Follow us

চাঁদাবাজির মামলায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির নেতা গ্রেপ্তার

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2018-09-06
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে বৃহস্পতিবার আদালতে তোলা হয়। ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮।
বেনারনিউজ

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে চাঁদাবাজির মামলায় গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। দেশের সড়ক ও পরিবহন খাতের নৈরাজ্য নিয়ে কথা বলে থাকেন মোজাম্মেল, তাঁর সংগঠন নিয়মিত সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতদের তথ্য সংগ্রহ করে, যা দেশের গণমাধ্যমের কাছে এ–সংক্রান্ত তথ্যের অন্যতম উৎস।

ঢাকার মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দাদন ফকির বেনারকে জানান, “তিন দিন আগে দুলাল নামে পরিবহন খাতের একজন নেতা মোজাম্মেল হকের বিরুদ্ধে মামলা করেন। দুলালের দাবি, মোজাম্মেল হক তাঁর কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা চেয়েছেন, এর মধ্যে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। ওই মামলাতেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।”

তবে মানবাধিকার কর্মী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, “মোজাম্মেল হক যেহেতু সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করেন, সে জন্য কোনো না কোনো সংগঠনের তরফ থেকে অর্থাৎ পরিবহন মালিকদের পক্ষ থেকে এই মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এর সঙ্গে সরকারের কারও কারও ইন্ধন থাকতে পারে।"

“মামলার ধরন থেকে বোঝা যায়, আসলে তাঁকে ফাঁসানোই এই মামলার উদ্দেশ্য,” বেনারকে বলেন ওই আইনজীবী।

বুধবার রাতে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড়ের বাসা থেকে পুলিশ মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তার করে বলে বেনারকে জানান তাঁর ছেলে জিয়াউল হক চৌধুরী। গ্রেপ্তারের পর তাঁকে মিরপুর থানায় নেওয়া হয়।

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি নিজেদের ‘একটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী, যাত্রীকল্যাণমূলক সামাজিক সংগঠন’ হিসেবে বর্ণনা করে। সংগঠনটি পরিবহনে যাত্রীদের অধিকার এবং নিরাপত্তার সচেতনতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে। বিশেষ করে দুই ঈদে এবং বার্ষিক ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে তারা।

জিয়াউল হক বেনারকে বলেন, “আমার বাবা কখনই কারও কাছে চাঁদা দাবি করেননি। যাত্রী কল্যাণ সমিতির কার্যক্রম বন্ধ করতে এবং বাধাহীনভাবে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ পাস করতেই তাঁকে আটক করা হয়েছে।”

“উদ্দেশ্যমূলকভাবে যারা এই আইন করেছে তারা চায় একপক্ষই (পরিবহন মালিকপক্ষ) থাকুক। যাত্রীদের কোনো প্রতিনিধি না থাকুক। এ জন্যই মিথ্যা মামলায় মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে আটক করা হয়েছে,” বলেন তিনি।

জিয়াউল বলেন, “মামলার কপিতে মোজাম্মেল হক চৌধুরীর শুধু নামটাই আছে। কোনো ঠিকানা নেই, মোবাইল নম্বর নেই। তাহলে উনিই যে চাঁদা চেয়েছিলেন সেটার প্রমাণ পুলিশ পেল কীভাবে? এভাবে ভিত্তিহীন মামলা এবং প্রমাণ ছাড়া আটক দেশের জন্য লজ্জার।”

একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর

চাঁদাবাজির মামলায় যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হকের এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর হাকিম মাজহারুল হক এ আদেশ দেন বলে নিশ্চিত করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।

এর আগে বুধবার রাতে মিরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বজলুর রহমান মোজাম্মেল হককে গ্রেপ্তারের পর সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বেনারকে বলেন, “আমার কাছে মনে হয়েছে মোজাম্মেল হককে ব্যক্তিগতভাবে ফাঁসানোর জন্যই মামলাটি করা হয়েছে। এফআইআর এর কনটেন্ট দেখে বোঝা যায় এটা একটা মিথ্যা মামলা। তাঁর নামটা শুধু আছে। পিতার নাম, ঠিকানা কোনো কিছুই দেওয়া হয়নি। অথচ পুলিশ ঠিকই তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে এসেছে। মোজাম্মেল হক নামটি তো কমন। এটা তো অন্য কোনো মোজাম্মেলও হতে পারে।”

গ্রেপ্তারের জন্য এফআইআরে যথেষ্ট তথ্য থাকতে হবে। তিনি (মোজাম্মেল) থাকেন নারায়ণগঞ্জে। মিরপুর সনি সিনেমা হলের সামনে তিনি কেন চাদাবাজি করার জন্য যাবেন?

সর্বশেষ গত ৩১ আগস্ট ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, এবারের পবিত্র ঈদুল আজহার ১৩ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ২৫৯ জন নিহত ও ৯৬০ আহত হয়েছেন। পাশাপাশি সড়ক মহাসড়কে পরিবহন দুর্ঘটনা রোধ ও দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু কমিয়ে আনতে ১০ দফা সুপারিশ করেন তিনি। গত রোজার ঈদের পরও এই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ও আহতের তালিকা প্রকাশ করেন তাঁরা।

গত ১০ জুলাই সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে ভুয়া বলে মন্তব্য করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভুয়া একটা যাত্রী কল্যাণ সমিতি বাংলাদেশে আছে। যাদের কোনো নিবন্ধন নেই। সমাজের বিশিষ্টজনও ওই লোকটির সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন।

এর আগেও সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর ওবায়দুল কাদের মোজাম্মেল হকের সমালোচনা করে বক্তৃতা করেন।

আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, মোজাম্মেল হকের প্রতিষ্ঠান সড়কের বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত তুলে ধরেন। সচেতনতা বৃদ্ধি করেন। বলা যায় সরকারের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করেন। এই সমিতির তথ্য বিআরটিএ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় ব্যবহার করেছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান যত বেশি হবে তত রাষ্ট্রের ভার কমবে।”

এদিকে মোজাম্মেল হক চৌধুরীর গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

“দেশের যাত্রী সাধারণের প্রতিবাদের কণ্ঠকে বন্ধ” করার উদ্দেশ্যেই “একটি মিথ্যা মামলায়” গ্রেফতার করে মোজাম্মেল হককে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সামসুদ্দীন চৌধুরী।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন