নয় নারী রাষ্ট্রদূতের উদ্বেগ‏, নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের আবেদন

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2015.12.08
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
BD-women ভুটান, ব্রাজিল, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, শ্রীলঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র- এই নয় দেশের নারী রাষ্ট্রদূত মঙ্গলবার যৌথ বিবৃতি দেন।
বেনার নিউজ

বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে নারী নির্যাতন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন এদেশে নিযুক্ত নয়টি দেশের নারী রাষ্ট্রদূতরা। নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সাড়া দেওয়া ও সহিংসতা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা জরুরি ভিত্তিতে আমলে নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা। নারীর প্রতি সহিংসতা বিরোধী কর্মতৎপরতা প্রচারে ১৬ দিনব্যাপী কর্মসূচির অংশ হিসেবে এক যৌথ নিবন্ধে এসব আহবান জানান ঢাকাস্থ এই নারী কূটনীতিকরা।

নিবন্ধে তারা বলেন, নয়টি জাতির প্রতিনিধিত্ব করে বাংলাদেশে নিযুক্ত নয় জাতির নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে আমরা অবশ্যই অনেক বিষয় নিয়েই কাজ করছি। তবুও আমরা এ ব্যাপারে একমত যে সারা বিশ্বে, আমাদের দেশে এবং বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে সাড়া দেওয়া ও সহিংসতা প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তা জরুরি ভিত্তিতে আমলে নেওয়া উচিত।

একটি গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তারা বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা (জেন্ডার বেজড ভায়োলেন্স -জিবিভি) ভয়ানক আকারে সারা বিশ্বে বিস্তৃত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী প্রতি তিনজনের একজন নারী তাঁর জীবনে সঙ্গীর দ্বারা শারীরিক বা যৌন নিপীড়নের শিকার হন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০১১ অনুযায়ী বাংলাদেশে শতকরা ৮৭ ভাগ বিবাহিত নারী তাঁদের স্বামীর হাতে নিগৃহীত হন। আমরা সবাই এসব সহিংসতা প্রতিরোধে কিছু করতে পারি।


‘নারীর প্রতি সহিংসতা সমস্ত সম্প্রদায়ের ওপর হুমকি’

এই নয় নারী কূটনীতিক আরো উল্লেখ করেন, নারীর প্রতি সহিংসতা সমস্ত সম্প্রদায়ের ওপর হুমকিস্বরূপ। এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস করে এবং সহিংসতা ও দ্বন্দ্বকে উসকে দেয়। বিশ্ব ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যায়, নারীর ওপর সহিংসতার উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক বিরূপ প্রভাব রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়, নারীদের আয়ের উৎস হারানো, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং বংশ পরম্পরায় নেতিবাচক প্রভাব।

‘ইউএন উইমেন’ অনুযায়ী, ১৫ থেকে ৪৪ বছর পর্যন্ত নারী ও মেয়েশিশুদের ক্ষেত্রে সমষ্টিগতভাবে ক্যানসার, সড়ক দুর্ঘটনা, ম্যালেরিয়া এবং যুদ্ধের কারণে যতজনের মৃত্যু হয়; তার চেয়ে সহিংসতার শিকার হয়ে মৃত্যু ও শারীরিকভাবে অক্ষম হয়ে যাওয়া নারী-মেয়েশিশুর সংখ্যা বেশি।

জীবন-সঙ্গীর কাছ থেকে সহিংসতার শিকার হওয়া থেকে শুরু করে যৌন হয়রানি এবং জোরপূর্বক বিয়েসহ নারীর প্রতি সহিংসতার বহু ধরন রয়েছে। সহিংসতা যে রকমই হোক তা আমাদের সামগ্রিক মানবতার জন্য কলঙ্ক, শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য বাধা এবং তা আমাদের এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য আহ্বান জানায়। সহিংসতা অত্যাবশ্যকীয় নয় এবং আমরা প্রত্যেকেই এটি বন্ধের জন্য কাজ করতে পারি।


১৬ দিনের তৎপরতা

তারা বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের কর্মতৎপরতা’ সবার জন্য এ ব্যাপারে কাজ করার একটি সুযোগ। প্রতি বছর ২৫শে নভেম্বর নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ দিবসে ১৬ দিনের কর্মতৎপরতা শুরু হয়, যেটি ১০ই ডিসেম্বর মানবাধিকার দিবসে শেষ হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে শুরু হওয়া এই প্রচারাভিযানে নারী ও পুরুষ, ছেলে ও মেয়ে, সরকারি কর্মকর্তা এবং কমিউনিটি নেতাসহ সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। সারা বিশ্ব ও বাংলাদেশ জুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতাবিরোধী সচেতনতা ও প্রথা তৈরিতে মানুষ কাজ করছে, যা এই অভিশাপ থেকে মুক্তির পূর্বশর্ত।


দৃষ্টি এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে

নয় নারী কূটনীতিক বলেন, বৈশ্বিক পর্যায়ে আমরা যে দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করি: ভুটান, ব্রাজিল, ডেনমার্ক, ফ্রান্স, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, শ্রীলঙ্কা এবং যুক্তরাষ্ট্র-এই দেশগুলো নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাকে (এসডিজি) সামনে রেখে জাতিসংঘের সঙ্গে কাজ করছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পরস্পর সম্পর্কিত লিঙ্গসমতা এবং নারী ও কন্যাশিশুর ক্ষমতায়নে জোর দেয়। এই বিষয়ে আমাদের অবশ্যই দৃষ্টিপাত করতে হবে যদি আমরা উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলো অর্জন করতে চাই। এখন বাস্তবায়নের প্রতি আমাদের দৃষ্টি দিতে হবে। এ প্রচেষ্টায় অন্যান্য সরকার, বেসরকারি খাত এবং বিশেষ করে সুশীল সমাজের সঙ্গে অংশীদারত্ব খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


পুরুষদের শেখাতে হবে

নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে পুরুষদের শেখানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এই নয় নারী দূত। যৌথ নিবন্ধে তারা বলেন, ‘আমরা প্রত্যেকেই আমাদের জীবনে পদক্ষেপ নিতে পারি। ভুক্তভোগীদের কথা শুনে এবং তাদের বিশ্বাস করে আমরা তাদের সহায়তা করতে পারি। পুরুষ ও ছেলেদের শেখাতে পারি যেন তারা নারী ও মেয়েদের সহযোগিতা করে এবং তাদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়’।

তারা বলেন, দেশে এবং বিদেশে আমাদের সরকারগুলো নারীর প্রতি সহিংসতাবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক প্রকল্পে সহায়তা দেয়, নীতিনির্ধারকদের এই বিষয়ে শিক্ষা দেয়, যেন আইনি সহায়তা বাড়ানো যায়, সেবাদানকারীদের প্রশিক্ষণ দেয়, যেন তারা ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনগুলো ভালোভাবে চিহ্নিত করতে পারে এবং বিচার ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধি করতে পারে। আমরা সেই সব প্রকল্পে অনুদান দিই যে সব প্রকল্প ভুক্তভোগীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও কারিগরি শিক্ষা প্রদান করে এবং ধর্মীয়, ব্যবসায়িক ও সামাজিক নেতাদের সঙ্গে কাজ করি, যেন নারীর প্রতি বিভিন্ন ধরনের সহিংসতা বন্ধ করা যায়।

আমরা এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়েছি কারণ আরও একটি বিষয়ে আমরা সবাই একমত যে, শুধু সমষ্টিগত পদক্ষেপের মাধ্যমেই নারী ও মেয়েদের প্রতি সহিংসতা চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব।


যৌথ নিবন্ধে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রদূতেরা

যৌথ নিবন্ধটিতে স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রদূতেরা হলেন: পেমা শোডেন, রাজকীয় ভুটান দূতাবাস; ওয়ানজা ক্যাম্পোস দ্য নব্রেগা, ব্রাজিল; হ্যান ফুগল এস্কেয়ার, ডেনমার্ক; সোফি অবেয়ার, ফ্রান্স; ম্যাডাম নোরলিন বিন্তি ওসমান, মালয়েশিয়া; লিওনি মার্গারিটা কুয়েলেনায়ের, নেদারল্যান্ডস; মেরেটে লুন্ডিমো, নরওয়ে; ইয়াসোজা গুনাসেকেরা, শ্রীলঙ্কা ও মার্শা বার্নিকাট, যুক্তরাষ্ট্র।


বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূত যা বললেন

তবে নারীর প্রতি সহিংতার রোধের বিভিন্ন সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলোর চেয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষ্যনীয় বলে মন্তব্য করেছন থাইল্যান্ডে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইদা মুনা তাসনিম। তিনি বেনারকে বলেন, ‘আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক উদ্যোগের সমন্বয়ে বাংলাদেশ নারীর প্রতি সহিংসতা যৌন হয়রানি বাল্য বিবাহসহ প্রতিটি সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্রমান্বয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।’


প্রয়োজন আইনের বাস্তবায়ন

নারী রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী  বেনারকে বলেন, ‘দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নির্যাতনের ধরনেও নিত্যনতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। শুধু শাররিক নির্যাতন ছাড়াও নারীর মানবাধিকারের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। এমন অবস্থায় রাষ্ট্রদূতদের উদ্বেগ অমূলক নয়। তবে এখনই সময় নারীর প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর। পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও সাধারণ মানুষকে এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। এছাড়া আইনের শাসন নিশ্চত করা অত্যন্ত জরুরি।’

এদিকে হিউম্যান রাইটস এন্ড পিস ফর বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মনজিল মোরসেদ বেনারকে বলেন, ‘আমাদের দেশে নারী নির্যাতন নিয়ে অনেক কঠোর আইন আছে। তবে এগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন থেকে আমরা এখনো অনেক পেছনে। সচেতনতা সৃষ্টি ও আইনের বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা সম্ভব।’

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।