সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণা, উত্তপ্ত সংসদ

ঢাকা থেকে শহিরিয়ার শরীফ
2016.05.05
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
Attorney-General620.jpg হাইকোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল ঘোষণার পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজ কার্যালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে রায়টির কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আপিল করার কথা জানান। মে ৫, ২০১৬।
ফোকাস বাংলা

সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে ফিরিয়ে এনে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী করা হয়েছিল। সেই সংশোধনী হাইকোর্ট বাতিল করে দেওয়ায় গতকাল বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রায়টির কার্যকারিতা স্থগিত চেয়ে আপিল করবে রাষ্ট্রপক্ষ।

বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে আনতে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে দেওয়া হাই কোর্টের এই রায়কে ‘সংবিধান পরিপন্থী’ বলেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি বলেন, আপিল বিভাগে এটা টিকবে না।

১৯৭২ সালে মূল সংবিধানে উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা জাতীয় সংসদের ওপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ওই ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত হয়। এরপর নানা চড়াই–উৎ​রাই পার হয়ে এখন বিচারকদের অপসারণে কোনো ব্যবস্থাই দেশে বিদ্যমান নেই।

“এ কাজটি সতর্কতার সঙ্গে করা উচিত। রায় হওয়ার কিছুদিন আগে মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়া অনুমোদন করে, যা ঠিক ছিল না বলে মনে করেন অনেকেই,” বেনারকে জানান সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক।

তিনি বলেন, ‘বিচারকেরা যখন চাকরি নিয়েছেন, তখন জানতেন যে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাঁদের অপসারণ করতে পারেন। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে জাতীয় সংসদ তাঁদের অপসারণ করবে। এটা চাকরির শর্তের লঙ্ঘন বলে মনে করছেন কেউ কেউ।’

এদিকে বিচারকদের অধিকার সুরক্ষা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের ব্যাপক সুযোগ রেখে তাঁদের অসদাচরণ তদন্ত ও প্রমাণে একটি নতুন আইনের খসড়া চূড়ান্ত করেছে আইন মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি মন্ত্রিসভা আইনটির খসড়া অনুমোদনও করে।

যদিও বিচারকেরা এ ধরনের আইনের পক্ষে নন।আইনটির ওপর মতামত দেননি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। এ নিয়ে বিচার বিভাগের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়ে আছে।

বিচারকেরা তাঁদের অপসারণের বিষয়টি জাতীয় সংসদের হাতে থাকুক, এটা চান না। তাঁরা আগের মতোই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের মাধ্যমে অসদাচরণের বিচার চান। যে কারণে সংবিধানের সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে একজন আইনজীবীর দায়ের করা রিট আবেদনের দিকে তাকিয়ে ছিলেন সবাই। গতকাল রিট মামলার রায়ে নতুন করে সংকট তৈরি হয়েছে।

“হাইকোর্টের দেওয়া এ আদেশে রাষ্ট্রপক্ষ সংক্ষুব্ধ। আমরা এই রায়ের কার্যকারিতা স্থগিত রাখার জন্য রোববার আপিল বিভাগের চেম্বার জজের কাছে আবেদন করব,” সাংবাদিকদের জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

এদিকে আদালত যুক্তি দেখিয়েছেন, বিচারকদের যদি সংসদ সদস্যদের দ্বারা অপসারণের বিধান রাখা হয়, তাহলে সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হবে। আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে আসে, সংসদের হাতে বিচারপতি অপসারণের ক্ষমতা ফিরে যাওয়ার বিষয়টি দুর্ঘটনামাত্র।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, “আমাদের বক্তব্য ছিল, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর দ্বারা মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়া হয়েছে। মূল সংবিধানে ফিরে যাওয়ার অর্থই হলো, মূল সংবিধানকে কোনো আদালত কোনো রকম অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন না। আদালত শুধু পরে আনা সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন।”

মাহবুবে আলম বলেন, “৩০ লাখ লোকের রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা। আমাদের সংবিধান রচনা ৩০ লাখ রক্তের বিনিময়ে। ৩০ লাখ লোকের অক্ষরে লেখা এ সংবিধান। সুতরাং আমি মনে করি, সংবিধানের যেকোনো সংশোধনীকে আদালত অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন কিন্তু মূল সংবিধানের কোনো ধারাকে কোনো আদালত অবৈধ ঘোষণা করতে পারেন না। কারণ মূল সংবিধানের সৃষ্টিই হলো আদালত।”

উচ্চ আদালতের বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের কাছে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ৫ নভেম্বর হাই কোর্টে এই রিট আবেদন হয়। সেই রায় বৃহস্পতিবার ঘোষণা করা হয়েছে।

উত্তপ্ত সংসদ, ওয়াক আউট

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া রায় নিয়ে গতকাল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে জাতীয় সংসদের অধিবেশন। প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতের বিচারকদের কড়া সমালোচনা করে বক্তব্য রাখেন সাংসদরা। এ সময় কয়েক দফায় সংসদে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে স্পিকার শিরিন শারমিন চৌধুরীকে হিমশিম খেতে হয়।

কাকতালীয়ভাবে গতকাল বিচারপতিদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর বিল সংসদে উত্থাপন করা হলে এর প্রতিবাদে বিরোধী দলীয় নেত্রী রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির সাংসদরা ওয়াক আউট করেন। বিচারকদের বেতন-ভাতা বাড়ানো সংক্রান্ত বিল উত্থাপন করতে গেলে সংসদ সদস্যদের বিরোধিতার মুখে পড়েন আইনমন্ত্রী।

এটা গ্রহণযোগ্য নয়: আইনমন্ত্রী

তিনশ বিধিতে দেওয়া বক্তব্যে আইনমন্ত্রী বলেন, “আমরা আইনের শাসনে বিশ্বাস করি। এখনও বিশ্বাস করি বিচার বিভাগ স্বাধীন। সে কারণে এই রায়ের বিরুদ্ধে আগামী রবি-সোমবারের মধ্যে আপিল করব। আমরা গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্র সহ্য করব না।”আইনমন্ত্রী বলেন, মূল সংবিধানের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনা চলে না।

পয়েন্ট অব অর্ডারে আলোচনা

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, 'এ সংসদ সার্বভৌম। আমরাই বিচারপতিদের নিয়োগ দিয়েছি। হাইকোর্ট সংসদ প্রণীত আইন বাতিল করলে এটা খারাপ দৃষ্টান্ত হবে।'

শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, 'এ রায়ের পেছনে ষড়যন্ত্র আছে। রাষ্ট্রপতি অপরাধ করলে সংসদ তাকে অপসারণ করতে পারলে বিচারপতিরা কোথা থেকে এসেছেন যে, তাদেরটা করা যাবে না।'

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।