Follow us

একদিনে ৩ জেলায় ৪টি অভিযানে ১২ জঙ্গি নিহত

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016-10-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার অদূরে গাজীপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক জঙ্গি দমন অভিযানের একটি চিত্র। অক্টোবর ০৮, ২০১৬।
ঢাকার অদূরে গাজীপুরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক জঙ্গি দমন অভিযানের একটি চিত্র। অক্টোবর ০৮, ২০১৬।
এএফপি

শনিবার গাজীপুর, টাঙ্গাইল ও ঢাকার আশুলিয়ায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চারটি পৃথক অভিযানে একদিনে এক ডজন ‘জঙ্গি’ নিহত হয়েছে। একদিনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর চালানো একাধিক জঙ্গি দমন অভিযান এবং এত জঙ্গি নিহতের ঘটনা এই প্রথম।

গত ১ জুলাই গুলশান হামলার পর থেকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে কমপক্ষে ৩৩ জন সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

ওই হামলার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহত ৩৩ জনের মধ্যে গুলশানের ঘটনায় ৫ জঙ্গি, ২৬ জুলাই কল্যাণপুরের ঘটনায় ৯ জঙ্গি, ২৭ আগস্ট নারায়াণগঞ্জের পাইকপাড়ায় ৩ জঙ্গি এবং শোলাকিয়া, মিরপুর, আজিমপুর ও রাজশাহীতে একজন করে সন্দেহভাজন জঙ্গি নিহত হয়। আর শনিবারের অভিযানে নিহত হয়েছে ১২ জন।

উল্লেখ্য, গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলার ঘটনায় ১৭ বিদেশি, দুই পুলিশসহ ২২ জন নিহত হয়েছিলেন। দেশে–বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করা ওই ঘটনার পর থেকে জঙ্গি দমন অভিযান জোরদার হয়।

এরই অংশ হিসেবে শনিবার তিন জেলায় চারটি অভিযান পরিচালিত হয়। গতকালের এসব অভিযানে গাজীপুরের পাতারটেকে সাত জন, একই জেলার হাড়িনাল এলাকায় দু’জন, টাঙ্গাইলের কাগমারা এলাকায় আরও দুজন এবং সাভারের আশুলিয়ায় একজন নিহত হয়। এই ১২ জনের মধ্যে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত চারজনের নাম–পরিচয় নিশ্চিত করতে পেরেছে র‍্যাব ও পুলিশ।

“আমরা তাদের আত্মসমর্পণের জন্য অনুরোধ করে যথেষ্ট সময় দিয়েছিলাম। সে কারণে অভিযান শেষ করতে এত দীর্ঘ সময় লেগেছে,” বেনারকে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক মনিরুজ্জামান।

তিনি আরও বলেন, “কিন্তু ওরা আমাদের দিকে গ্রেনেড ও গুলি ছোড়ে। আমরা বাধ্য হয়ে পাল্টা আক্রমণ করি।সবকিছু ঘটেছে দিনের আলোয়, অসংখ্য গণমাধ্যমের উপস্থিতিতে। তাই এটা নিয়ে সন্দেহের কিছু নেই।”

গাজীপুরের পাতারটেক অভিযান

গাজীপুরের নোয়াগাঁও পাতারটেক এলাকায় ‘অপারেশন শরতের তুফান’ নামের অভিযানে সাত জঙ্গি নিহত হয়। ওই এলাকার একটি তিন তলা বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।

জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম হওয়ায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করেন। তিনি আরও বলেন, “নারায়ণগঞ্জের সফল অভিযানের পর আমরা একের পর এক জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দিচ্ছি। এরই ধারাবাহিকতায় গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গাজীপুরের দুটি এবং টাঙ্গাইলের একটি স্থানে জঙ্গি আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।”

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “সাতজন জঙ্গি এখানে অবস্থান করছিল। আমাদের পুলিশ বাহিনী যখন তাদের আত্মসমর্পণের অনুরোধ করে, তখন তারা আত্মসমর্পণ না করে উপর্যুপরি গুলিবর্ষণ শুরু করে। এরপর পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট, গাজীপুর জেলা পুলিশ, পুলিশ হেডকোয়ার্টার সফল অভিযান পরিচালনা করে।”

কে এই আকাশ?

পাতারটেকে নিহত সাতজনের একজন ফরিদুল ইসলাম ওরফে আকাশ। পুলিশ বলছে, জেএমবির শীর্ষ পর্যায়ের একজন নেতা আকাশ। তার বাড়ি সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলায়। তার পুরো পরিবার জেএমবির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

অভিযানের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা নিশ্চিত যে তামিম চৌধুরীর পর যে নেতৃত্ব দিত, ছদ্মনাম হোক আর সাংগঠনিক হোক, তার নাম হচ্ছে আকাশ।”

আকাশের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা সব সময় বলে আসছি শতভাগ জঙ্গি নির্মূল করতে পারিনি। দু-একজন এদিক-সেদিক ছিল, তারা এই আকাশের নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রচেষ্টা নিচ্ছিল।”

অভিযানের কয়েক ঘণ্টা পরই ঢাকা মহানগর পুলিশের অনলাইন নিউজ পোর্টালে ফরিদুল ইসলাম আকাশের নিহত হওয়ার খবর প্রকাশ করা হয়। সেখানে বলা হয়, আকাশ ওরফে প্রভাত নিও জেএমবির ঢাকা বিভাগের অপারেশন কমান্ডার ছিল।

পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন বেনরাকে বলেন, “আকাশ শোলাকিয়া হামলার মূল পরিকল্পনাকারী ছিল। তার সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।”

গাজীপুরের হাড়িনালে নিহত দুই

র‍্যাব জানায়, হাড়িনালের পশ্চিমপাড়া লেবুবাজার এলাকায় জনৈক আতাউর রহমানের বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় রাশেদুল (২০) ও তৌহিদুল (২২) নামে দুই তরুণ নিহত হয়। রাশেদুল ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তৌহিদুল উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছে এবার। ওই বাড়ি থেকে বেশকিছু অস্ত্র ও বিস্ফোরক পাওয়া গেছে।

টাঙ্গাইলে দুই জঙ্গি নিহত

টাঙ্গাইলে র‍্যাবের অভিযানে ‘সন্দেহভাজন’ দুই জঙ্গি নিহত হয়েছে। শনিবার শহরের কাগমারা এলাকার একটি বাড়িতে এই অভিযান চালানো হয়। এসময় র‍্যাবের দুই সদস্য আহত হয়েছে।

র‍্যাব সূত্র জানায়, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে শনিবার র‍্যাবের একটি দল বাড়িটি ঘিরে ফেলে। এ সময় তারা র‍্যাবের ওপর গুলি বর্ষণ করে। র‍্যাবও পাল্টা গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই দুই জঙ্গি নিহত হয়।

বাড়িটির মালিক অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষক আজাহার আলী স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, গত ২৭ সেপ্টেম্বর দুই যুবক এসে তার তিনতলা ভবনের নিচতলার একটি রুম ভাড়া নেয়। এসময় তারা নিজেদের ছাত্র বলে পরিচয় দিয়েছিল। ভাড়া নেওয়ার সময় তাদের কাছে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি চাওয়া হলে পরে দেবে বলে জানিয়েছিল।

গতকাল বিকেলে টাঙ্গাইল প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে র‍্যাব-১২ অধিনায়ক শাহাবুদ্দিন খান জানান, নিহতদের একজনের বয়স ২০ এবং আরেকজনের বয়স ২৫ এর মতো হবে। ধারণা করা হচ্ছে দুর্গা পূজা ও আশুরার অনুষ্ঠানে হামলা করে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের।

জেএমবির অর্থদাতা নিহত

জেএমবির মূল অর্থদাতা আব্দুর রহমান আহতাবস্থায় সাভারের এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রাত পৌনে ৯টার দিকে মারা গেছে। এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান এনামুর রহমান সংবাদমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

র‍্যাব সদর দফতরের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ বেনারকে বলেন, “শনিবার দুপুর সাড়ে তিনটার দিকে র‍্যাবের একটি দল আশুলিয়ার বসুন্ধরাটেক এলাকার আমির মৃধা শাহিনের বাড়িতে এই অভিযান চালিয়েছিল। র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে ওই বাড়ির ৫ তলার গ্রিল কেটে লাফিয়ে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে আব্দুর রহমান। এসময় সে গুরুতর আহত হলে তাকে গ্রেপ্তার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।”

এদিকে রাত নয়টার দিকে ওই বাড়ি থেকে আব্দুর রহমানের রহমানের স্ত্রী শাহনাজ আক্তার রুমি ও বাড়ির নিরাপত্তাকর্মী তারেককে আটক করা হয়েছে।

ওদের শক্তি ক্ষয় হচ্ছে

নব্য জেএমবির ৬০ থেকে ৭০ ভাগ শক্তি এর মধ্যেই নষ্ট করা সম্ভব হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিট।

ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “জঙ্গিদের নেতৃস্থানীয় অনেকে নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে তামিম চৌধুরী, মেজর (অব.) জাহিদ ও তানভীর কাদেরীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নেতা।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মনে করেন, জঙ্গি দমন অভিযানে প্রাথমিক সফলতা এলেও লম্বা যুদ্ধের প্রস্তুতি রাখতে হবে।

“আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়েছে, জঙ্গিরা ধরা পড়ছে, হয়তো কিছুটা চাপেও আছে। এ সবই সত্যি। কিন্তু এও সত্য যে, জঙ্গিরা একটা লম্বা সময়ের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছে,” বেনারকে জানান এম সাখাওয়াত।

সাবেক ওই নির্বাচন কমিশনার বলেন, ২০০৬-০৭ সালের দিকে জেএমবিকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছিল। বিগত বছরগুলোতে বিপুলসংখ্যক জঙ্গি ধরা পড়ল। তারপরও আবার নব্য জেএমবির আবির্ভাব ঘটেছে, যারা আরও বেশি ভয়ংকর।

এবার জিয়ার পালা!

নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের কথিত সামরিক শাখার প্রধান মেজর (অব.) জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে রয়েছেন বলে জানা যায়। গতকাল শনিবার দুপুরে রাজধানীর স্বামীবাগে শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “জিয়া আমাদের নজরদারিতে আছেন। তাকেও আমরা যেকোনো সময় ধরে ফেলব।”

এর আগে গত ৩ আগস্ট পুলিশ সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করে জিয়াউল হককে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে সেনাবাহিনীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টায় মেজর জিয়াউল হক চাকরিচ্যুত হন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন