Follow us

চলে গেলেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-10-18
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকার একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আইয়ুব বাচ্চু। ৮ মে ২০১৫।
ঢাকার একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আইয়ুব বাচ্চু। ৮ মে ২০১৫।
বেনারনিউজ

বাংলাদেশের জনপ্রিয় ব্যান্ড সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু মারা গেছেন। এ দেশের ব্যান্ড সংগীতকে এগিয়ে নেওয়ার অন্যতম অগ্রপথিক আইয়ুব বাচ্চু একাধারে ছিলেন গায়ক, গিটারিস্ট, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী।

বৃহস্পতিবার সকালে মগবাজারে নিজ বাসায় অচেতন হয়ে পড়লে তাঁকে স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আইয়ুব বাচ্চুর বয়স হয়েছিল ৫৬ বছর।

স্কয়ার হাসপাতালের মেডিকেল সার্ভিসের পরিচালক মির্জা নাজিমউদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, “সকাল সাড়ে ৮টায় আইয়ুব বাচ্চু বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে ওনার ড্রাইভার আমাদের হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আমরা তাঁকে মৃত অবস্থাতেই পাই। তারপরও ১৫ থেকে ২০ মিনিট চেষ্টা করেন চিকিৎসকরা। পরে ৯টা ৫৫ মিনিটে তাঁকে আমরা মৃত ঘোষণা করি।”

“তিনি বহুদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন। দুই সপ্তাহ আগেও তিনি চেকআপ করিয়ে গেছেন। এর আগে ২০০৯ সালে তাঁর হার্টে রিং পরানো হয়। আর ২০১২ সালে ফুসফুসে পানি জমার কারণে এই হাসপাতালেই চিকিৎসা নিতে হয়েছিল আইয়ুব বাচ্চুকে,” বলেন ড. নাজিম উদ্দিন।

ব্যান্ড দল এলআরবির লিড গিটারিস্ট ও ভোকালিস্ট আইয়ুব বাচ্চু গিটারিস্ট হিসেবে পুরো ভারতীয় উপমহাদেশেই সুখ্যাত।

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ এবং সৌদি আরব সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এই শিল্পীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন।

প্রায় চার দশক ধরে সংগীত জগতে রাজত্ব করা আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর খবরে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। সংগীত জগতের পাশাপাশি ভক্ত শ্রোতারাও এসময় হাসপাতালে ছুটে আসেন।

সাংস্কৃতিক সংগঠক নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু হাসপাতালে সাংবাদিকদের বলেন, সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় আইয়ুব বাচ্চুর মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নেওয়া হবে। এদিন জুমার পর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।

এরপর বিদেশে থাকা তাঁর দুই ছেলে মেয়ে দেশে ফিরলে শনিবার এই শিল্পীর মরদেহ চট্টগ্রামে নেওয়া হবে। সেখানে আরেক দফা জানাজার পর মায়ের কবরের পাশে তিনি অন্তিম শয়ানে শায়িত হবেন।

সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোক

আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুতে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও এই শিল্পীর মৃত্যুতে শোক ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন তাঁরা।

বাংলাদেশের আরেক ব্যান্ড তারকা হাসান আইয়ুব বাচ্চু সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, “মানুষের মনে যে সুর বাজে সেই সুরই কণ্ঠে ধারণ করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। নতুন প্রজন্ম তাঁকে অনুসরণ করবে। মনে রাখবে অনেক দিন। তাঁর সৃষ্টিকর্মে বেচে থাকবেন তিনি।”

জনপ্রিয় ব্যান্ড মাইলসের সংগীতশিল্পী শাফিন আহমেদ শোক প্রকাশ করে ফেসবুকে লিখেছেন, “আইয়ুব বাচ্চু তাঁর সংগীতের মধ্য দিয়ে লাখো-কোটি মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছেন।”

গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়েজী বেনারকে বলেন, “আইয়ুব বাচ্চুর অসময়ে মৃত্যু সংগীতাঙ্গনের জন্য বিরাট ক্ষতি। শুধু সুরের জাদু দিয়ে নয়, গিটারিস্ট, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তিনি জায়গা করে নিয়েছেন লাখো শ্রোতার হৃদয়ে। বাংলা গান যত দিন থাকবে তত দিন তিনি বেঁচে থাকবেন।”

আইয়ুব বাচ্চুকে হারানোর শোক ছুঁয়েছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও।

কলকাতার শিল্পী অঞ্জন দত্ত ফেসবুকে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘টেরিবল লস...আইয়ুব বাচ্চু...’।

সংগীতে তাঁর অবদান

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরে জন্ম নেওয়া এলআরবি ব্যান্ডের জনপ্রিয় এই ভোকাল দীর্ঘ চার দশকে অসংখ্য জনপ্রিয় গান উপহার দিয়েছেন। ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডের মাধ্যমে ১৯৭৮ সালে সংগীতজগতে প্রবেশ করেন তিনি। শহীদ মাহমুদ জঙ্গির লেখা ‘হারানো বিকেলের গল্প’ শিরোনামের গানটিতে প্রথম কণ্ঠ দেন আইয়ুব বাচ্চু।

অত্যন্ত গুণী এই শিল্পী শ্রোতা-ভক্তদের কাছে এবি নামেও পরিচিত। মূলত রক ঘরানার কণ্ঠের অধিকারী হলেও আধুনিক গান, ক্লাসিকাল সঙ্গীত এবং লোকগীতি দিয়েও মুগ্ধ করেছেন শ্রোতাদের। করেছেন প্লে-ব্যাকও।

আইয়ুব বাচ্চু ১৯৮০-১৯৯০ সাল পর্যন্ত সোলস ব্যান্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৬ সালে ‘রক্তগোলাপ’ প্রথম এবং ১৯৮৮ সালে ‘ময়না’ নামে দ্বিতীয় একক অ্যালবাম বের হয় তাঁর। আইয়ুব বাচ্চুর অন্যান্য একক অ্যালবাম হলো দুটি মন, কাফেলা, প্রেম প্রেমের মতো, পথের গান, ভাটির টানে মাটির গানে, জীবন, সাউন্ড অব সাইলেন্স, রিমঝিম বৃষ্টি, বলিনি কখনো ও জীবনের গল্প।

সোলস থেকে বের হয়ে ১৯৯১ সালে এল আর বি ব্যান্ড গঠন করেন আইয়ুব বাচ্চু।

আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ‘রূপালি গিটার’, ‘রাত জাগা পাখি হয়ে’, ‘মাধবী’, ‘ফেরারি মন’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘বার মাস’, ‘হাসতে দেখ’, ‘উড়াল দেব আকাশে’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি', ‘সেই তুমি কেন অচেনা হলে’, ‘একদিন ঘুম ভাঙ্গা শহরে’, ‘মেয়ে ও মেয়ে’, ‘কবিতা সুখ ওড়াও’, ‘এক আকাশ তারা’ গানগুলো দারুণ জনপ্রিয়।

ঢাকার মগবাজারে এবি কিচেন নামে আইয়ুব বাচ্চুর নিজের একটি স্টুডিও রয়েছে।

“আইয়ুব বাচ্চু একজন শিক্ষকও ছিলেন। এ দেশে ব্যান্ডসংগীতে এ রকম শিক্ষক আর নেই বললেই চলে। তাঁর মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা সবাই তাঁকে মিস করব,” বলছিলেন ব্যান্ড তারকা লাবু রহমান।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন