খায়রুলসহ এবিটির গোয়েন্দারা ব্লগারদের লেখা ও গতিবিধি অনুসরণ করত

ঢাকা থেকে শাহরিয়ার শরীফ
2016.11.14
Share on WhatsApp
Share on WhatsApp
খায়রুলসহ এবিটির গোয়েন্দারা ব্লগারদের লেখা ও গতিবিধি অনুসরণ করত প্রকাশক দীপন ও ব্লগার নিলয় হত্যায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার হওয়া এবিটির সদস্য খায়রুল। নভেম্বর ১২, ২০১৬।
স্টার মেইল

প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপন ও ব্লগার নীলাদ্রি চ্যাটার্জি নিলয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের (এবিটি) কথিত আইটি বিশেষজ্ঞ খায়রুল ইসলামকে (২৬) গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। ওই যুবক এবিটির গোয়েন্দা (ইন্টেলিজেন্স) শাখার শীর্ষ পর্যায়ের একজন সদস্য বলেও দাবি করছে পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ইসলাম অবমাননার কথিত অভিযোগে এ পর্যন্ত আটজন ব্লগার হত্যার ঘটনায় এবিটির মোট ৪২ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ বলছে, এই গ্রেপ্তার অভিযান অব্যহত থাকবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একটি সূত্র বেনারকে জানায়, এখন তাদের মূল টার্গেট এবিটির সামরিক কমান্ডার ও চাকরিচ্যুত সেনা কর্মকর্তা সৈয়দ জিয়াউল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা, যিনি ‘মেজর জিয়া’ নামে পরিচিত। খায়রুলের কাছ থেকে জিয়ার বিষয়ে বেশকিছু তথ্য জানতে পেরেছে পুলিশ।

গত শনিবার খায়রুলের পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত, যা শেষ হবে আগামী বৃহস্পতিবার। গত শুক্রবার রাত পৌনে ১০টার দিকে রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তারের পর ডিবি হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।  “প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে প্রকাশক দীপন ও ব্লগার নিলয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে খায়রুল। ২০১৪ সাল থেকে সে এবিটির গোয়েন্দা শাখার অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করছে,” বেনারকে জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের মুখপাত্র মাসুদুর রহমান।

এ​দিকে গত শনিবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারে খায়রুলকে গ্রেপ্তারের বিষয় গণমাধ্যমকে অবহিত করেন ডিবির যুগ্ম কমিশনার আব্দুল বাতেন।  আব্দুল বাতেন বলেন, দীপন ও নিলয় হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে খায়রুল সহকর্মীদের সঙ্গে রাজধানীর শেওড়াপাড়া, মোহাম্মদপুর ও এলিফ্যান্ট রোডের বাসায় জঙ্গি প্রশিক্ষণ নেয়। এলিফ্যান্ট রোডের একটি বাসায় সাত দিনের ‘সামরিক প্রশিক্ষণ’ নেয় তারা।  হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর সে ও তার সহযোগীরা ফেসবুক বা টুইটারে দায় স্বীকার করে। নিহতদের বিরুদ্ধে ইসলাম অবমাননার অভিযোগ তোলে তারা।

বড় ভাইয়ের হাত ধরে

জঙ্গি খায়রুল জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, ২০১৩ সালে বড় ভাই ‘মেজর জিয়ার’ সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ওই মেজরের মাধ্যমেই সে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমে যোগ দেয়। ২০১৪ সাল থেকে সংগঠনের তথ্য-প্রযুক্তি (আইটি) বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি ইন্টারনেটে নজরদারি ও সংগঠনের তথ্য বিশ্লেষণ করাই ছিল তার দায়িত্ব।  তবে সংগঠনে তার মূল কাজ ছিল ইন্টারনেট থেকে মুক্তমনা ও ব্লগারদের তথ্য সংগ্রহ করে বড় ভাইকে জানানো। এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সম্ভাব্য টার্গেটের বিষয়ে বড় ভাই পরিকল্পনা তৈরি করত। পরে টার্গেটের বিষয়ে আরো তথ্য সংগ্রহ করা হতো।

খায়রুল জানায়, কাউকে হত্যার আগে টার্গেট ঠিক করত ওই বড় ভাই। একটি অপারেশনাল টিমকে হত্যার দায়িত্ব দেওয়া হতো। দীপন ও নিলয় হত্যার দায়িত্ব তাকে (খায়রুল) দেওয়া হয়। এরপর সে দীপন ও নিলয় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া ‘কিলার গ্রুপের’ পাঁচজনসহ পুরো বিষয়টি নজরদারি করে।

পুলিশের ব্রিফিংয়ে বলা হয়, জিয়ার নির্দেশে এ পর্যন্ত সব ব্লগার হত্যাকাণ্ড হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৬ সেপ্টেম্বর জিয়ার সঙ্গে ঢাকার আশপাশের একটি এলাকায় খায়রুলের দেখা হয়।  বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ড. অভিজিৎ রায় হত্যাকাণ্ডের সময় ওই এলাকায় থাকা সিসি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজে খায়রুলকে দেখা গেছে উল্লেখ করে আব্দুল বাতেন বলেন, ফুটেজ থেকে অন্তত চারজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এরা হচ্ছে; জামিল, রিফাত, ফাহিম ও জিসান। তারা সবাই দীপন ও নিলয় হত্যাকাণ্ডে জড়িত।

খায়রুলের একাধিক নাম

খায়রুলের গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহের চণ্ডীপুরে। খায়রুল চট্টগ্রামে বড় ভাই-বোনের সঙ্গে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ছিল। এর পর থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। এবিটিতে যোগ দেওয়ার পর সে ঢাকায় আসে।  সাংগঠনিকভাবে একাধিক নামে পরিচিত খায়রুল। সে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে কখনো তার নাম জিসান আবার কখনো ফাহিম আবার কখনো জামিল কিংবা ইফাদ বলেছে।  পুলিশের কাছে তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিলয় ও দীপন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। খায়রুল বহুদিন ধরে তাঁদের অনুসরণ করে আসছিল। এরপর এ-সংক্রান্ত তথ্য এবিটির সামরিক বা আসকারি শাখায় জানিয়েছিল সে।

এবিটির গোয়ন্দো শাখা যেভাবে কাজ করে

এবিটির গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা ব্লগারদের লেখা অনুসরণ করে। তারা যদি দেখে যে, কোনও ব্লগার ইসলাম ধর্মের অবমাননা করেছে, তাহলে সেই লেখাটি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করে। প্রথমে তারা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম থেকে ওই ব্লগারের তথ্য নেয়। এরপর গোয়েন্দা শাখার প্রধানের কাছে আপত্তিকর বক্তব্যগুলো পাঠানো হয়।

গত বছরের ৭ আগস্ট রাজধানীর গোড়ানের ১৬৭ নম্বর বাড়ির পঞ্চম তলায় ব্লগার নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন খান বেনারকে বলেন, একজন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে তাঁর মনে হয়েছে যে, লেখালেখির জন্য মারা গেছেন নিলয়।  “একজন হত্যাকারি ভাড়াটিয়া সেজে নিলয়ের বাসায় প্রবেশ করে। নিলয়কে বাসায় দেখে ওই যুবক অপেক্ষারত অপর তিনজনকে মিসডকল দেয়। মিনিটখানেকের মধ্যে তারা বাসায় ঢুকে নিলয়কে কুপিয়ে হত্যা করে,” জানান আনোয়ার হোসেন।

এদিকে গত বছর ৩১ অক্টোবর বিকেলে শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেটে নিজের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জাগৃতির কার্যালয়ে খুন হন ফয়সল আরেফিন দীপন। ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়ের বইয়ের প্রকাশক ছিলেন তিনি। দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বেনারকে বলেন, তদন্ত কর্মকর্তারা মাঝেমধ্যে তাঁকে মামলার অগ্রগতির বিষয়টি অবহিত করছেন। “তবে আমার মনে হয় এবং আমি বিশ্বাস করি পুলিশ আন্তরিক হলে এই হত্যা মামলার বিচার হবে,” জানান প্রবীণ ওই শিক্ষাবিদ।

মন্তব্য করুন

নীচের ফর্মে আপনার মন্তব্য যোগ করে টেক্সট লিখুন। একজন মডারেটর মন্তব্য সমূহ এপ্রুভ করে থাকেন এবং সঠিক সংবাদর নীতিমালা অনুসারে এডিট করে থাকেন। সঙ্গে সঙ্গে মন্তব্য প্রকাশ হয় না, প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য সঠিক সংবাদ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয় বস্তুর প্রতি আবদ্ধ থাকুন।