Follow us

সব জনশক্তি প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে পারবে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2018-09-25
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নিয়োগকর্তারা এসে নিয়ে যাবার অপেক্ষায় অবতরণের পর মালয়েশিয়ার একটি বিমানবন্দরের পার্কিং এলাকায় কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক। ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭।
নিয়োগকর্তারা এসে নিয়ে যাবার অপেক্ষায় অবতরণের পর মালয়েশিয়ার একটি বিমানবন্দরের পার্কিং এলাকায় কয়েকজন বাংলাদেশি শ্রমিক। ২০ সেপ্টেম্বর ২০০৭।
এপি

মুষ্টিমেয় কয়েকটি নয়, এখন থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১২’শ বৈধ জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সবাই মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাতে পারবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ।

মঙ্গলবার মালয়েশিয়ার রাজধানী পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত গ্রুপের সভায় এই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে বেনারকে জানিয়েছেন মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম।

নজীব রাজাকের নেতৃত্বাধীন মালয়েশীয় সরকার বাংলাদেশের ১০ জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর জন্য নিযুক্ত করেছিল। এর ফলে ওই দশ প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে একচেটিয়া ব্যবসা করত।

তারা মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী কোম্পানিগুলোর সাথে জোট বেঁধে ‘কলিং ভিসা’ বিক্রি করে প্রতি শ্রমিকের কাছ থেকে কমপক্ষে চার লাখ টাকা আদায় করত।

ক্ষমতায় এসে মাহাথির মোহাম্মদ পূর্ববর্তী সরকারের নীতি স্থগিত করে দেন।

একই সাথে তিনি অবৈধ বিদেশি শ্রমিকদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।

এ পর্যন্ত কমপক্ষে দুই’শ বাংলাদেশি শ্রমিক জেলে রয়েছে বলে জানা গেছে।

মঙ্গলবারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন রাষ্ট্রদূত শহিদুল ইসলাম।

তিনি বেনারকে বলেন, “আজকের সভায় খুবই ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। সভায় জি-টু-জি প্লাস পদ্ধতিতে বাংলাদেশি বৈধ সকল রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের মালয়েশিয়ায় প্রেরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।”

রাষ্ট্রদূত বলেন, “এর মাধ্যমে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে ও অভিবাসন খরচ কমে যাবে।”

অভিবাসন ব্যয় কমানোর লক্ষে জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য ছাড়াই কর্মী পাঠানোর জন্য জি-টু-জি চুক্তি করে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশ সরকার। ওই চুক্তি অনুযায়ী, একজন শ্রমিক ৩০ হাজার টাকায় মালয়েশিয়া যেতে পারত।

তবে ওই প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ দশটি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানকে সংশ্লিষ্ট করে জি-টু-জি প্লাস কর্মসূচি শুরু করে দুই সরকার।

নতুন চুক্তি অনুসারে শ্রমিক প্রতি এক লাখ ৬০ হাজার টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের বড় শ্রম বাজারের একটি। জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দালালেরা আকর্ষণীয় মজুরির কথা বলে তাঁদের প্রলুব্ধ করে। দরিদ্র মানুষেরা দালালদের মাধ্যমে মালয়েশিয়া গিয়ে বিপদে পড়েন।

তাঁরা মূলত নির্মাণকাজ করেন। সেখানে তাঁদের মজুরি খুব কম।

বেশি অর্থ খরচ করে মালয়েশিয়া গিয়ে দু-তিন বছরের মধ্যে ফিরে আসতে চান না। তাই তাঁদের ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও নিয়োগকর্তাদের সাথে আপস করে কম বেতনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কাজ করেন।

পুলিশকে প্রতি সপ্তাহে দিতে হয় ঘুষ।

২০১৪ সালে মালয়েশিয়া সফরকালে অবৈধ বাংলাদেশি শ্রমিকদের বৈধকরণের জন্য সেদেশের সরকারের কাছে অনুরোধ জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ প্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ থেকে ‘রি-হায়ারিং’ চালু করে। ‘রি-হায়ারিং’ এর জন্য নিয়োগকারীকে সরকারের কাছে আবেদন জানাতে হয় যে, তিনি অবৈধ হয়ে যাওয়া শ্রমিকদের পুনরায় নিয়োগ করতে চান।

৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ তারিখে ‘রি-হায়ারিং’ এর মেয়াদ শেষ হয়। এই সুবিধায় অনেকেই বৈধ হয়েছেন।

এরপর মালয়েশীয় সরকার অবৈধ শ্রমিকদের জন্য সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে।

কিন্তু এখনো কয়েক হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক অবৈধভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। তাঁদের অনেককেই দেশে ফিরে আসতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্ত্রী এখন মালয়েশিয়ায়

মালয়েশিয়ায় শ্রম বাজার চালু রাখতে নতুন সরকারের সাথে আলোচনা করতে সোমবার কুয়ালালামপুর সফরে যান প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্ম সংস্থান মন্ত্রী নুরুল ইসলাম।

মঙ্গলবার তিনি মালয়েশিয়ার হিউম্যান রিসোর্স মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী কুলাসেগারান এর সাথে একটি সভায় মিলিত হন।

হাইকমিশনার শহিদুল ইসলাম বলেন, “যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকেরা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে তাঁদের নিয়মিত করার জন্য আমরা মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ করেছি। মালয়েশিয়া সরকার আমাদের অনুরোধ অত্যন্ত ইতিবাচক হিসাবে নিয়েছেন।”

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস রিলিজে বলা হয়, মঙ্গলবার সভায় “কলিং ভিসায় কর্মী নিয়োগের বিষয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় অপেক্ষমাণ মালয়েশিয়া গমনেচ্ছু কর্মীদের পথ উন্মুক্ত থাকবে।”

কলিং ভিসা কী?

মালয়েশিয়ার নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকের প্রয়োজন হলে সেদেশের কোম্পানিগুলোকে বিদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগের দায়িত্ব দেয়। এই কোম্পানিগুলো সরকারের কাছ থেকে কলিং ভিসা সংগ্রহ করে।

কোম্পানিগুলো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ওই সকল ভিসা উচ্চ মূল্যে বিক্রি করে। আর জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো শ্রমিকদের কাছ থেকে বেশি টাকা আদায় করে।

অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ারবি ফাউন্ডেশনের প্রধান সৈয়দ সাইফুল হক বেনারকে বলেন, “দেখুন শ্রম বাজার সকল জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের জন্য উন্মুক্ত করা একটি ভালো সিদ্ধান্ত। তবে, এর ফলে অভিবাসন ব্যয় কমবে না।”

তিনি বলেন, “যতদিন মালয়েশিয়ার সরকার কোম্পানির মাধ্যমে ভিসা দেওয়া বন্ধ না করবে, তত দিন অভিবাসন ব্যয় কমানো যাবে না।”

সাইফুল হক বলেন, মালয়েশিয়ার কোম্পানিগুলো বাংলাদেশি জনশক্তি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ভিসা বিক্রি করে। ফলে একজন শ্রমিক কমপক্ষে চার লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া যায়।

তিনি বলেন, “মালয়েশিয়া সরকার যদি সকল আউটসোর্স কোম্পানিকে ভিসা সংগ্রহের সুযোগ দিত তাহলে অভিবাসন ব্যয় কমে যেত।”

ওয়ার্কিং গ্রুপের সভায় উপস্থিত এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে জানান, আজকের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, এখন শ্রমিকদের আবেদন সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করবে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদ মন্ত্রণালয় আর চাহিদাপত্র দেবে মালয়েশিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

তিনি বলেন, এর আগে শ্রমিক নিয়োগের আবেদনপত্র গ্রহণ থেকে শুরু করে চাহিদাপত্র প্রদান সবই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় করত।

তাঁর মতে এই সিদ্ধান্তের ফলে দুই মন্ত্রণালয়ের কাজে ক্ষমতার ভারসাম্য হবে।

তিনি বলেন, এখন থেকে নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান সরাসরি অথবা তাদের নিয়োগ করা এজেন্ট মালয়েশিয়া সরকারের কাছে শ্রমিকদের চাহিদা দিতে পারবে।

তবে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার মধ্যকার এই বৈঠক সম্পর্কে বেনারের পক্ষে মালয়েশিয় কর্মকর্তাদের কোনো মন্তব্য সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

মালয়েশিয়ার ক্লাং জেলায় নির্মাণ শ্রমিক হিসাবে কর্মরত বাংলাদেশি মোহাম্মদ শহিদ বেনারকে বলেন, “আমাদের সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত আমরা যারা অবৈধ হয়ে গেছি তাঁদের বৈধ করার উদ্যোগ নেওয়া।”

তিনি বলেন, “অনেক শ্রমিক এখন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। কারণ ধরা পড়লে জেলে যেতে হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন