Follow us

কাঠমান্ডুর বিমান দুর্ঘটনা: নেপাল ও বাংলাদেশের পরষ্পরবিরোধী বক্তব্য

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-01-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান দুর্ঘটনার পর নেপালি উদ্ধারকর্মীদের উদ্ধার তৎপরতা। ১২ মার্চ ২০১৮।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইনসের বিমান দুর্ঘটনার পর নেপালি উদ্ধারকর্মীদের উদ্ধার তৎপরতা। ১২ মার্চ ২০১৮।
[এপি]

শুধু পাইলটের ভুল নয়, কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র তাদের দায়িত্ব পালন করলে ইউ-এস বাংলা এয়ারলাইনসের বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ত না বলে মতামত দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

ওই দুর্ঘটনায় পাইলটসহ ৫১ যাত্রী প্রাণ হারান।

১২ মার্চ ২০১৮ তারিখে কাঠমান্ডুতে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার জন্য বিমানের নিহত পাইলট আবিদ সুলতানকে দায়ী করে রোববার নেপাল সরকার প্রতিবেদন প্রকাশ করার পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশে পক্ষের মতামত প্রকাশ করে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

সোমবার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পক্ষের মতামত তুলে ধরেন বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের বিমান দুর্ঘটনা তদন্ত শাখার প্রধান ক্যাপ্টেন সালাহ্উদ্দিন এম রহমতউল্লাহ।

তিনি বলেন, “বিমান দুর্ঘটনাকে কোনোভাবেই পার্সোনালাইজড করা যায় না। নেপালের তদন্ত প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে তা ঠিক আছে। তবে পাইলটকে এককভাবে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু এটিসির (এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল অথবা উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের) যে ত্রুটি ছিল এগুলো উঠে আসেনি।”

ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন বলেন, “পাইলট অবতরণ করতে অ্যাপ্রোচ মিস করেছিল। কিন্তু এটিসি পাইলটকে সহায়তা করতে পারত, কিন্তু তারা তা করতে পারেনি। বরং বিমানটি যখন এটিসি টাওয়ারের কাছ দিয়ে গিয়ে বিধ্বস্ত হয়, তখন এসিটি টাওয়ারের কর্মকর্তারা টেবিলের নিচে আশ্রয় নেন।”

তিনি বলেন, ইউএস-বাংলার বিমান দুর্ঘটনার ওপর তারা যে প্রতিবেদন তৈরি করেছে সেখানে নেপাল বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যে পাইলটের ভুল শোধরানোর জন্য কোনো প্রকার ব্যবস্থা নেয়নি সে বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে সংযোজন করতে হবে।

ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন বেনারকে বলেন, “তারা যদি ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ভুল ও দায়িত্ব অবহেলার বিষয়টি তদন্ত প্রতিবেদনে সংযোজন না করে, তবে আমরা এব্যাপারে আন্তর্জাতিক বেসামরিক চলাচল কর্তৃপক্ষের কাছে যাব।”

রোববার দুর্ঘটনার জন্য পাইলটকে একতরফাভাবে দায়ী করে নেপালের সংস্কৃতি, পর্যটন ও বেসামরিক বিমান মন্ত্রণালয়ের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের বিমান দুর্ঘটনা তদন্তে গঠিত নেপালের কারিগরি কমিটি।

নেপালের সংবাদ মাধ্যমে প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়, পাইলট আবিদ মানসিক চাপে ছিলেন, এবং তিনি ককপিটে ধূমপান করেছিলেন। তিনি বিমান নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের সঠিক আদেশ মানেননি।

ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন বলেন, “একজন পাইলট ভুল করতেই পারে। পাইলটের ভুল শোধরানোর জন্য উড়োজাহাজ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র রয়েছে। তারা সার্বক্ষণিক তদারকি করে। এ কাজের জন্য রাডার ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তারা পাইলটের ভুল শোধরানোর জন্য কোনো ভূমিকাই পালন করেনি। তারা দায়িত্ব পালন করলে এই দুর্ঘটনাটি ঠেকানো যেত।”

তিনি বলেন, “পাইলট মানসিক চাপে ছিলেন। এটা সত্য। এর কারণ হলো তার এক সহকর্মী তাঁকে ভালো ইনস্ট্রাক্টর নন বলেন মন্তব্য করেছিলেন। ওই সহকর্মী তখন উড়োজাহাজে ছিলেন না। ওই মন্তব্যে পাইলট আবিদ সুলতান একটু উত্তেজিত ছিলেন।”

ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন বলেন, “পাইলট ধূমপান করেছিলেন কখন? যখন বিমান অনেক ওপরে অটো মুডে চলছিল। ধূমপান এই দুর্ঘটনার জন্য কোনো কারণ নয়। এটা অপ্রাসঙ্গিক।”

তাঁর মতে, “নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র যদি তাদের দায়িত্ব পালন করত তাহলে এতগুলো মানুষ নিহত হতো না।”

গত বছর ১২ মার্চ ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বোমবার্ডিয়ার ড্যাশ-৮ কিউ-৪০০ মডেলের উড়োজাহাজটি নেপালে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়।

এই দুর্ঘটনায় ঘটনায় ২৮ বাংলাদেশি, ২২ নেপালি ও এক চীনা নাগরিকসহ ৫১ জন প্রাণ হারান।

সহকারী পাইলট পৃথুলা রশিদ নিহত হন। আহত পাইলট ক্যাপ্টেন আবিদ হাসপাতালে মারা যান।

ওই ঘটনা তদন্তে নেপাল সরকার সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে বলে জানান ক্যাপ্টেন সালাহউদ্দিন রহমতুল্লাহ। তিনি ওই কমিটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এসএম নাসিমুল হক বেনারকে বলেন, “আসলে পাইলট ও কন্ট্রোল টাওয়ার দুই দিকেই ভুল ছিল। পাইলট যখন দেখল অবতরণ করা ঝুঁকিপূর্ণ তখন সে উপরে উঠে গিয়ে টাওয়ারের সাথে পুনরায় যোগাযোগ করতে পারত। পরে টাওয়ারের নির্দেশ মোতাবেক অবতরণ করতে পারত।”

তিনি বলেন, “আবার কন্ট্রোল টাওয়ারেরও ভুল ছিল। তারা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তারা বলতে পারত ‘গো রাউন্ড (ওপরে উঠে যাও)’। তাহলে আর দুর্ঘটনাটি ঘটত না। কিন্তু সেটা করা হয়নি। কারণ, কন্ট্রোল টাওয়ারে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাটি ছিলেন একজন শিক্ষানবীশ। সিনিয়ররা বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।”

ক্যাপ্টেন নাসিম বলেন, “আসলে পাইলট ও টাওয়ার দুই দিকের হিউম্যান এররের কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে। তবে নেপাল পাইলটকে এককভাবে দায়ী করে পার পাবে না। কারণ এখন সবকিছু রেকর্ডে থাকে।”

সাবেক বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী কর্নেল ফারুক খান বেনারকে বলেন, “নেপালের অর্থনীতি পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর যে কয়েকটি বিমানবন্দর ঝুঁকিপূর্ণ বলে পরিচিত কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর তার একটি। ইউএস-বাংলা বিমান দুর্ঘটনার জন্য তাদের বিমানবন্দরের ব্যবস্থার ত্রুটির বিষয়টি সামনে আসলে কাঠমান্ডুতে বিমান পরিচালনা কমে আসতে পারে। পর্যটকের সংখ্যা কমে যেতে পারে।”

তিনি বলেন, “হয়তো তারা সে কারণেই পাইলটকে একতরফাভাবে দায়ী করছে। যে কেউ বুঝবে একক কারণে বিমান দুর্ঘটনা হয় না। সবারই কিছু ব্যর্থতা থাকে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন