গুলশান হামলার জঙ্গিদের বক্তব্য সম্বলিত আইএসের নতুন ভিডিও প্রকাশ

বেনার নিউজ স্টাফ,ঢাকা
2016.09.27
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
20160926_BD_IS_video-620b.jpg গুলশান হামলার ওপর আইএসসের প্রকাশিত নতুন ভিডিওতে নিবরাস ইসলামকে এভাবেই ধারালো ছুরি ও একে -৪৭ হাতে দেখা যায়। সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৬।
বেনার নিউজ

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস) রাজধানীর গুলশান হামলার ওপর একটি নতুন ভিডিও প্রকাশের দাবি করেছে, যা নিয়ে ইতিমধ্যে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে। যদিও বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো বাংলা ও আরবি ভাষায় প্রকাশিত এই ভিডিওটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচার বা প্রকাশ করেনি।

গত বৃহস্পতিবার গুলশান হামলায় জড়িত পাঁচ জঙ্গিসহ ছয়জনের মৃতদেহ বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন করার পরপরই শুক্রবার ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়। এর আগে  গত ৫ জুলাই বাংলায় আরেকটি ভিডিও প্রকাশ করেছিল আইএস। তবে এবারের ভিডিওটি বেশ পরিকল্পিত বলে মনে করা হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভিডিওচিত্রটি এমন ধারণাকে পাকাপোক্ত করে যে, সিরিয়া এবং ইরাকে পর্যুদস্ত আইএস হয়তো বাংলাদেশে তাদের শক্ত ঘাঁটি গাড়তে ও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাহেদুল আনাম খান বেনারকে বলেন, “ভিডিওটি প্রকাশ করা হলো হামলাকারী পাঁচ তরুণের অজ্ঞাতনামা হিসেবে লাশ দাফনের পরপরই। এর মাধ্যমে তারা জানাতে চায় যে তারা শেষ হয়ে যায়নি”।

“এই ভিডিও চিত্রটি ধারণ করার অন্য একটি কারণও থেকে থাকতে পারে। হয়তো তারা সিরিয়ায় আইএসর নেতাদের দেখাতে চেয়েছে যে বাংলাদেশে তারা সক্রিয় আছে,” জানান শাহেদুল আনাম।

তিনি বলেন, “এর মাধ্যমে তারা বিশ্বকে এই বার্তা দিতে চায় যে আপাতদৃষ্টে আন্তর্জাতিক চাপে পিছু হটলেও, তারা তাদের তথাকথিত আদর্শ ও ভীতি প্রচারের ক্ষমতা রাখে”।

ভিডিও ধারণের স্থান নিয়ে প্রশ্ন

ভিডিওটি ধারণ করার স্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পুলিশ বলছে, ভিডিও ধারণের স্থানটি কোথায় তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এটি কোনো গ্রামীণ এবং নির্জন এলাকা বলে পুলিশের ধারণা। ভিডিওতে পাখির ডাক শোনা যায়। বাচ্চাদের চিৎকার, গরু-বাছুরের ডাকের আওয়াজও শোনা গেছে।

ভিডিওতে, গুলশান হামলার ঘটনায় নিহত পাঁচজন জঙ্গি কালো পাঞ্জাবি এবং মাথায় বিশেষ ধরনের স্কার্ফ পরে আইএসের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে আইএসের সমর্থনে বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

কথা বলার সময় তাদের হাতে একে ৪৭ রাইফেল ও ধারালো ছুরি দেখা যায়। এছাড়া পাঁচ জঙ্গির ছবির পাশে বাংলা ও আরবি ভাষায় তাদের সাংগঠনিক নাম দেখা যায়।

“আমরা সব সময় বলে আসছি আইএসের ভিত্তি, সাংগঠনিক কাঠামো বা কোনো নেতার অস্তিত্ব এ দেশে নেই। কিছু খণ্ড খণ্ড পুরোনো ভিডিও ক্লিপ যুক্ত করে এবং মিডিয়ার মাধ্যমে আপলোড করে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হচ্ছে,” বেনারকে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের কয়েকটি অঞ্চলে ভিডিওটি তৈরি করা হতে পারে, এরপর বিদেশে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এটা আইএস করেছে এমনটি নয়। এটা এ দেশীয় জঙ্গিদের কাজ। তদন্তকারীরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।

তিনি আরও বলেন, “এ দেশের মানুষ আইএস পছন্দ করে না, জঙ্গিদের আশ্রয়–প্রশ্রয়ও দেয় না। কাজেই এ দেশে আইএস আসবে কোথা থেকে? পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের মতো এ দেশে আইএস কখনোই আশ্রয়–প্রশ্রয় পাবে না,” জানান আসাদুজ্জামান।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক শাহেদুল আনাম খান বলেন, এ ভিডিওচিত্রটি ধারণ করা হয়েছে বাংলাদেশে। আগে আইএসের যে ভিডিওটি প্রকাশ হয়েছিল সেটি ধারণ করা হয়েছিল কোনো বিদেশি শহরে। সেখানে অনেক যানবাহনের উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

তাঁর মতে, নতুন এই ভিডিওটি বাংলাদেশের ভেতরেই ধারণ করা হয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলাকারী পাঁচ তরুণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে একই ভাবে অস্ত্র ও ছোরা দেখিয়ে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছিল। ভিডিওচিত্রটি ধারণের পর হয়তো তা সিরিয়ায় পাঠানো হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া ও জনসংযোগ শাখার উপকমিশনার মাসুদুর রহমান বেনারকে বলেন, “ভিডিওটিতে ছবি ও কথার মধ্যে যথেষ্ট অসামঞ্জস্য রয়েছে”।

“তারপরও এই ভিডিওটি কোথায় ধারণ করা হয়েছে বা কারা এটি করেছে সে বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি,” জানান ওই পুলিশ কর্মকর্তা।

সাইটটি বন্ধ করা হবে কিনা

হেভি ডট কম নামের নিউজ অ্যান্ড ইনফরমেশন পোর্টালটিতে ভিডিওটি দেখা যায়। ওয়েবসাইটটির তথ্য অনুযায়ী, এটি নিউইয়র্কভিত্তিক ডিজিটাল মিডিয়া

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিটিআরসি) ইতিমধ্যে ভিডিওটি বন্ধের বিষয় নিয়ে কাজ করছে। সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ইউটিউব কর্তৃপক্ষকে ভিডিওটি নামানোর অনুরোধ করা হয়েছে।

বিটিআরসির সচিব ও মুখপাত্র সারোয়ার আলম বেনারকে জানান, “সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে বিটিআরসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী বিটিআরসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে।” ওই সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে থেকে ইউটিউবের কোনো একক ভিডিও ব্লক করার সুযোগ নেই।

ভিডিওতে যা আছে

মোট ১৪ মিনিট ৫৮ সেকেন্ডের ভিডিওটিতে আরবির পাশাপাশি বাংলায় বক্তব্য রাখা হয়েছে। গত ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার পর কমান্ডো অভিযানে নিহত পাঁচ জঙ্গির কথাবার্তা, হামলার ঘটনা এবং আইএসের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে বাংলা ভাষায় তৈরি ওই ভিডিওতে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি তৎপরতা নজরদারি সংস্থা সাইট ইন্টেলিজেন্স আইএসের কথিত সংবাদ সংস্থা আমাকের বরাত দিয়ে শুক্রবার দিবাগত রাতে এ ভিডিও প্রকাশের তথ্য জানিয়েছে।

ভিডিওটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া, কয়েকজন ধর্মীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজনের সমালোচনা করে বক্তব্য দেওয়া হয়েছে।

বাংলা এই ভিডিওতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ বিশ্বনেতাদের 'কাফের' হিসেবে চিহ্নিত করে বলা হয়, মুসলিমদের তাদের প্রতি কঠোর হতে হবে।

ভিডিওতে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন ধর্মীয় নেতার কথা বলা হয়েছে। যেমন শোলাকিয়া ঈদ জামাতের ইমাম ফরিদ উদ্দিন মাসউদকে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে, তিনি আসলে সরকারপক্ষের লোক।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ফরিদ উদ্দিন মাসউদ বেনারকে বলেন, “ইসলাম মানুষ হত্যা সমর্থন করে না। জঙ্গিবাদীদের ইসলাম প্রকৃত ইসলাম নয়”।

দুর্বল হলেও নির্মূল হয়নি

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক বেনারকে বলেন, হলি আর্টিজানের ঘটনার পর বোঝা গেল জঙ্গিদের শেকড় কতটা গভীরে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও বিষয়টি পুরোপুরি আন্দাজ করতে পেরেছে এবং সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিচ্ছে।

“জঙ্গিদের যখন প্রায় কোণঠাসা করে ফেলা হয়েছে, তখন এই ভিডিও প্রমাণ করে তারা দুর্বল হলেও নির্মূল হয়নি,” মনে করেন ওই শিক্ষক।

ওমর ফারুক বলেন, সবচেয়ে বড় অ্যালার্মিং বিষয় হচ্ছে, শিক্ষার্থী ও তরুণদের ‘মগজ ধোলাই’ করা হয়েছে, যা দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। এটা দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য এবং ইসলাম ধর্ম ও মুসলিমদের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

গত ১ জুলাই জঙ্গিরা গুলশানে হলি আর্টিজানে হামলা চালিয়ে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে। তাৎক্ষণিক অভিযান চালাতে নিহত হন পুলিশের দুজন কর্মকর্তা। ইরাক-সিরিয়াভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএস ওই হামলা ও হত্যাযজ্ঞের দায় স্বীকার করে বিবৃতি দিলেও সরকার ও বাংলাদেশ পুলিশ বলছে, এ ঘটনায় নব্য জেএমবি জড়িত।

পরে জিম্মি উদ্ধার অভিযানে হামলায় জড়িত পাঁচ জঙ্গি এবং ওই রেস্তোরাঁর এক পাচক সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার হওয়া রেস্তোরাঁর আরেক কর্মী জাকির হোসেন ওরফে শাওন পরে হাসপাতালে মারা যান।

সিঙ্গাপুরের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিবৃতি

সিঙ্গাপুরের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর পলিটিক্যাল ভায়োলেন্স অ্যান্ড টেররিজম রিসার্চের এক বিবৃতিতে বলা হয়,  গত ২৪ সেপ্টেম্বর আইএস জঙ্গিগোষ্ঠী ১৪ মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। এই ভিডিওটি ‘আইএস বেঙ্গল ইউনিট’ নামের নতুন একটি ইউনিটের প্রযোজনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ভিডিওটিতে ধারাভাষ্য দেওয়া হয়েছে বিশুদ্ধ বাংলায়। সঙ্গে যুক্ত করা আরবি সাব টাইটেল। ওই ভিডিওর একটি বড় অংশে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলাকারীদের দেখা গেছে। ভিডিওতে তারা বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিষোদগার করে তাঁদেরকে ‘মুরতাদ’ বলে আখ্যায়িত করেছে।

ওই ফুটেজে হোলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার আগে সেখানে আসা অতিথিদের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে। ফুটেজে বলা হয়েছে হামলা আইএস চালালেও মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমে আইএসের দাবির কথা প্রচার করা হয়নি। ফুটেজের বিভিন্ন অংশে দেখানো হয়েছে ওই রাতে রেস্তোরাঁর ভিতরে চালানো হত্যাযজ্ঞের বীভৎস সব চিত্র।

এর পরই ভিডিওচিত্রে দেখা যায় গুলশানের হামলাকারী পাঁচ তরুণকে। তাদের হাতে ছিল রাইফেল, আর চকচকে ধারালো ছোরা। তারা তাদের হাতে থাকা ছোরা আক্রমণের ভঙ্গিতে প্রদর্শন করছিল।

তারা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, পুলিশের জঙ্গিবাদবিরোধী ইউনিট ও র‍্যাবের ওপর হামলার হুমকি দিয়েছে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ওই বিবৃতিতে বলা হয়, তারা নিজেদের পরিচয় দিয়েছে আবু উমায়ের আল-বাঙ্গালী (খাইরুল ইসলাম পায়েল), আবু রাহিক আল-বাঙ্গালী(রোহান ইবনে ইমতিয়াজ), আবু মুহারিব আল-বাঙ্গালী(নিবরাস ইসলাম), আবু মুসলিম আল বাঙ্গালী(শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল) এবং আবু সালামাহ আল বাঙ্গালী (মীর সামেহ মোবাশ্বের)।তারা দাম্ভিক ভঙ্গিতে অমুসলিমদের যেখানে পাবে সেখানেই হত্যার কথা বলে।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।