Follow us

৫০ শতাংশ ঋণ বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি বিশ্বব্যাংকের

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016-10-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সফররত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।
ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘর পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ সফররত বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম।
ফোকাস বাংলা

দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগ এনে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করা বিশ্বব্যাংক তিন বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের জন্য ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করেছে সংস্থাটি।

দেশের অপুষ্টি দূরীকরণে বাড়তি ১০০ কোটি ডলার দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছে সংস্থাটি। ঢাকায় সফররত বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম সোমবার সকালে অর্থ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠকের পর এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেন।

বিশ্বব্যাংকের এই বর্ধিত সহযোগিতা আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সরকারের লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া জিম উয়ং কিমের এ সফর পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া তিক্ততা কমিয়ে সম্পর্ক নবায়নে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে তা ব্যবহারে সক্ষমতা অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থনীতিবিদেরা।

৫০ শতাংশ ঋণ সহায়তা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের সাফল্য ও বিমোচনের কৌশল সরেজমিনে দেখতে রোববার বিকেলে ঢাকায় পৌঁছান বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। সোমবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে বৈঠক করে দিনের কর্মসূচি শুরু করেন তিনি।

প্রায় পৌনে এক ঘণ্টার বৈঠকের পরে সংবাদ সম্মেলনে বিশ্বব্যাংকের পঞ্চম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাংলাদেশ সফরে আসা জিম ইয়ং ঘোষণা দেন, “বিভিন্ন দেশে ঋণ সহায়তা ৫০ শতাংশ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এরই অংশ হিসেবে আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বাংলাদেশে ৫০ শতাংশ ঋণ সহায়তা বাড়ানো হবে। এ ক্ষেত্রে সহায়তার ফোকাস হবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা।”

এর বাইরে শিশু অপুষ্টি দূর করতে আগামী দুই বছরে বাংলাদেশকে বর্তমানের চেয়েও ১০০ কোটি ডলার বেশি সহায়তা ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।

তিন বছরের প্যাকেজে ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিসটেন্স (আইডিএ) হিসেবে স্বল্প সুদে বাংলাদেশকে ঋণ দিয়ে থাকে বিশ্ব ব্যাংক। যার আওতায় এ পর্যন্ত ২৪ বিলিয়ন ডলার ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ।

আগামী তিন অর্থবছরে আইডিএ হিসেবে বাংলাদেশকে বিশ্বব্যাংকের ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়া কথা রয়েছে। প্রেসিডেন্ট কিমের ঘোষণা অনুযায়ী, এই ঋণের আরও ৫০ শতাংশ বাড়লে, আগামী ২০১৭-১৮ থেকে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার ঋণ সহায়তা পাবে বাংলাদেশ।

যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলেন, “বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার বিশ্বব্যাংক যোগাযোগসহ সকল খাতেই সহায়তা দিয়ে থাকে। এর আগে পদ্মা সেতুতে যে তহবিল দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ছিল, অন্যান্য প্রকল্পে দিয়ে সে অর্থের সমন্বয় করেছে তারা।”

সংবাদ সম্মেলন শেষে অর্থমন্ত্রী এক প্রশ্নের উত্তরে বেনারকে বলেন, “পদ্মা সেতু নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সৃষ্ট বিশ্বব্যাংকের জটিলতা কেটে গেছে।”

এর আগে সরকারের অন্যতম প্রকল্প ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ পদ্মা সেতু নির্মাণে মোট ২৯১ বিলিয়ন ডলারের ১২০ কোটি ডলার দেওয়ার কথা থাকলেও দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয়েছে অভিযোগ এনে অর্থায়ন বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। পরে ২০১৩ সালে বিশ্বব্যাংককে বাদ দিয়েই নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর নির্মাণের ঘোষণা দেয় সরকার। নির্মাণাধীন সেতুটি ২০১৯ সালে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য উদ্‌যাপনে এসেছেন জানিয়ে জিম ইয়ং কিম বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে বাংলাদেশে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত রয়েছে।”

দারিদ্র্য বিমোচনে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা পথ দেখাবে

দারিদ্র্য বিমোচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জনকে চমৎকার উল্লেখ করে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট বলেছেন, অন্য দেশও এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সুফল অর্জন করতে পারবে।

উল্লেখ্য, এ বছর বিশ্ব দারিদ্র্য বিমোচন দিবস উদ্‌যাপনে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে জাতিসংঘ। সে উপলক্ষে সোমবার ঢাকায় দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্বে বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন সংস্থাটির প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তিতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে অতি দারিদ্র্যের হার ছিল ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা ১২ দশমিক ৯ শতাংশে নেমেছে।

জনগণের পেছনে বিনিয়োগকে অবকাঠামো ক্ষেত্রে বিনিয়োগের মতোই জরুরি বলে মন্তব্য করে বিশ্বব্যাংক প্রধান বলেন, “অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাংলাদেশে সেই বিনিয়োগ সম্ভব হয়েছে।”

অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ পল রোমার, বিশ্বব্যাংক সাউথ এশিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট অ্যানেট ডিক্সনও বক্তৃতা করেন।

উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংক

দেশের উন্নয়নে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেছেন, “বিশ্বব্যাংক আমাদের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। আমাদের সমস্ত উন্নয়ন পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০২১ এবং রূপকল্প ২০৪১- জাতির পিতার ক্ষুধা-দারিদ্র্য-অশিক্ষা এবং বঞ্চনামুক্ত সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত। আমাদের এই প্রয়াসে বিশ্বব্যাংক আরও জোরালো ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করছি।”

অত্যন্ত ইতিবাচক, তবে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন

এদিকে বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা। পদ্মা সেতুকেন্দ্রিক জটিলতা পেরিয়ে দুপক্ষই নতুন সম্পর্কোন্নয়নে মনোযোগী বলেও মনে করছেন তাঁরা।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বেনারকে বলেন, “সামাজিক খাতে সাধারণত ঋণ পাওয়া যায় না। সেখানে বিশ্বব্যাংক সহায়তা বাড়াতে চাইছে। এটা অত্যন্ত ইতিবাচক। এই ঋণকে সুশাসনের মাধ্যমে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ পৃথিবীর কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।”

এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশে আর্থিক সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, এটা অনেক বড় সুখবর। তবে বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার একটি বড় অংশ অব্যবহৃত থাকার রেকর্ডও আমাদের রয়েছে। তাই ঋণ নেওয়ার আগে সেটা কাজে লাগানোর সক্ষমতা অর্জন জরুরি।”

পদ্মা সেতু নিয়ে সংস্থাটির সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টির প্রসঙ্গে খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, “পদ্মা সেতু নিয়ে যা ঘটেছিল, তা দুপক্ষই ভুলে গিয়ে সম্পর্ককে নতুনভাবে এগিয়ে নিতে চায়।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন