানান গভর্নর।

তিনি বলেন,  “আশা করবো এ বছর আমাদের নয় হাজার ব্যাংক শাখায় ন্যূনতম ২৭ হাজার উদ্যোক্তা নির্বাচিত হবে এবং ন্যূনতম নয় হাজার নতুন নারী উদ্যোক্তা ব্যাংকিং সেবায় অন্তর্ভুক্ত হবে।”  


টেকসই অর্থনীতির জন্য নারীদের যুক্ত করতে হবে

সরকারি  হিসাবে,  বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের অর্ধেকই নারী। তবে, এ বিশাল জনসম্পদের সামান্য অংশই স্বীকৃত অর্থনৈতিক কর্মকা‌ন্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

এ বৃহৎ মানবসম্পদকে অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞে নিয়োজিত করা না গেলে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভবপর নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এই উপলব্ধি থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি চালু করেছিল ২০০৯ সালে। সেখানে স্থাপন করা হয় নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইউনিট।
পিছিয়ে পড়া নারীদের স্ব-কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল উদ্যোগে অর্থায়নের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক মুক্তির পথকে সুগম করতে ইউনিটটি কাজ করছে।

ওই ইউনিটের তথ্য হচ্ছে, ২০১০ সাল থেকে এ পর্যন্ত ২ লাখ ১২ হাজার ১১১ জন নারী উদ্যোক্তাকে ১৪,২৫৪.০৯ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৪ সালে সকল ব্যাংক ও অ-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ৪২ হাজার ৭৩০ জন নারী উদ্যোক্তাদের অনুকূলে সর্বমোট ৩৯৩৮.৭৫ কোটি টাকা বিতরণ করা হয়।

“গত ছয় বছরে আমরা মোট ঋণের মধ্যে এসএমই ঋণের হার ১৯ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছি। আগামী ৫ বছরে আমরা নারী উদ্যোক্তা ঋণ মোট এসএমই ঋণের আরও দশ শতাংশ যোগ করতে চাই,”  জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস.কে সুর চৌধুরী।

তিনি মনে করেন, নারী উদ্যোক্তা হতে আগ্রহী নারীদের পথ দেখানো, তাদের সমস্যা সমাধান, সাহস ও ভরসা দেয়া আর উৎসাহ যোগানোর মাধ্যমে সামনে এগিয়ে নিতে নারী উদ্যোক্তা উন্নয়ন ইউনিটের কর্মীদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে।

“নারীদের অধিক দায়িত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক কাজ করার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাদের গৃহকর্মে নিয়োজিত রাখা জাতীয় সম্পদের অপচয় ছাড়া কিছু নয়। তাদের  শ্রমের স্বীকৃতি আর মেধা,  যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী পেশা নির্বাচনের অধিকার নারীর ক্ষমতায়ন ও অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম  উপায়,” বেনারকে জানান সাংসদ ও কমর্জীবী নারীর সভাপতি শিরীন আক্তার।


অনেকে আশার আলো দেখছেন

নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ বিতরণের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, উত্তরোত্তর  ঋণ বিতরণের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব তহবিলের ১৫ শতাংশ শুধুমাত্র নারীদের জন্য বরাদ্দ রেখে স্বতন্ত্র ‘‘ বাংলাদেশ ব্যাংক নারী উদ্যোক্তা তহবিল”  গঠন করা হয়। এ তহবিল থেকে ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তারা স্বল্প সুদে (ব্যাংক রেট+৫%) ঋণ গ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।

২০১২ সালের তুলনায় ২০১৩ সালে নারী উদ্যোক্তা খাতে এসএমই ঋণ বিতরণ ৫০.৪৭ শতাংশ  বৃদ্ধি পেয়েছে।  
অন্যদিকে ২০১৩ সালের তুলনায় ২০১৪ সালে নারী উদ্যোক্তা খাতে এসএমই ঋণ বিতরণ ১৭.৫৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

মোট এসএমই উদ্যোগে ঋণ বিতরণের মধ্যে নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ বিতরণের হার ২০১০ সালে ছিল ৩.২২ শতাংশ,  পক্ষান্তরে ২০১৪ সালের জুনে  তা ৩.৮০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

চট্টগ্রামের হালিশহর এলাকার নারী উদ্যোক্তা লতিফা আক্তার। অগ্রণী ব্যাংক থেকে ১০ লাখ টাকা এসএমই ঋণ নিয়ে শুরু করেন বুটিক ব্যবসা।  ব্যবসা ভালো চলায় ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করছিলেন সময়মতো।

“কিন্তু সব হিসাব-নিকাশ বদলে দিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। জানুয়ারির পর থেকে ব্যবসায় নেমে আসে স্থবিরতা। ব্যবসা মন্দার কারণে সময়মত কয়েকটি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে পারিনি। এখন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এসেছে,”  জানান লতিফা।

লতিফা আক্তারের মতোই অবস্থা দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার। হরতাল-অবরোধ এলে তারা  ভীত হন,  এরপর তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেন।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক আগামী নভেম্বরে ব্যাংকিং মেলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেলায় নেদারল্যান্ডের রানী ম্যাক্সিমাকে আমন্ত্রণ করা হয়েছে। তাকে নারী উদ্যোক্তাদের সাফল্য দেখাতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।