বাংলাদেশে চার রাজাকারের ফাঁসি ও একজনের আমৃত্যু কারাদণ্ড

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016.05.03
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
2016-05-03-ৈৈৈৈৈৈ620.jpg যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও ফাঁসির দাবিতে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের মানববন্ধন। মে ৩, ২০১৬
ফোকাস বাংলা

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে চার রাজাকারকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন বাংলাদেশের আদালত। একইসঙ্গে আরও একজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

প্রধান প্রধান যুদ্ধাপরাধীদের পাশাপাশি ‘ক্ষুদে’ রাজাকারদেরও বিচার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। আর এসব বিচারের মধ্য দিয়ে দেশ বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসছে বলে মনে করে রাষ্ট্রপক্ষ।

দণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ রাজাকার

মঙ্গলবার বিচারপতি আনোয়ারুল হক নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পাঁচ যুদ্ধাপরাধীর বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করে।

এরা হলেন কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের দুই সহোদর অ্যাডভোকেট শামসুদ্দিন আহমেদ ও সেনাবাহিনীর বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মো. নাসিরউদ্দিন আহমেদ, রাজাকার কমান্ডার গাজী আব্দুল মান্নান, আজহারুল ইসলাম ও হাফিজউদ্দিন। এদের মধ্যে আজহারুলের আমৃত্যু কারাদণ্ড ও বাকিদের ফাঁসির রায় হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বা গুলি করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের রায় কার্যকর করতে পারবে সরকার।

রায়ের সময় আইনজীবী শামসুদ্দিন আহমেদই কেবল কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। বাকিরা মামলার শুরু থেকেই পলাতক রয়েছেন। তাদেরকে গ্রেপ্তারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র সচিব ও পুলিশ মহাপরিদর্শককে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইন্টারপোলের সহযোগিতা নিতেও বলা হয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দণ্ডপ্রাপ্ত এই পাঁচজন বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাক দখলদার বাহিনীকে সহায়তাকারী রাজাকার বাহিনীতে যোগ দেন।

সেই সময় কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বিদ্যানগর, আয়লা, ফতেপুর বিল, কিরাটন বিলসহ আশপাশের কয়েকটি গ্রামে তাদের মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের বর্ণনা উঠে আসে মামলার রায়ে।

যেসব অপরাধে সাজা

প্রসিকিউশন পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগ আদালতে উত্থাপন করে। যার সবগুলোই আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

আসামিদের বিরুদ্ধে আনা প্রথম অভিযোগ কিশোরগঞ্জে করিমগঞ্জ থানায় বিদ্যানগর ও আইলা গ্রামে ৮ জনকে হত্যা। পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধেই এ অভিযোগটি প্রমাণিত হয়েছে। দুই নম্বর অভিযোগে আইলা গ্রামে মিয়া হোসেনকে হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন নাসিরুদ্দিন আহমেদ। একই উপজেলার মো. গফুরকে অপহরণ ও হত্যার দায়ে চারজনের অপরাধ প্রমাণিত চার নম্বর অভিযোগে। তবে এ অভিযোগ থেকে খালাস পেয়েছেন মান্নান।

করিমগঞ্জ ডাকবাংলোতে শান্তি কমিটির কার্যালয়ে মো. ফজলুর রহমানকে অপহরণ করে হত্যার অভিযোগে (চার নম্বর) দোষী সাব্যস্ত হয় পাঁচ রাজাকারই। রামনগর গ্রামে পরশ চন্দ্র সরকারকে হত্যার অভিযোগটি (৫ নম্বর) প্রমাণিত হয় শামসুদ্দিনের বিরুদ্ধে।

গাজী মো. মান্নান দোষী প্রমাণিত হন পূর্ব নবাইদ কালিপুর গ্রামে আবু বকর সিদ্দিক ও রুপালি মিয়াকে অপহরণ, নির্যাতন ও হত্যার এ অভিযোগে (৬ নম্বর)। এ ছাড়া মান্নান আতকাপাড়া গ্রামে হামলা চালিয়ে ২০-২৫টি বাড়িতে অগ্নিসংযোগের দায়েও (৭ নম্বর অভিযোগ) দোষী প্রমাণিত হন।

অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, একাত্তরে গাজী আব্দুল মান্নান স্থানীয় রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার ও সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। তারই নেতৃত্বে শামসুদ্দিন আহমেদ ও তার বড় ভাই নাসিরউদ্দিন আহমেদ রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে করিমগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধাপরাধে করেন। পরে দেশ স্বাধীন হলে কিছুদিন পালিয়ে থেকে আবারও সমাজের মূল ধারায় মিশে যান দুই ভাই।

সাজাপ্রাপ্ত হাফিজউদ্দিন ও আজহারুল ইসলামও সেসময় রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করে বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান।

এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৫ জন সাক্ষ্য দিলেও আসামিপক্ষে কোনো সাক্ষী ছিল না। রায়ের পরপরই দণ্ডপ্রাপ্ত শামসুদ্দিন ‘মিথ্যা সাক্ষীতে’ সাজা হয়েছে বলে অভিযোগ তোলেন। আসামি পক্ষও ন্যায়বিচার পায়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করে।

এ বিষয়ে শামসুদ্দিন আহমেদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ রানা বেনারকে বলেন, “রায়ে আমরা ক্ষুব্ধ, আসামি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার।”

পলাতক অন্য চার আসামির পক্ষে রাষ্ট্র নিযুক্ত আইনজীবী আবদুস শুকুরও বলেন, “রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। পলাতক আসামিরা আত্মসমর্পণ করে আপিল করলে সেখানে আমরা সুবিচার পাব বলে আশা করি।”

তবে এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছ রাষ্ট্রপক্ষ। একইসঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার ২৩তম এ রায়টিকে তারা উৎসর্গ করেছে শহীদ জননী জাহানারা ইমামকে।

এ বিষয়ে প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ সীমন বলেন, ‘শহীদ জননীর জন্ম বার্ষিকীতে পাঁচ রাজাকারের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া রায় নিঃসন্দেহে তাঁর আত্মাকে শান্তি দেবে। এ রায় আমাদের বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার এক অনন্য উদাহরণও হয়ে থাকবে।

নিজামীর রিভিউ আবেদনের রায় বৃহস্পতিবার

এদিকে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আরেক ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর রায় পুনর্বিবেচনা করার আবেদনের শুনানি শেষ হয়েছে মঙ্গলবার। আগামী বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার দিন ধার্য করেছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চ।

মামলার বিচারিক প্রক্রিয়ার সর্বশেষ এই ধাপে যদি নিজামীর ফাঁসির রায় বহাল থাকে, তাহলে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার সুযোগের পরই দণ্ড কার্যকরের বিষয়টি আসবে।

আর নিজামীর দণ্ড কার্যকর হওয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মূল নেতা হোতাদের বেশিরভাগেরই বিচার শেষ হবে।

২০১০ সালের ২৫ মার্চ থেকে শুরু হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এ পর্যন্ত ২৩টি রায় দিয়েছে। প্রধান নেতাদের বিচারের পর এবার ছোটখাটো যুদ্ধাপরাধী নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো আদালতে আসছে।

আঞ্চলিক এসব নেতার বিচারে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার ক্ষতিগ্রস্তরা।

পাঁচ রাজাকারের দণ্ডের খবর শুনে কিশোরগঞ্জের একাত্তরের শহীদ আব্দুল হামিদের স্ত্রী রাবিয়া খাতুন (৮০) তার প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “রাজাকার শামসুদ্দিন আর নাসিরউদ্দিন আমার স্বামীকে ধরে নিয়ে যায়। শুনেছি তারাই তাকে মেরে ফেলে। মরবার আগে শুধু একবার শুনতে চাই এসব রাজাকারের ফাঁসি হয়েছে।”

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।