কয়েকটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে একব্যক্তি গ্রেপ্তার ও এক জেএমবি নেতার ফাঁসি কার্যকর

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.10.17
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
161017-Najimuddin-Killer1000.jpg অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নাজিমউদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার রশিদুন নবী ভূঁইয়া। অক্টোবর ১৭,২০১৬।
নিউজরুম ফটো

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট নাজিমউদ্দিন সামাদ হত্যাকাণ্ডসহ কয়েকটি ঘটনায় জড়িত সন্দেহে রশিদুন নবী ভূঁইয়া নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। সে আনসার আল ইসলামের সদস্য বলে পুলিশ গণমাধ্যমকে জানিয়েছে।

পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তার হওয়া নবী জিজ্ঞাসাবাদে নাজিম ছাড়াও জুলহাজ মান্নান ও তাঁর বন্ধু মাহবুব রাব্বী তনয় হত্যায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছে।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ওই খুনের ঘটনায় নবীসহ পাঁচজন অংশ নিয়েছিল। পাঁচজনের হাতেই ছিল চাপাতি। একজনের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।”

জঙ্গি সংগঠনের ‘মাশুল’ হিসেবে নবী বিভিন্ন অভিযানের ‘সমন্বয়কের’ দায়িত্ব পালন করত বলে দাবি করেন এই পুলিশ কর্মকর্তা।

“জুলহাজ হত্যাকাণ্ডে তার কিছুটা ভূমিকার কথাও বলেছে নবী। প্রকাশক আহমেদ রশীদ টুটুল হত্যাচেষ্টার ঘটনায়ও তার সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে পুলিশ,” জানান মনিরুল।

গত রোববার রাতে রাজধানীর সায়েদাবাদ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি-দক্ষিণ) যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।

সোমবার দুপুরে ঢাকা মহানগর পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলন করে নবীকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে জানান মনিরুল ইসলাম।

গত ৬ এপ্রিল রাতে পুরান ঢাকার সূত্রাপুরে নাজিমউদ্দিনকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সন্ধ্যাকালীন স্নাতকোত্তর শ্রেণির ছাত্র এবং সিলেট গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী ছিলেন।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, নবী আনসার আল ইসলামের ‘দাওয়াতি’ কাজের পাশাপাশি অপারেশন শাখার দায়িত্ব পালন করত। গতকাল তাকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

পাঁচ মাস ধরে নিখোঁজ

তবে নবীর পরিবারের সদস্যরা বলছেন, প্রায় পাঁচ মাস আগে কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের বেতাগাঁওয়ের নিজ বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে সে নিখোঁজ ছিল।

রশিদুন নবীর বাড়ি কুমিল্লার নাঙ্গলকোট পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের বেতাগাঁওয়ে। এলাকায় সে টিপু নামে পরিচিত। তার বাবা আবদুল বারী ভূঁইয়া নাঙ্গলকোট পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি।

রশিদুন নবীর বাবা আবদুল বারী বেনারকে বলেন, “গত পাঁচ মাস ওকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের যে কী দিন গেছে তা কেবল আমরাই জানি।”

তিনি বলেন, “আমার ছেলে নিয়মিত নামাজ পড়ত। যদি সে জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত থাকে, তবে তার শাস্তি হোক।”

আবদুল বারী জানান, গত ১৯ মে রাতে তাকে তুলে নেওয়া হয়। এরপর থানায় গেলে পুলিশ জিডি নেয়নি। এরপর সোমবার তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

নাঙ্গলকোট থানার উপপরিদর্শক মোজাম্মেল হোসেন বেনারকে বলেন, ‘নাঙ্গলকোটে জঙ্গির তালিকায় রশিদুন নবীসহ দুজনের নাম রয়েছে। তালিকা প্রকাশের পর দীর্ঘদিন ধরে তাকে খোঁজা হচ্ছে।’

নবী চট্টগ্রাম কলেজে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিলেন। একপর্যায়ে পড়াশোনা ছেড়ে সিমেন্ট কারখানায় চাকরি নেন।

২০১০ সালের ১১ জুলাই ময়মনসিংহের তৃপ্তি শর্মাকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করেন। তাদের পাঁচ, তিন ও এক বছরের তিনটি সন্তান রয়েছে।

ডিএমপির জনসংযোগ বিভাগের উপকমিশনার মাসুদুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, বিভিন্ন সময় দেখা গেছে অপরাধীরা গ্রেপ্তার এড়াতে পালিয়ে থাকে, তখন তাদের পরিবার এসব কথা বলে। এ ক্ষেত্রেও এ রকম হতে পারে।

জেএমবি নেতা আরিফের ফাঁসি কার্যকর

এদিকে গত রোববার ২০০৫ সালের ১৪ই নভেম্বর গাড়িতে বোমা হামলা চালিয়া দুই বিচারক হত্যা মামলার সর্বশেষ আসামি জেএমবি নেতা আসাদুল ইসলাম আরিফের ফাঁসি খুলনা জেলা কারাগারে কার্যকর করা হয়। এর আগে একই মামলায় ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ দেশের বিভিন্ন কারাগারে ছয় জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। আরিফের ফাঁসি কার্যকরের মধ্য দিয়ে এই মামলায় ফাঁসির আদেশ হওয়া সব আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলো।

খুলনা কারাগারে আরিফের ফাঁসি কার্যকর করার আগে পুলিশের সতর্কাবস্থান ছবি:এএফপি।

জেএমবির জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলায় ২০০৫ সালের ১৪ নভেম্বর ঝালকাঠির দুই বিচারক সোহেল আহম্মেদ এবং জগন্নাথ পাঁড়ে নিহত হন। ওই ঘটনায় আদালত ২০০৬ সালের ২৯ মে সাতজনকে ফাঁসির আদেশ দেন। দেশের বিভিন্ন কারাগারে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ ছয়জন জঙ্গির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়।

২০০৭ সালের ১০ জুলাই পলাতক আসামি আসাদুল ইসলাম আরিফ ময়মনসিংহ থেকে গ্রেপ্তার হয়। গত ২৮ আগস্ট প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ তার ফাঁসির রায় কার্যকর না করার রিভিউ আবেদন খারিজ করেন

১০ জঙ্গির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র

শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় পুরান ঢাকার হোসেনি দালানে বোমা হামলা মামলায় জেএমবির ১০ জঙ্গির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক শফি উদ্দিন শেখ বেনারকে বলেন, “স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১৩ অক্টোবর অভিযোগপত্র দাখিলের জন্য অনুমোদন দেয়। এরপর আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার অভিযোগপত্রটি আদালতে উপস্থাপন করা হতে পারে।”

তদন্তে জেএমবির ১৩ জন জঙ্গির জড়িত থাকার প্রমাণ পায় তদন্তকারী সংস্থা। এদের মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যে ডিবির সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হওয়ায় তাদের অভিযোগ থেকে বাদ দেওয়া হয়।

গত বছরের ২৩ অক্টোবর গভীর রাতে আশুরা উপলক্ষে তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতির সময় হোসেনি দালানে বোমা হামলা হয়। এতে দুজন নিহত ও শতাধিক লোক আহত হয়। এ ঘটনায় পুরান ঢাকার চকবাজার থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হয়।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।