Follow us

ঢাকার নিমতলির পর চুড়িহাট্টা, এবার আগুনে পুড়ে নিহত ৬৭

প্রাপ্তি রহমান ও জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-02-21
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
পুড়ে যাওয়া ঢাকার চকবাজারে উদ্ধার তৎপরতা। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
পুড়ে যাওয়া ঢাকার চকবাজারে উদ্ধার তৎপরতা। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯।
[মেঘ মনির/বেনারনিউজ]

আপডেট: ইস্টার্ন সময় দুপুর ০২.০০

নয় বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছিলেন ১২৪ জন মানুষ। কাছেই চকবাজারের চুড়িহাট্টায় বুধবার আবারও সেই আগুন। ঢাকা জেলা প্রশাসনের হিসাব মতে, এবার আগুনে পুড়ে প্রাণ হারালেন ৬৭ জন।

বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ৪০টি মৃতদেহ শনাক্ত করা গেছে। জেলা প্রশাসন ৩৮টি লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেছে। বাকি লাশের পরিচয় পাওয়া যাবে কখন, তা কেউ জানে না। প্রিয়জনকে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গের সামনে ছিল অসংখ্য মানুষ। কিন্তু চিকিৎসকেরা নিরুপায়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদ বলছিলেন, লাশগুলো চেনা যাচ্ছে না।

“অগ্নিদগ্ধ বেশ কটি মৃতদেহ চেনা যাচ্ছে না। ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে মিলিয়ে দেখার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে মৃতদেহটি কার,” সোহেল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন।

তারপরও প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা করছে মানুষ। এই অপেক্ষার পালা কত দীর্ঘ সে নিশ্চয়তা দিতে পারছেন না কেউ।

ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ও শিল্প মন্ত্রণালয় আলাদা দুটি কমিটি গঠন করে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান ও সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এতে সবাই ঠিক কতটা আশ্বস্ত হতে পারছেন সে প্রশ্ন রয়ে গেছে।

নিমতলীতে দুর্ঘটনার জন্য পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোতে রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম থাকাকে দায়ী করা হয়েছিল। এত দিন পরও সেগুলো সরেনি। সেই শঙ্কা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে মানুষকে।

এবার পুরান ঢাকা থেকে সব ধরনের রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিতে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। মেয়রও ঘোষণা দিয়েছেন এবার এই কাজটি শক্তহাতে করবেন তিনি।

চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও।

“চকবাজারের ঘটনা থেকে আমরা আবারও শিক্ষা পেলাম। ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব, মনোযোগী হব, মনোনিবেশ করব,” ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের বলেন ওবায়দুল কাদের।

অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত

ঐতিহাসিকভাবেই পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনগুলোয় রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের কারখানা রয়েছে। বুধবার রাত সাড়ে ১০টায় চুড়িহাট্টার অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত ঠিক কীভাবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে কারণ যাই হোক, পুরান ঢাকার জনবহুল ঘিঞ্জি এলাকায় কলকারখানার উপস্থিতি আগুনের ভয়াবহতা বাড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আগুন লাগার খবর পেয়েই ফায়ার সার্ভিস ঘটনাস্থলের দিকে রওনা হয়। একে একে ৩২টি ইউনিট উদ্ধার অভিযানে নামে। বেশ কিছুটা দূর থেকে একটির পর একটি বাড়িতে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। ভোর ৪টার দিকে ফায়ার ব্রিগেড অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক আলী হায়দার আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার খবর জানান। এর পরপরই একটি একটি করে বেরিয়ে আসে ৬৭টি লাশ।

উদ্ধার অভিযানে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা বলছিলেন, সরু গলিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে পারছিল না, ছিল পানির স্বল্পতা। অভিযানে অংশগ্রহণকারী একজন ফায়ার ফাইটার বেনারনিউজকে বলেন, একপর্যায়ে নর্দমার পানিও তাঁরা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছেন। পানি টেনে আনতে হয়েছে নাজিমউদ্দীন রোডের পুরোনো কারাগার থেকে।

অগ্নিকাণ্ডের শুরু থেকে বৃহস্পতিবার ভোর পর্যন্ত চুড়িহাট্টার বেশ কয়েকজন বাসিন্দার সঙ্গে কথা হয় বেনার প্রতিবেদকের। চুড়িহাট্টার একজন ব্যবসায়ী মো রফিকউদ্দীন। তিনি বলছিলেন গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণ থেকে আগুনের সূত্রপাত।

“মাইক্রোবাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে প্রথমে একটি হোটেলে আগুন ধরে যায়। পরে সেখান থেকে পাঁচতলা ভবনে" বলেন রফিকউদ্দীন।

ওই ভবনের প্রথম তলায় প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামাল ও তৃতীয় তলায় পারফিউমের কাঁচামাল ছিল। সেখান থেকেই একটির পর একটি ভবনে আগুন ধরে যায়।

মো. আবদুর রহমান নামে অপর এক ব্যক্তি বলেন, “ট্রান্সফরমার বিস্ফোরণের পর একটা পিকআপ জ্বলে যায়। তারপরই পুরো এলাকায় আগুন ধরে যায়।”

তবে ফায়ার সার্ভিস এখনই কিছু বলতে চাইছে না। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক শাকিল নেওয়াজ খান বেনারকে বলেন, “আমরা নিশ্চিত নই। তদন্ত চলছে। সাত দিন পর প্রতিবেদন জমা দেবো।”

শিল্প মন্ত্রণালয় প্রাথমিক প্রতিবেদনে দাবি করেছে গ্যাস সিলিন্ডারের বিস্ফোরণ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। শিল্পমন্ত্রী নুরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন গতকাল বার্ন ইউনিটে অগ্নিদগ্ধদের দেখে ফেরার পথে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। তিনি বলেন গ্যাসের চাপ কম থাকায় এলপিজি গ্যাসের সিলিন্ডার ব্যবহার করছিল হোটেল রেস্তোরাঁগুলো। তা থেকেই আগুন লেগেছে। এখানে রাসায়নিকের কোনো কারবার নেই।

“রাসায়নিক থেকে আগুন, এটা ভুল তথ্য। আমি নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখেছি। এমনকি ওয়াহিদ ম্যানশনেও কোনো গুদাম ছিল না,” নুরুল মজিদ বলেন। তিনি আরও বলেন, ভবনটিতে প্লাস্টিকের গ্র্যানুলা ও প্রসাধন সামগ্রী ও কিছু সুগন্ধী ছিল।

নিমতলীতে এত প্রাণহানির পরও কেন দাহ্য পদার্থের কারখানা সে প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তাহলে তো আমাকে এখন পুরো শহর ভেঙে চুরমার করে দিতে হবে।’ একপর্যায়ে তিনি বলে, শিল্পকারখানাগুলো সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে দুটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এলাকা ছাড়তে চান না।

মর্গের সামনে স্বজনদের আহাজারি

বুধবার রাতে যাদের খোঁজে স্বজনেরা এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটছিলেন ভোরের দিকে তাঁদের খোঁজ মিলতে শুরু করে। জরুরি বিভাগ ছেড়ে মানুষ ভিড় জমায় মর্গের সামনে। মর্গের বাইরে যমজ দুই শিশুকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দুই ব্যক্তি। তাঁদের একজন আজিজুল ইসলাম।

আজিজুল বলছিলেন, চুড়িহাট্টায় তাঁর ভগ্নিপতি মো. কাওছারের একটি ফার্মেসি আছে। আগুন লাগার পর থেকে ফোন বন্ধ পাচ্ছিলেন। তখন থেকেই খোঁজ শুরু। কাওছারকে বেসরকারি একটি হাসপাতালে পাওয়া গেছে, এমন খবর পেয়ে ছুটে গিয়েছিলেন। তখন দেখেন এই কাওছার তাঁদের কাওছার নন।

“সকালে মর্গে এসে কাওছারের লাশ পেলাম। ওর ফার্মেসিতে দুজন শিক্ষানবিশ চিকিৎসক, কয়েকজন রোগী ছিল। মারা গেছে কেউ, কেউ নিখোঁজ,” বেনারকে আজিজুল ইসলাম বলেন।

ছোট্ট শিশু আরাফাতের দেহটা পুড়ে অঙ্গার হয়ে গেছে। সে তার দাদা--দাদির সঙ্গে বাবা মোহাম্মদ আলীর কাছে গিয়েছিল। বায়না ধরেছিল বাবার সঙ্গেই ফিরবে। বাবার সঙ্গেই পুড়ে মারা গেছে ও। মর্গের বাইরে বসে চিৎকার করে ভাই মোহাম্মদ আলীর নাম ধরে থেমে থেমে কেঁদে উঠছিলেন জরিনা বেগম।

“মোহাম্মদ আলী বাবা-মাকে বলেছিল, দোকানটা বন্ধ করে ছেলে নিয়ে ফিরবে। ওর পাশেই লাশটা আছে মর্গে,” বেনারকে বলেন তাঁর বোন জরিনা বেগম।

পুরান ঢাকার চকবাজারে হাজী ওয়াহেদ ম্যানশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নাতি রোহানকে খুঁজতে ছোটাছুটি করছিলেন ইসমাইল খান।

তিনটি মোটরসাইকেলে ছিলেন ওঁরা ছজন। চুড়িহাট্টায় আগুন লাগার পর থেকে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রোহানের বাবা মো. হোসেন হাসপাতালে হাসপাতালে ছুটেছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার স্বজনদের নিয়ে মর্গে এলেন।

রোহানের নানা ইসমাঈল খানের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই বললে, “আমার ভাইয়া, সে খুবই সুন্দর,” বলেই এগিয়ে দেন মুঠোফোন। তাতে প্রিয় নাতির ছবি। সিয়ামের লাশ পাওয়া গেলেও রোহানকে শনাক্ত করা যায়নি। রোহানের মা কাছেই তখন চিৎকার করে কাঁদছিলেন ছেলের একটা টুকরো হলেও ছুঁয়ে দেখতে চান বলে।

হাসপাতালে ১১ জন

ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের চিকিৎসক হোসাইন ইমাম জানান, তাঁদের ইউনিটে অগ্নিদগ্ধ নয়জন রোগী আছেন। তাদের চারজনকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয়েছে।

“প্রত্যেকের শ্বাসনালি পুড়ে গেছে। যারা আইসিইউতে আছে এবং যারা এর বাইরে সবার অবস্থাই আশঙ্কাজনক,” হোসাইন ইমাম বেনারনিউজকে বলেন।

এর বাইরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ক্যাজুয়ালটি বিভাগে চিকিৎসাধীন আছেন আরও দুজন। তাঁদের অবস্থা স্থিতিশীল বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসিরউদ্দীন।

চুড়িহাট্টার ঘরবাড়ি ব্যবসাকেন্দ্র জনশূন্য

চকবাজার থানার উল্টোদিকে গলিপথ ধরে একটু এগোলেই চুড়িহাট্টা। গলিপথ এত সরু যে দুজন মানুষ পাশাপাশি হাঁটার সুযোগ নেই।

চুড়িহাট্টার যে আবাসিক ভবনে হোটেল থেকে প্রথম আগুন লাগে সেটির নাম হাজী ওয়াহেদ ভবন। বৃহস্পতিবার দুপুরে প্লাস্টিকের কণা, পারফিউম ও কসমেটিক্সের শত সহস্র বোতল মাড়িয়ে পৌঁছাতে হলো ভবনটিতে। তার আগেই চোখে পড়ে পুড়ে যাওয়া গাড়ি আর মোটরসাইকেল।

সুরম্য ওয়াহেদ ভবনের শুধু কাঠামোটুকু দাঁড়িয়ে আছে। ভবনের মালিক দুজন মো. হাসান ও সোহেলকে দুপুর পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। আশপাশের অন্য ভবনগুলোও জনশূন্য। পুরো এলাকা দেখে মনে হলো ভীষণ এক তাণ্ডব ঘটে গেছে।

দায়িত্বরত ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, পুলিশ, র‍্যাব সদস্যরা জানান পুরো এলাকা বসবাসের জন্য খুলে দিতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে। চকবাজার থানা-পুলিশ জানায়, পুলিশ বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনায় অগ্নিদুর্ঘটনার একটি মামলা দায়ের করেছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন