Follow us

বিচারকক্ষে ক্ষতিপূরণের টাকা পেলেন সড়ক দুর্ঘটনার শিকার রাসেল

শরীফ খিয়াম
ঢাকা
2019-04-10
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গ্রিন লাইন পরিবহনের বাস চাপায় পা হারানো রাসেল সরকার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শুনানির দিন ঢাকায় হাই কোর্টে হাজির হন। ১০ এপ্রিল ২০১৯।
গ্রিন লাইন পরিবহনের বাস চাপায় পা হারানো রাসেল সরকার স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে শুনানির দিন ঢাকায় হাই কোর্টে হাজির হন। ১০ এপ্রিল ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

বহু নাটকীয়তার পর ক্ষতিপূরণ বাবদ পাঁচ লাখ টাকার চেক পেয়েছেন বাস চাপায় পা হারানো রাসেল সরকার। উচ্চ আদালতের বিচারকক্ষে বুধবার বেলা তিনটায় তাঁর হাতে এই চেক তুলে দেন গ্রিন লাইন পরিবহনের মালিক মোহাম্মদ আলাউদ্দিন।

বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদের তখন আলাউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “রাসেলের চিকিৎসায় অনেক টাকা খরচ হয়েছে, আর আমরা ৫০ লাখ টাকা দিতে বলেছি। এত কম দিয়েছেন কেন?”

জবাবে তাঁর আইনজীবী ওয়াজি উল্লাহ বলেন, “আমরা এক মাস সময় চেয়ে আবেদন করেছি। এর মধ্যে ভাগে ভাগে বাকি টাকা দেবো।”

তবে আদালতের নির্দেশ, “ভাগে ভাগে না, একসঙ্গে দিতে হবে।”

এক মাসের মধ্যে বাকি ৪৫ লাখ টাকা রাসেল সরকারকে দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। একইসঙ্গে রাসেলের ক্ষতিগ্রস্ত ডান পায়ের চিকিৎসা ও বাঁ পায়ে কৃত্রিম পা লাগানোর খরচ বহনের আদেশ দেয় আদালত।

এর আগে সকাল ১১টার দিকে গ্রিন লাইনের মালিক আলাউদ্দিন আদালতে হাজির হন। এ সময় তিনি তাঁর অসুস্থতার কথা জানালেও বিচারক দ্বয় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন।

আলাউদ্দিনকে বিকেল তিনটায় আবার আদালতে গিয়ে যতটুকু সম্ভব ক্ষতিপূরণ দিতে বলা হয়। এরই প্রেক্ষিতে চার ঘণ্টা পর পাঁচ লাখ টাকার ওই চেকটি দেওয়া হয় রাসেলকে।

“এ ক্ষেত্রে আদালত যা করেছে, দেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে তা একেবারেই নতুন ঘটনা,” বেনারকে বলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক ব্যারিস্টার আরাফাত হোসেন খান।

“ইতিপূর্বে খেলাপী ঋণ সংক্রান্ত অনেক মামলায় এভাবে পাওনা আদায়ের নজির থাকলেও ক্ষতিপূরণ আদায়ের রিটের ক্ষেত্রে এমনটা আগে কখনো হয়নি,” যোগ করেন তিনি।

আরাফাতের ধারণা, খেলাপী ঋণ আদায়ের কৌশলই ক্ষতিপূরণ আদায়ে প্রয়োগ করেছেন আদালত।

আদালতের আদেশের পর রাসেল সাংবাদিকদের বলেন, “আমি চাই, আদালতের দেওয়া সময়সীমার মধ্যে বাকি টাকা আমাকে দেওয়া হোক।”

গত বছরের ২৮ এপ্রিল ঢাকার মেয়র মোহাম্মদ হানিফ ফ্লাইওভারে কথা-কাটাকাটির জেরে গ্রিন লাইন পরিবহনের বাসচালক ক্ষিপ্ত হয়ে ২৩ বছর বয়সী প্রাইভেটকার চালক রাসেলের ওপর দিয়ে বাস চালিয়ে দিলে ঘটনাস্থলেই তাঁর বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

একই বছরের ১৪ মে রাসেলের জন্য ক্ষতিপূরণ চেয়ে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সরকার দলীয় সাবেক সাংসদ ও আইনজীবী উম্মে কুলসুম উচ্চ আদালতে রিট করেন। যার প্রেক্ষিতে গত ১২ মার্চ আদালত এক আদেশে দুই সপ্তাহের মধ্যে রাসেলকে ৫০ লাখ টাকা দিতে গ্রিন লাইন পরিবহন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেয়।

একই সঙ্গে প্রয়োজন হলে তাঁর ডান পায়ে অস্ত্রোপচার এবং কাটা পড়া বাঁ পায়ে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃত্রিম পা লাগানোর খরচ দিতে ওই পরিবহন কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এর অগ্রগতি হলফনামা আকারে ৩১ মার্চের মধ্যে আদালতে দাখিল করতেও বলা হয়।

হাই কোর্টের ১২ মার্চের আদেশের বিরুদ্ধে গ্রিন লাইন পরিবহন আপিল বিভাগে আবেদন করলে ৩১ মার্চ তা খারিজ হয়ে যায়। পাশাপাশি কোর্টের আদেশ ৩ এপ্রিলের মধ্যে বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে ৪ এপ্রিল শুনানির দিন নির্ধারণ করা হয়।

ধার্য তারিখে গ্রিন লাইন পরিবহনের মহাব্যবস্থাপক আদালতে হাজির হয়ে জানান, পরিবহনের মালিক চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে আছেন, ৯ এপ্রিল ফিরবেন।

এর প্রেক্ষিতে আদালত গ্রিন লাইনকে ১০ এপ্রিল আদেশ বাস্তবায়ন করে হলফনামা দিতে বলে। এর ধারাবাহিকতায় বুধবার সকালে আদালতে হাজির হন গ্রিন লাইন মালিক। রিট আবেদনকারীর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন শামসুল হক রেজা।

বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন

ব্যারিস্টার আরাফাত বলেন, “আদালতের মাধ্যমে ক্ষতিপূরণ আদায়ের বিষয়টি বাংলাদেশে নতুন। গত কিছুদিন যাবৎ মানুষ এভাবে ক্ষতিপূরণ পাচ্ছে। আগে এভাবে ক্ষতিপূরণ নেওয়ার ধারণাও এখানে ছিল না।”

এমন পরিস্থিতির জন্য নাগরিক দায় বা ‘টর্ট’ আইনের অভাবকে দায়ী করে তিনি জানান, ক্ষতিপূরণ চেয়ে দেশে প্রথম মামলা হয় ১৯৯১ সালে। সড়ক দুর্ঘটনায় ১৯৮৯ সালে নিহত সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশনা আরার দায়ের করা এ মামলার রায় চূড়ান্ত হয় ২৬ বছর পর, ২০১৫ সালে।

“আপিল বিভাগ মন্টুর পরিবারকে এক কোটি ৬৯ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে গাড়ির মালিক বা কোম্পানিকে নির্দেশ দিলেও তা এখনো পায়নি তারা। কারণ রায়ে কোনো সময় নির্ধারণ করা ছিল না। আর এই সুযোগটা নিয়েছে বিবাদী পক্ষ,” বলেন তিনি।

আইন, বিচার ও মানবাধিকারবিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন ল' রিপোর্টার্স ফোরামের (এলআরএফ) সদ্য সাবেক সভাপতি সাঈদ আহমেদ খান বেনারকে বলেন, “শুধু সাংবাদিক মন্টু নয়, তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী রাজীব হোসেন, চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ এবং সাংবাদিক মিশুক মুনিরের পরিবারকেও ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ এলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।”

“তবে সাম্প্রতিক সময়ে শিশু জিহাদ, লঞ্চ দুর্ঘটনায় আবু বকর ও রমিজউদ্দিন কলেজের ছাত্র রাজীব ও মিমের পরিবার ক্ষতিপূরণের টাকা পেয়েছে,” যোগ করেন তিনি।

বুধবার ক্ষতিপূরণ পাওয়া গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি গ্রামের শফিকুল ইসলামের সন্তান রাসেল সরকার ঢাকার আদাবরের সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করেন।

“গ্রিন লাইন কর্তৃপক্ষ কখনো যোগাযোগ করেনি, এমনকি আদালতে বসেও আমার সঙ্গে কথা বলেনি তাদের কেউ,” সাংবাদিকদের বলেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন