পুরসভা নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গ তৃণমূলেরই, তবে ফুটে উঠেছে তাদের আশঙ্কার নানাদিক

কলকাতা থেকে মাসুমা পারভীন
2015.04.28
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Kal-poll কলকাতা থেকে ২০ কিমি দূরে সাঁতারাগাছিতে ভোটের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ। ৩০ এপ্রিল,২০১৪
এএফপি

রাজ্য জুড়ে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগের মধ্যেই পুর নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস বিপুলভাবে জয়লাভ করল। দক্ষিণবঙ্গে কার্যত বিরোধীদের কোনও অস্তিত্ব থাকল না। উত্তরবঙ্গে অবশ্য ছবিটি ভিন্ন। সেখানে রাজ্যের শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে কড়া টক্কর দিয়েছে বামফ্রন্ট। নিজেদের শক্ত ঘাঁটি ধরে রাখতে পেরেছে কংগ্রেসও।

দলের নির্বাচনী সাফল্য প্রসঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন বললেন, ‘আমরা মানুষের কাছে একটা সরল বার্তা নিয়ে গিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আমরা কতখানি উন্নয়ন করতে পেরেছি, আপনারা দেখেছেন। সেই কাজ যাতে অব্যাহত থাকে, তার জন্যই আপনাদের আশীর্বাদ চাই।’

কলকাতা পুরসভায় ১৪৪টি আসনের মধ্যে ৯৯টি আসনে জিতল তৃণমূল কংগ্রেস। তবুও শাসক দলের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। পরাজিত হয়েছেন পরেশ পাল, ফরজানা আলম, সচ্চিদানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট প্রার্থীরা। এবং, তিনটি পরাজয়েই সিঁদুরে মেঘ দেখছেন দলীয় নেতৃত্ব। পরেশ পাল হেরেছেন রাজাবাজারে, ফরজানা তপসিয়ায়। দুটোই মুসলমান অধ্যুষিত কেন্দ্র। ফলে, আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে, খাস কলকাতাতেই দলের সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কে ক্ষয় ধরছে। অন্যদিকে,বিদায়ী পুরসভার পুর-চেয়ারম্যান সচ্চিদানন্দ হেরেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের খাসতালুক ভবানীপুরে।

বিরোধীরা বলছেন, কলকাতা নিয়ে শাসক দলের দুশ্চিন্তার আরও কারণ আছে। তাঁদের মতে, গত ১৮ এপ্রিল কলকাতা পুরসভায় বিপুল রিগিং করেছিল শাসক দল। এই অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ নেহাত কম নয়। রাজ্যের নির্বাচন কমিশনার সুশান্তরঞ্জন উপাধ্যায় বলেছিলেন, কলকাতার পুরনির্বাচনের পরিবেশকে আদর্শ বলা যাবে না। বহু অভিযোগ জমা পড়েছিল তাঁর দফতরে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই রিটার্নিং অফিসাররা কোনও নেতিবাচক রিপোর্ট জমা দেননি। স্বয়ং রাজ্যপাল অসন্তুষ্ট সম্পূর্ণ ঘটনায়। ভোটের ফলাফলও বহু ক্ষেত্রেই অস্বাভাবিক। ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডে তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী জিতেছেন ১৪ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে। ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে জয়ের ব্যবধান ১৫ হাজারেরও বেশি। বিরোধীদের অভিযোগ, স্বাভাবিক নির্বাচন হলে পুরভোটে এত বড় ব্যবধানে জেতা কার্যত অসম্ভব।

কলকাতা পুলিশের এক কর্মী কথা বললেন বেনার নিউজের প্রতিনিধির সঙ্গে। তবে তাঁর শর্ত, নাম প্রকাশ করা যাবে না। তিনি বললেন, বহু ক্ষেত্রেই ওপরমহল থেকে রিগিং দেখেও নিষ্ক্রিয় থাকার নির্দেশ ছিল। ফলে, অনেক অন্যায় দেখেও চোখ ফিরিয়ে থাকা ছাড়া তাঁদের আর কিছু করার ছিল না।

বিজ্ঞাপনকর্মী অভিষেক সেনগুপ্ত বললেন, এত বড় মাপের রিগিং তিনি আগে কখনও দেখেননি। তাঁদের এলাকা বহু পুরনো জনবসতি, প্রায় প্রত্যেকেই প্রত্যেককে চেনেন। এত দিন অবধি সেখানে কোনও ছাপ্পা ভোট পড়ত না। এ বছর তৃণমূল কংগ্রেসের বহিরাগতরা অবাধে ছাপ্পা দিয়ে গিয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী অবশ্য এই অভিযোগে কান দিতে নারাজ। তিনি বলেছেন, ‘বিরোধীরা রিগিং, রিগিং বলে হইচই করছিল! এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যমও নানা মিথ্যে খবর করেছে আমাদের বিরুদ্ধে। রিগিং যদি হতো, আমাদের বর্তমান কাউন্সিলরেরা কি হারতেন?’ টুইটারে এক বার্তায় তিনি জানিয়েছেন, এই জয় তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে উৎসর্গ করছেন।

গোটা দক্ষিণবঙ্গ জুড়েই যখন তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিপত্য, উত্তরবঙ্গে তখন ছবিটি ভিন্ন। শিলিগুড়িতে তৃণমূলের মেয়র পদপ্রার্থী পরাজিত। ৪৭টি আসনের মধ্যে বামেদের দখলে ২৩টি, তৃণমূল জয়ী ১৭টি আসনে। দিনহাটা পুরসভাও দখল করল বামফ্রন্ট। আবার উত্তর দিনাজপুর জেলার দু’টি পুরসভায় প্রভাব ধরে রাখতে পারছেন কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাশমুন্সি। মুর্শিদাবাদেও কান্দি, লালবাগের মতো পুরসভায় গড় অটুট রাখতে চলেছে কংগ্রেস। এখন অবধি পাওয়া হিসেব অনুযায়ী সব মিলিয়ে কলকাতা সহ মোট ৯২টি পুরসভার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস এগিয়ে ৭০টি পুরসভায়, বামফ্রন্ট এগিয়ে ছ’টি পুরসভায়, কংগ্রেস ৫টিতে। ১১টি পুরসভা ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে, বিজেপি একটিও পুরবোর্ড দখল করতে ব্যর্থ।

নাম গোপন রাখার শর্তে রাজ্যের এক আমলা বললেন, পশ্চিমবঙ্গে মানুষ সাধারণত শাসক দলের পক্ষেই ভোট দেন। ফলে, তৃণমূল কংগ্রেসের এই জয় প্রত্যাশিতই ছিল। তবুও, ব্যাপক রিগিংয়ের যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা বহুলাংশে সত্যি। তাতে কিছু আসন নিশ্চয়ই বেড়েছে। তবে, রিগিং না করলে ফলাফলে কোনও নাটকীয় পরিবর্তন হত বলে মনে হয় না।

পুরসভার নির্বাচনের ফল থেকে যদি ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের হাওয়ার আঁচ পেতে হয়, তবে আপাতত কয়েকটি কথা বলে দেওয়া যায়। এক, এখনও তৃণমূল কংগ্রেসের জনপ্রিয়তা বহুলাংশে অক্ষুণ্ণ রয়েছে। শুধু রিগিংয়ের তত্ত্ব দিয়ে এই বিপুল জয় ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। দুই, তৃণমূল কংগ্রেস তার রাজনৈতিক প্রভাবের গণ্ডি বিস্তৃত করতে পারেনি। এখনও তার প্রভাব মূলত দক্ষিণবঙ্গেই সীমাবদ্ধ। তিন, কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট, কোনও পক্ষই গত লোকসভা নির্বাচনের পর নতুন করে পায়ের নীচের মাটি হারায়নি। চার, বিজেপি এখনও পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে দাঁত বসাতে পারেনি। সম্ভবত দলের রাজ্যস্তরের নেতৃত্বের ব্যর্থতাই এর কারণ। রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ‘বহিরাগত’-কে পুরভোটে এতখানি গুরুত্ব দেওয়া দলের কর্মীরা ভাল চোখে দেখেননি বলেই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অভিমত।

*যাবতীয় ফলাফল ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।