Follow us

মন্দিরে হামলার ঘটনায় পুলিশ ওপ্রশাসন সমালোচিত হচ্ছে

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-11-02
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় বাম মোর্চার বিক্ষোভ। নভেম্বর ০২, ২০১৬।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দুদের মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার প্রতিবাদে ঢাকায় বাম মোর্চার বিক্ষোভ। নভেম্বর ০২, ২০১৬।
নিউজরুম ফটো

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হিন্দু মন্দির ও বাড়িঘরে হামলার চার দিন পর স্থানীয় নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল কাদেরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

ঘটনাস্থল পরিদর্শন করতে যাওয়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঐক্য পরিষদ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে।  

জেলা পুলিশের সদর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার আবদুল করিম বেনারকে জানান, “নাসিরনগর থানার ওসি আবদুল কাদেরকে প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।”

পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, এ ধরনের হামলার পর থানা পুলিশের প্রধানকে সরিয়ে দেওয়ার মানে তিনি দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেননি বা করতে পারেননি। তবে এ বিষয়টি তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে মনে করেন তিনি।  

ফেসবুকে প্রকাশিত একটি ছবিকে কেন্দ্র করে গত রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সাম্প্রদায়িক হামলায় কমপক্ষে ১৫টি মন্দির এবং শতাধিক ঘরবাড়ি ভাঙচুর করে দুষ্কৃতকারীরা।

161102-BD-ransack-620

লাঠি নিয়ে মন্দিরে হামলার দৃশ্য। স্টার মেইল

গত শুক্রবার নাসিরনগরের হরিপুর ইউনিয়নের  হরিণবেড় গ্রামের জগন্নাথ দাসের ছেলে রসরাজ দাসের  ফেইসবুক  পাতায় একটি পোস্ট নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত। ওই পোস্টে ‘ইসলাম ধর্মের অবমাননা’ করা হয়েছে-এমন অভিযোগ তুলে শনিবার থেকেই উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে ওই এলাকায়।  পুলিশ রসরাজকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠিয়েছে।

গত রোববার আহলে সুন্নাত  ওয়াল জামায়াত ও খাঁটি আহলে  সুন্নাত  ওয়াল জামায়াত নামের দুটি সংগঠনকে ধর্মীয় সমাবেশ করার অনুমতি দেয় উপজেলা প্রশাসন। ওই সমাবেশ থেকেই বিভিন্ন মন্দিরে হামলা ও হিন্দুদের বাড়িতে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়।  

ঘটনার পর দায়েল হওয়া দুটি মামলার প্রতিটিতে ১০০০ থেকে ১২০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।  

জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বেনারকে বলেন, এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ এখন পর্যন্ত নয়জনকে আটক করেছে।

এদিকে ঘটনার তদন্তে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক  সাখাওয়াত  হোসেনের নেতৃত্বে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ ছাড়া জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তিন দিন পর ঘটনাস্থলে সাংসদেরা

ঘটনার তিন দিন পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের (নাসিরনগর) সাংসদ ও মন্ত্রী ছায়েদুল হক ঘটনাস্থলে যান। তবে এ সময় তিনি কোনো মন্দির পরিদর্শন করেননি, ক্ষতিগ্রস্ত কোনো পরিবারের সঙ্গেও কথা বলেননি। সাংবাদিকেরা ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলেও কথা না বলে নীরবে এলাকা ছাড়েন মন্ত্রী।  

জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সাংসদ উবায়দুল  র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে মোকতাদির চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িতরা যে–ই হোক ছাড় পাবে না।  

পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ


নাসিরনগরের ঘটনায় পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য এনামুল হক।  
ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের সদস্য এনামুল হক চৌধুরীর নেতৃত্বে ওই কমিটির সদস্যরা বুধবার নাসিরনগরে গিয়ে হিন্দু পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন।
এনামুল হক চৌধুরী বেনারকে বলেন, “একাত্তরে যেভাবে হিন্দুদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে, নাসিরনগরের ঘটনার সঙ্গেও তার মিল রয়েছে। এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।”

এদিকে ঢাকায় আয়োজিত একটি সেমিনার শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক সাংবাদিকদের বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে সেখানে স্থানীয় প্রশাসনের কিছু দুর্বলতা, দূরদর্শিতা ও অভিজ্ঞতার অভাব ছিল।

বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি

ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছেন হিন্দু বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা  দাশগুপ্ত। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা নিয়েও তিনি প্রশ্ন  তুলেছেন তিনি।

পরিষদের ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। পরে নাসিরনগর গৌরমন্দিরে এক সমাবেশে রানা দাশগুপ্ত বলেন, এই এলাকায় ৪৪ হাজার হিন্দু ভোটার রয়েছে। তাঁরা যাঁদের ভোট দিয়ে জনপ্রতিনিধি করেছেন, সেই জনপ্রতিনিধিরাই চার দিনে সেখানে যাননি।  

জনপ্রতিনিধি ঘটনাস্থলে আসলে কালা পতাকা প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “টাকা দিয়ে ক্ষতিপূরণ আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করছি।”

ভারতীয় হাইকমিশনের একটি প্রতিনিধি দলও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এদিকে ঘটনার প্রতিবাদে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্নস্থানে বিক্ষোভ–সমাবেশ হচ্ছে।

পুলিশের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল পুলিশের তদন্তে আসল ঘটনা উঠে আসবে না বলে মন্তব্য করেছেন। ঘটনাস্থলের মন্দির পরিদর্শন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পর সাংবাদিকদের কাছে তিনি এ মন্তব্য করেন।

সুলতানা কামাল বলেন, এখানে পুলিশ ও প্রশাসনের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। কাজেই তাদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হলে তাতে সত্য উঠে আসবে না। তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কিংবা নিরপেক্ষ নাগরিকদের নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানান।
ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আপসকামিতার অভিযোগ তুলে মানবাধিকারকর্মী সুলতানা কামাল বলেন, যারা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির কথা বলছে এবং এখন ক্ষমতায় আছে, তাদের মধ্যে প্রচুর আপসকামিতা দেখা যাচ্ছে। তা না হলে প্রশাসন এত উদাসীনতা দেখাতে পারত না।

শাস্তি চায় কওমি ওলামা পরিষদ

প্রতিমা ও ঘরবাড়িতে হামলাকারীদের শাস্তি চেয়েছে কওমি ওলামা পরিষদ। ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিষদ এ দাবি জানায়।  

সংবাদ  সম্মেলনে  পরিষদের সভাপতি মাওলানা  সামছুদ্দিন  বলেন, কাবা শরিফ অবমাননার প্রতিবাদে স্থানীয় কওমি মাদ্রাসার ছাত্র ও সাধারণ মানুষ প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করে বাড়িতে ফিরে যাচ্ছিল। ওই সময় একদল দুর্বৃত্ত হিন্দুদের উপাসনালয় ও তাদের বাড়িঘরে আক্রমণ চালায়।

যদিও মোবাইল ফোনে ধারণ করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরাই হামলায় অংশ নিচ্ছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন