Follow us

নেপালে বিমান দুর্ঘটনায় মৃতের সংখ্যা ৫১

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2018-03-13
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কাঠমান্ডুতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় নেপালের জনগণ। ১৩ মার্চ ২০১৮।
কাঠমান্ডুতে মোমবাতি জ্বালিয়ে বিমান দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় নেপালের জনগণ। ১৩ মার্চ ২০১৮।
AP

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের (টিআইএ) রানওয়ের কাছে বিধ্বস্ত বাংলাদেশের বেসরকারি বিমান সংস্থা ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতান মারা গেছেন।

“আবিদ সুলতান আজই মারা গেছেন,” মঙ্গলবার সকালে ঢাকার সাংবাদিকদের বলেছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম।

সন্ধ্যায় নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাশফি বিনতে শামস বেনারকে বলেন, “পাইলট, কেবিন ক্রুসহ মোট ৩৬ জন বাংলাদেশি আরোহীর মধ্যে ১০ জন এখন নেপালের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা ধরে নিয়েছি ২৬ জন বেঁচে নেই।”

“নিহতদের পরিবারের সদস্যরা আজ (মঙ্গলবার) কাঠমান্ডু এসেছেন। নিজ নিজ স্বজনদের লাশ শনাক্ত করেছেন। এখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে যত দ্রুত সম্ভব ‘ডেড বডিগুলো’ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে,” উল্লেখ করেন বাংলাদেশি এই কর্মকর্তা।

এর আগে বিকেলে ঢাকার বারিধারায় ইউএস বাংলা এয়ারলাইনসের করপোরেট অফিসে সংবাদ সম্মেলনে ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, “ফরেনসিক রিপোর্ট এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পরে মরদেহ ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হবে।”

নেপালের সরকারি সংবাদ সংস্থা রাষ্ট্রীয় সমাচার সমিতি (আরএসএস) তাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে বলেছে, “মঙ্গলবার অবধি মোট ৫১ জন মারা গেছেন। যার মধ্যে ২৮ জন বাংলাদেশি, ২২ জন নেপালি এবং একজন চীনের নাগরিক।”

উল্লেখ্য, এই দুর্ঘটনাকে ‘আরএসএস’ নেপালের ইতিহাসের ‘তৃতীয় সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী বিমান দুর্ঘটনা’ বলেও আখ্যা দিয়েছে।

এদিকে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজের হতাহত বাংলাদেশি যাত্রীদের স্বজনদের নিয়ে ইউএস-বাংলার একটি বিশেষ উড়োজাহাজ মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে কাঠমান্ডু পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন ইউএস-বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল।

চিকিৎসাধীনরা কে কোথায়

চিকিৎসাধীন বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন নরভিক ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে, একজন ওম হাসপাতাল ও বাকি আটজন কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন বলে জানিয়েছে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ।

তাঁদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, নরভিক হাসপাতালে ইয়াকুব আলী, ওম হাসপাতালে মো. রেজওয়ানুল হক এবং কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইমরানা কবির হাসি, শাহরিন আহমেদ, শেখ রাশেদ রুবায়েত, আলমুন নাহার অ্যানি, মেহেদি হাসান, সৈয়দা কামরুন্নাহার স্বর্ণা, মো. হোসাইন কবির ও মো. শাহীন ব্যাপারী চিকিৎসাধীন আছেন।

কাঠমান্ডুর বিভিন্ন হাসপাতালে যারা চিকিৎসাধীন আছেন, তাঁদের চিকিৎসার সব খরচ ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনস বহন করবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মোহসীন জানিয়েছেন, “নিহত প্রত্যেকের পরিবার সর্বনিম্ন ২৫ হাজার মার্কিন ডলার ক্ষতিপূরণ পাবেন।”

মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “ইউএস বাংলা-এয়ারলাইনস প্রতিটি যাত্রীর বিমা করেছে। সে অনুযায়ী, প্রতিটি যাত্রী ক্ষতিপূরণ হিসেবে বিমার এই টাকা পাবেন।”

দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনদের সহায়তার জন্য বিমানবন্দরে একটি কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

তদন্ত শুরু

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে মঙ্গলবার ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নেপালের সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ। উড়োজাহাজের সংগৃহীত ডেটা রেকর্ডার নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে তারা।

নেপালের স্থানীয় গণমাধ্যম দা হিমালয়াকে টিআইএ’র মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রি এ তথ্য জানিয়ে বলেন, “ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার হওয়া ফ্লাইটের ডাটা রেকর্ডার সংরক্ষণ করা হয়েছে। এ ব্যাপারে অনুসন্ধানও শুরু হয়েছে।”

অন্যদিকে বিধ্বস্ত উড়োজাহাজটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান কানাডার বোমবারডিয়ার রয়টার্সকে বলেছে, তারাও তদন্তের কাজে নেপালে একটি দল পাঠাচ্ছে।

উল্লেখ্য, ইউএস-বাংলার এই উড়োজাহাজ ছিল বোমবারডিয়ার কিউ ৪০০ সিরিজের।

ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশের সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) একটি দলও নেপাল যাবে বলে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে আগের দিন জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান এম নাইম হাসান।

আবিদ ভালো বৈমানিক

নিজের কার্যালয়ে মঙ্গলবার দুপুরে বেবিচক চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের বলেন, “কাঠমান্ডু বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনের যে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে, তাতে কোনো সমস্যা ছিল না। বিধ্বস্ত বিমানটির ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানও বৈমানিক হিসেবে ভালো ছিলেন।”

প্রসঙ্গত, পাইলট আবিদ সুলতান ও ফার্স্ট অফিসার পৃথুলা রশিদ ক্রু খাজা হোসেন মো. শাফি ও শারমিন আক্তার নাবিলাকে নিয়ে বিধ্বস্ত ফ্লাইট বিএস-২১১ পরিচালনা করছিলেন; তাঁদের সবাই মারা গেছেন।

ছয় কর্মকর্তা অপসারণে প্রশ্ন

দুর্ঘটনার সময় কন্ট্রোল রুমে দায়িত্বরত ছয় কর্মকর্তাকে সরিয়ে দিয়েছে নেপালের বিমান কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় গণমাধ্যম মাই রিপাবলিকান ও নেপালি টাইমস মঙ্গলবার বিকেলে এ খবর প্রকাশ করেছে।

দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী এই ছয়জনের মানসিক আঘাত প্রশমনে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তাদের জানিয়েছেন নেপালের বেসামরিক বিমান কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক রায়হান পোকহারেল।

এ ঘটনার পর ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএস বাংলার মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) কামরুল ইসলাম বলেন, “এই বদলি কতটা যুক্তিযুক্ত তা বিবেচনার বিষয়।”

টিআইএ বনাম ইউএস বাংলা

নেপালের ইংরেজি দ্য হিমালয়া বলছে, “সোমবারের ওই বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে এয়ারলাইনস এবং বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ একে অপরকে দোষারোপ করে আসছে।”

“বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারের ভুল সংকেতের কারণে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়েছে,” দাবি করেছেন ইউএস-বাংলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইমরান আসিফ।

আর টিআইএ’র মহাব্যবস্থাপক রাজ কুমার ছেত্রি বলেছেন, “নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী উড়োজাহাজটি অবতরণ করেনি।”

বিধ্বস্ত হওয়া উড়োজাহাজটির পাইলটের সঙ্গে বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে শেষ কথোপকথনের রেকর্ডের বরাত দিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিচ্ছে দুই পক্ষ।

নেপালের একাধিক গণমাধ্যম বলছে, নেপালে ১৯৯২ সালের পর এটাই বড় ধরনের বিমান দুর্ঘটনা।

ওই বছর পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের (পিআইএ) একটি বিমান দুর্ঘটনায় ১৬৭ জন নিহত হন।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টিআইএ’তে ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ৬৫০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে।

শোক প্রকাশ অব্যাহত

উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে প্রাণহানির এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

সোমবার রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পাঠানো পৃথক শোকবার্তায় তিনি বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের শোকাহত পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন।

ক্রেমলিনের ওয়েবসাইট এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন ঢাকা থেকে কামরান রেজা চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন