Follow us

আইএসের কথিত 'নতুন ভিডিও' খতিয়ে দেখছে পুলিশ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-08-12
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
র‌্যাবের সদস্যরা হলি আর্টিজান বেকারির সামনে-  ঢাকা জুলাই ১, ২০১৮। ছবি এপি
র‌্যাবের সদস্যরা হলি আর্টিজান বেকারির সামনে- ঢাকা জুলাই ১, ২০১৮। ছবি এপি
ছবি এপি

বাংলাদেশের পুলিশ, মার্কিন নাগরিক ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলা চালানোর হুমকি দিয়ে ভিডিও প্রকাশ করেছে জঙ্গি গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বাংলাদেশ শাখার সদস্যরা।

অবশ্য কাউন্টার টেররিজম বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, তারা ভিডিওটি দেখেছেন। তারা নিশ্চিত নন, ওই ভিডিও বাংলাদেশের ভিতরে নাকি বাইরে প্রস্তত করা। সেটি নতুন কোন ভিডিও নাকি পুরাতন সে ব্যাপারেও নিশ্চিত নয় পুলিশ কর্মকর্তারা।

এদিকে সাইট ইনটেলিজেন্স  বলছে, এই ভিডিওটি গত ৯ আগস্ট প্রকাশিত হয়েছে। । উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্রুপ সাইট ইনটেলিজেন্স মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর অনলাইন প্রচারণায় নজর রাখে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম বিভাগের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম সোমবার বেনারকে বলেন, “তথাকথিত ওই আইএস’র ভিডিও আমরা দেখেছি। আসলে ওই ভিডিও কে করেছে সেটা এখনও আমরা বের করতে পারিনি। এটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।”

তিনি বলেন, “এটা নতুন কোন ভিডিও নাকি পুরোনো ভিডিও—সে বিষয়ে আমরা এখনও নিশ্চিত নই। এটি দেশের ভিতরে না বাইরে তৈরি করা হয়েছে সে ব্যাপারেও আমরা কিছু বলতে পারছি না। কারণ বর্তমান সময়ে যে কেউ যে কোন জায়গা থেকে এ ধরনের ভিডিও প্রস্তুত করতে পারে।”

“তবে ভিডিও নতুন হোক অথবা পুরানো হোক আমরা তাদের হালকাভাবে নিচ্ছি না। আমরা সতর্ক আছি। ইতিমধ্যে নব্য জেএমবি’র উলফ প্যাকের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছি,” বলেন, সাইফুল ইসলাম।

তিনি বলেন, “আমরা শক্ত হাতে জঙ্গিদের দমন করেছি। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে আমাদের অপারেশন চলছে, চলবে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বেনারকে বলেন, “এসব ভিডিও প্রকাশ করে চক্রান্ত চালাচ্ছে একটি চক্র। এদের উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে আইএস জঙ্গি আছে তা প্রমাণ করা। আর এটা প্রমাণ করলে তাদের লাভ। আমার তাদের ব্যাপারে সচেতন আছি। আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠীর কোন তৎপরতা আমাদের দেশে নেই।”

তিনি বলেন, “আমরা জঙ্গিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছি। আমরা তাদের ব্যাপারে সচেতন আছি। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর আছে। আমাদের গোয়েন্দারা কাজ করছে। তারা আমাদের আক্রমণ করতে পারবে না।”

আইএসের আমাক মিডিয়া এবং এর প্রপাগান্ডা চ্যানেল টেলিগ্রামের আত-তামকীন মিডিয়ায় ‘ইসলামিক স্টেট অব বেঙ্গল’ নাম দিয়ে জঙ্গিদের নতুন ভিডিও প্রকাশ করা হয়।

ওই ভিডিওতে মোট চার জঙ্গিকে মুখ ঢাকা অবস্থায় দেখা যায়। তাদের মধ্যে মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন আত্মঘাতী ভেস্ট পরা। দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের হাতে রয়েছে মেশিনগান।

চারজনের সবাই আইএসের চিহ্ন কালো পোশাক ও পেছনে রয়েছে আইএস কালো পতাকা। প্রায় আট মিনিটের ওই ভিডিওতে বাংলা এবং আরবী ভাষায় কথা বলতে শোনা গেছে।

ভিডিওতে একজন বাংলায় বলছে, তাদের প্রতিশোধের প্রধান লক্ষ্য হলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তথা পুলিশ। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ মার্কিন নাগরিক, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, সরকারি অফিস, থানা ও পুলিশ ফাঁড়িকে তারা টার্গেট করার কথা জানিয়েছে।

বক্তব্য শেষে চার জনকেই আইএস’র সর্বোচ্চ নেতা খলিফা আবু বকর আল বাগদাদীর নামে আনুগত্য প্রকাশ করতেও দেখা যায়।

২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান ক্যাফে হামলার পর সিরিয়ার রাকা শহর থেকে প্রচার করা ভিডিওতে বাংলাদেশে ওই হামলার জন্য জঙ্গিদের প্রশংসা করে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আইএসে যোগ দেয়া কয়েকজন জঙ্গি।

জঙ্গিরা শেষ হয়নি

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, “জঙ্গিরা শেষ হয় না। যদিও ভুল তবু তারা একটি আদর্শ বিশ্বাস করে। আদর্শ নিঃশেষ হয় না।”

তিনি বলেন, “হোলি আর্টিজান হামলার পর পুলিশের ব্যাপক প্রি-এমপটিভ অপারেশনের পরে জঙ্গিরা গা ঢাকা দিয়েছে। আমাদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের কোণঠাসা করে দিয়েছে। তার মানে এই না যে তারা শেষ হয়ে গেছে।”

ব্রিগেডিয়ার সাখাওয়াত বলেন, “আইএসের মূল ঘাঁটি সিরিয়া থেকে উৎখাত হয়েছে আইএস। তাদের কয়েক হাজার বিদেশি যোদ্ধা সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের হাতে আটক। অনেক সদস্য পালিয়ে বেড়াচ্ছে। তারা চাইবে স্ব স্ব দেশে ঢুকে আক্রমণ চালাতে।”

তিনি বলেন, “নতুন নতুন ভিডিও প্রকাশ করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সদস্যদের সংগঠিত করার চেষ্টা করে জঙ্গিরা। তারা প্রমাণ করতে চায় তারা শেষ হয়ে যায়নি।”

পুলিশি অভিযানের ফলে কোনঠাসা হওয়ার পর এ বছরের মার্চে রাজধানীর গুলিস্তান মোড়ে দূরনিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের মাধ্যমে কর্তব্যরত পুলিশের ওপর শক্তিশালী বোমা হামলা হয়। আইএস ওই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে।

পরের মাসে মালিবাগে পুলিশ ভ্যানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটনায় জঙ্গিরা। জুলাই মাসে প্রায় একই সময়ে পল্টন ও খামারবাড়িতে দুই পুলিশ বক্সের পাশে তারা বোমা রেখে যায়। তবে বোমা দুটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।

গত বৃহস্পতিবার নব্য জেএমবির উলফ প্যাকের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে কাউন্টার টেররিজম বিভাগ। তারা পুলিশের ওপর আক্রমণ করার পরিকল্পনা করছিলো বলে জানায়।

জঙ্গিদের টেলিগ্রামভিত্তিক প্রোপাগান্ডা চ্যানেল বালাকোট মিডিয়ায় সম্প্রতি প্রকাশিত ‘লোন উলফ’ নামের একটি বাংলা ম্যাগাজিনে তাদের আক্রমণের পরিবর্তিত কৌশল সম্পর্কে লেখা ছাপা হয়।

ম্যাগাজিন অনুযায়ী, নিজ থেকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ আক্রমণকারীদের ‘লোন উলফ’ (নিঃসঙ্গ ঘাতক) বলা হয়। এমন সমমনা কয়েকজন জঙ্গি মিলে ‘স্লিপার সেল’ গঠন করলে সেটাকে ‘উলফ প্যাক’ বলা হয়।

এর আগে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের কাউন্টার টেরিজমের বিশ্লেষকদের একটি রিপোর্টে বলা হয়েছিলো যে, আইএস জঙ্গিরা সংঘটিত এবং আক্রমণের উপায় খুঁজছে। জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের গোয়েন্দা  প্রতিবেদনের উপর ভিত্তি করে এই রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিলো।

পুলিশের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “সংঘবদ্ধ আক্রমণের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ সহজ। তবে ‘লোন উলফ’ এবং ‘উলফ প্যাক’ এর আক্রমণ ঠেকানো খুব কঠিন। আমরা তাদের নিয়ে বেশ চিন্তায় আছি।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন