Follow us

রানা প্লাজা হত্যা মামলা আটকে আছে হাইকোর্টে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-04-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের একাংশ , ২৪ এপ্রিল, ২০১৩
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপের একাংশ , ২৪ এপ্রিল, ২০১৩
ফটো: মেঘ মনির

রানা প্লাজা ভবন ধসের ছয় বছর পূর্ণ হচ্ছে বুধবার। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল ওই ভবন ভেঙে পড়লে ১ হাজার ১৩৬ জন তৈরি পোশাক কর্মী মৃত্যুবরণ করেন।

তবে তিন বছর আগে অভিযুক্ত হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে নিম্ন বিচারিক আদালতে চার্জ গঠন করা হলেও তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাচ্ছে না। কারণ, অভিযুক্তদের মধ্য থেকে দুজনকে হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে বিচার করার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে কি না, এব্যাপারে হাইকোর্টে দায়ের করা দুটি আপিল এখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়নি।

দুবছর তদন্তের পর রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা এবং ওই ভবনে অবস্থিত তৈরি পোশাক কারখানার মালিক ও তাদের কিছু কর্মী যারা শত শত কর্মীকে ফাটল ধরা ভবনের ভেতরে ঢুকে কাজ করতে বাধ্য করেছিল তাদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ দায়ের করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে, ছয় বছর পার হওয়ার পরও সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু না হওয়ায় ভুক্তভোগীরা বলছেন, তারা বিচার পাবেন এমন আশা করেন না।

রানা প্লাজা ধসের মূল হত্যাকাণ্ড মামলার সরকারি কৌঁসুলি খন্দকার আব্দুল মান্নান বেনারকে বলেন, “তদন্তের পর ২০১৫ সালে ৪১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে পুলিশ। আদালত ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ওই ৪১ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে।” তিনি বলেন, “কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয় তাদের মধ্যে আট আসামি বিচারিক আদালতের চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করে। এর ফলে ২০১৬ সালের পর থেকে আমরা আর সাক্ষী গ্রহণ করতে পারছি না।”
আব্দুল মান্নান বলেন, “যতদিন হাইকোর্ট ওই আটজনের করা আপিলের রায় না দেবে তত দিন বিচারিক আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে না।”

তিনি বলেন, “তবে আশার কথা হলো, আদালত এপর্যন্ত আটজনের আপিলের মধ্যে ছয়জনের করা আপিল খারিজ করে দিয়েছে। আর দুজনের আপিলের ব্যাপারে কোনো রায় আসেনি। ওই দুজনের আপিলের রায় পেলেই আমরা সাক্ষ্য গ্রহণ করে বিচার শুরু করতে পারব।”

আব্দুল মান্নান বলেন, সাভার পৌরসভার সাবেক মেয়র রেফাতুল্লাহ এবং সাভার পৌর কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলীর আপিলের ব্যাপারে হাইকোর্ট এখনো কোনো রায় দেননি। তিনি বলেন, মোট ৪১ জনের মধ্যে মূল আসামি ও ভবনের মালিক সোহেল রানা জেলে রয়েছে, ছয়জন পলাতক, দুজন মারা গেছেন এবং বাকিরা জামিনে রয়েছে।

আবদুল মান্নান বলেন, মূল হত্যাকাণ্ড মামলায় মোট ৫৯৪ জন সাক্ষী রয়েছে। তবে সবাইকে সাক্ষী দিতে ডাকা হবে না।
তিনি বলেন, “যেকজন সাক্ষী দিলে আমরা মামলায় রায় পাব, সেই কজনেকই সাক্ষী দিতে ডাকা হবে।”

২০১৩ সালে ২৪ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভার শিল্পনগরীতে নয়তলা রানা প্লাজা ভবন ধসে ১১৩৬ জন নিরীহ মানুষ প্রাণ হারায়। ওই ভবনে বেশ কয়েকটি তৈরি পোশাক কারখানা ছিল যেগুলো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের জন্য পোশাক তৈরি করত।
ভবনটি নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরী করা হয়। তা ছাড়া, ভবনটি অনুমতি ছাড়াই নয়তলায় রূপান্তর করা হয়।
ঘটনার আগের দিন রাতেই ভবনটিতে বড় ফাটল দেখা দেয়। সকালে কর্মীরা সেটি দেখে ভবনের ভেতরে যেতে অস্বীকৃতি জানায়।

তবে কারখানার মালিকদের কিছু কর্মচারী, ভবনের মালিক ও অন্যান্যরা চাকরির ভয় দেখিয়ে কর্মীদের ভবনের ভেতরে কাজ করতে বাধ্য করে। তারা ভবনে প্রবেশের কিছুক্ষণ প্রবেশের পরই পুরো ভবন ধসে পড়ে।
সেদিনের ঘটনা স্মরণ করে ভবন থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া গার্মেন্টস কর্মী নার্গিস আক্তার বেনারকে বলেন, তিনি আট তলায় একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন।
তিনি বলেন, “আমাদের ভয় দেখিয়ে বলা হয়, কাজ না করলে চাকরি নাই। তাই আমরা সবাই ভেতরে যাই। আল্লাহ, আল্লাহ করছিলাম যাতে সেদিন অন্তত প্রাণে বাঁচি। কিন্তু দেখি হঠাৎ ওপর থেকে হুড়মুড় করে বিল্ডিং ভেঙে পড়ছে। আমি দেয়ালের কাছে ছিলাম। তাই আমার মাথায় কিছু পড়েনি।”

নার্গিস বলেন, “আমার সামনে কতজন যে চিৎকার করতে করতে মারা গেল তার কোনো হিসাব নেই। আমি এখনো রাতে ঘুমাতে পারি না। মনে হয় এখুনি ছাদ ভেঙে পড়বে।”

তিনি বলেন, “আমরা বিচার পাব না। কারণ, রানা প্লাজায় গরিব মানুষ মরেছে। গরিবের জন্য কেউ কাঁদে না। যদি ওই ভবনে ১০টি বড়লোক মারা যেত তাহলে দেখতেন এত দিনে সবার ফাঁসি হয়ে যেতো।”
প্রবীণ ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ওয়াজেদুল ইসলাম খান বেনারকে বলেন, “আমরা খুব হতাশ। ছয় বছর হয়ে গেলো, কিন্তু এখনো মূল মামলার সাক্ষী নেওয়া শুরু হলো না। আমরা বিচার বিভাগের প্রতি আবেদন জানাই তারা যেন আইনের শাসনের স্বার্থে রানা প্লাজা হত্যাকাণ্ড মামলার বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করেন।”

রানা প্লাজা ভবন থেকে বেঁচে যাওয়া তরুণ মাহমুদল হাসান হৃদয় সোমবার থেকে যে স্থানে রানা প্লাজা ছিল সেই ফাঁকা জমিতে অনশন শুরু করেছেন। তিনি ১১-দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অনশন করছেন।
হৃদয় সাংবাদিকদের বলেন, রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে ৪৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরন দিতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিটি পরিবারকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অথবা অসুস্থ হয়েছেন তাদের আজীবন চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।

তিনি বলেন, “তার সকল দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনশন চালিয়ে যাবেন।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন