Follow us

বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষতিপূরণ ছয় গুণ বৃদ্ধি

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2020-06-23
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান দুর্ঘটনার শিকার হবার পর বিধ্বস্ত বিমানের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। ওই দুর্ঘটনায় ৫১ জন যাত্রী নিহত হন। ১২ মার্চ ২০১৮।
কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান দুর্ঘটনার শিকার হবার পর বিধ্বস্ত বিমানের পাশে উদ্ধারকর্মীরা। ওই দুর্ঘটনায় ৫১ জন যাত্রী নিহত হন। ১২ মার্চ ২০১৮।
[এএফপি]

বিমান দুর্ঘটনায় কোনো যাত্রী আহত বা নিহত হলে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ প্রায় ছয় গুণ বৃদ্ধির প্রস্তাব করে মঙ্গলবার একটি বিল উত্থাপিত হয়েছে জাতীয় সংসদে।

‘আকাশপথে পরিবহন (মন্ট্রিল কনভেনশন) বিল-২০২০’ নামের এই প্রস্তাবিত আইনটিতে বিমান যাত্রাকালে ব্যক্তিগত মালামাল নষ্ট অথবা হারিয়ে গেলেও ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে একই পরিমাণ।

একইদিন বছরে একাধিকবার বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম পরিবর্তনের সুযোগ রেখে সংসদে উত্থাপন করা হয় ‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন সংশোধন আইন’।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলীর প্রস্তাবিত প্রথম বিলটি যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা করবে। আইনটি পাশ হলে মন্ট্রিল কনভেনশন-১৯৯৯ অনুযায়ী, বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে বাড়তি ক্ষতিপূরণের অর্থ পাবেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অথবা তাঁদের পরিবার।

তবে, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ উত্থাপিত বিদ্যুৎ-জ্বালানির দাম পরিবর্তন সংক্রান্ত বিলটি সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষায় তেমন ভূমিকা রাখতে পারবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কনজুমার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি গোলাম রহমান।

মঙ্গলবার স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংসদের কার্যক্রম শুরু হলে ওই দুটি বিল উত্থাপিত হয়। পরে বিস্তারিত আলোচনা ও সুপারিশের জন্য বিল দুটি সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়।

স্থায়ী কমিটি সুপারিশ করে সংসদে প্রতিবেদন পেশ করার পরই বিল দুটি পাশের জন্য সংসদে উত্থাপন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

কেন এই বিমান বিল?

আকাশপথে পরিবহন (মন্ট্রিল কনভেনশন) বিল-২০২০ এর উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী সংসদে বলেন, (মন্ট্রিল) কনভেনশনের আলোকে নতুন আইন না হওয়ায় কোনো দুর্ঘটনার জন্য বর্তমানে প্রচলিত আইনে প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খুবই কম এবং তা আদায়ের পদ্ধতি অষ্পষ্ট, সময়সাপেক্ষ ও জটিল।”

তিনি বলেন, “এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য জন্য আকাশে চলাচলকারী যাত্রীর অধিকার সুরক্ষা ও মালামাল পরিবহন সুনিশ্চিতকরণ, যাত্রীর মৃত্যুর কারণে পরিবারকে প্রদেয় ক্ষতিপূরণ প্রায় ছয়গুণ বৃদ্ধি এবং আদায় পদ্ধতি সহজ করতে আইনটি প্রয়োজন।”

উড়োজাহাজে পরিবহনের ক্ষেত্রে কোনো দুর্ঘটনায় যাত্রীর মৃত্যু বা আঘাতপ্রাপ্ত হলে এবং ব্যাগেজ নষ্ট বা হারানোর ক্ষেত্রে ওয়ারশ কনভেনশন-১৯২৯ এর আলোকে বর্তমানে বাংলাদেশে প্রচলিত “দ্য ক্যারেজ বাই এয়ার অ্যাক্ট-১৯৩৪”, “দ্য ক্যারেজ বাই এয়ার (ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন) অ্যাক্ট-১৯৬৬” এবং “দ্য ক্যারেজ বাই এয়ার (সাপ্লিমেন্টারি কনভেনশন) অ্যাক্ট-১৯৬৮” কার্যকর।

এই তিন আইনের আলোকে প্রাণহানি, আঘাত ও ব্যাগেজ নষ্ট বা হারানোর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ খুবই কম।

ক্ষতিপূরণের পরিমাণ বাড়াতে আন্তর্জাতিকভাবে ১৯৯৯ সালে মন্ট্রিল কনভেনশন গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ওই কনভেনশনে ১৯৯৯ সালেই স্বাক্ষর করে। তবে বাংলাদেশে তা অনুসমর্থিত হয়নি।

মন্ট্রিল কনভেনশনটির অনুসমর্থনে প্রস্তাবিত আইনটি পাশ হলে মৃত্যু, আঘাত ও মালামাল হারানো বা নষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ ক্ষতিপূরণ পাওয়া সহজ হবে।

ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স’র মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “আজকে সংসদে যে আইনটি পেশ করা হয়েছে সেটি নিয়ে আমরা অনেকদিন থেকে কাজ করছি।”

তিনি বলেন, “এই আইনটি পাশ হলে মন্ট্রিল কনভেনশন অনুযায়ী দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বাড়তি ক্ষতিপূরণের অর্থ পাবেন। কাঠমাণ্ডু দুর্ঘটনার আগে আইনটি পাশ হলে আমাদের কাজ আরও সহজ হতো। আসলে এই আইনটি যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা করবে।”

কামরুল ইসলাম আরও বলেন, “বিমান দুর্ঘটনায় ক্ষতির অর্থ দেয় মূলত বীমা কোম্পানিগুলো। কাঠমাণ্ডু দুর্ঘটনায় আমরা প্রতিটি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ৫০ হাজার ডলার দেয়ার ব্যবস্থা করেছি।”

২০১৮ সালের মার্চ মাসে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিধ্বস্ত হলে ৫১ যাত্রী নিহত হন।

কামরুল ইসলাম বলেন, নেপাল কর্তৃপক্ষ বিমান দুর্ঘটনার জন্য পাইলটকে দায়ী করে। তবে বিমান পরিচালনার ব্যাপারে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে কোনো প্রকার দোষারোপ করা হয়নি।

তিনি বলেন, মূলত এই দুর্ঘটনার পর পরই মন্ট্রিল কনভেনশন অনুযায়ী আইন পাশের কাজ শুরু হয়।

নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স বিমান দুর্ঘটনায় স্বামী ও একমাত্র পুত্র সন্তানসহ মারা গেছেন ঢাকার একটি বেসরকারি সংস্থার জনসংযোগ বিভাগে কর্মরত সানজিদা হক বিপাশা। তাঁর ভাই শাহনেওয়াজ সাবির বিলটি দেরিতে হলেও পাশ করার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

মঙ্গলবার শাহনেওয়াজ বেনারকে বলেন, “আমাদের পরিবারকে প্রত্যেক মৃত ব্যক্তির জন্য প্রায় ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ পেতে অধিকাংশ পরিবারের কমপক্ষে ছয় মাস লেগেছে। আমাদের লেগেছে দুই বছর।”

তিনি বলেন, “যিনি মারা যান, তাঁকে তো আর পাওয়া যায় না। কিন্তু তাঁর পরিবারে যাঁরা বেঁচে থাকেন তাঁরা ক্ষতিপূরণ হিসাবে যে অর্থ পেয়ে থাকেন তা দিয়ে যেন তাঁরা কিছুটা আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যে থাকতে পারেন।”

শাহনেওয়াজ বলেন, “নেপালের দুর্ঘটনায় অনেকে তাঁদের পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা যে পরিমাণ অর্থ পেয়েছেন তা দিয়ে খুব ভালোভাবে চলা সম্ভব নয়।”

তাঁর মতে, “যদি নেপালের দুর্ঘটনার আগে সরকার আইনটি পাশ করত তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো আরও স্বচ্ছলভাবে চলার মতো ক্ষতিপূরণ পেত। তবে, দেরিতে হলেও যে সরকার আইনটি পাশ করছে সেজন্য সরকারকে ধন্যবাদ।”

বছরে একাধিকবার বাড়বে জ্বালানির দাম

বাংলাদেশে তেল, গ্যাস এবং বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে বাংলাদেশে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন অনুযায়ী, বছরে একবার দাম বৃদ্ধি করতে পারে কমিশন।

ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি গোলাম রহমান বেনারকে বলেন, “আজকে সংসদে যে আইন সংশোধনের জন্য পেশ করা হয়েছে, সেটির একটি ব্যাকগ্রাউণ্ড আছে। গত বছর বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন আইন ভঙ্গ করে বছরে দুবার জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করে। অথচ আইন অনুযায়ী, বছরে একবারের বেশি বাড়াতে পারে না।”

তিনি বলেন, “আমরা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রিট করলে আদালত এই সিদ্ধান্তকে অবৈধ বলে ঘোষণা করে। সে কারণে হয়তো সরকার এইবার আঁটঘাট বেঁধে নেমেছে। এই আইন সংশোধনের মানে হলো, সরকার হয়তো জ্বালানির দাম অচিরেই বৃদ্ধি করবে এবং বছরে একাধিকবার করবে।”

গোলাম রহমান বলেন, “এখন সারাবিশ্বে জ্বালানির দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এই সময়ে দাম বৃদ্ধি করা কোনোক্রমেই সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সবকিছুর দাম বেড়ে যাবে। মানুষের অর্থনৈতিক কষ্ট বাড়বে।”

তিনি বলেন, “এই আইনটির একটি বড় দুর্বলতা হলো, এখানে শুধু এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। তবে এই আইন সংশোধনের জন্য একটি বিধান থাকা উচিত। কমিশনের কোনো সিদ্ধান্তে কোনো সংগঠনের আপত্তি থাকলে সেই সিদ্ধান্ত পুনরায় বিবেচনার জন্য আবেদন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন