Follow us

আদালতের নির্দেশনা: নারীর জবানবন্দি নারী হাকিমই নেবেন

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-04-16
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচার চেয়ে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মানববন্ধনে বক্তব্য রাখছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। ১৬ এপ্রিল ২০১৯।
যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করে হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত হত্যার বিচার চেয়ে ঢাকার শাহবাগ এলাকায় জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মানববন্ধনে বক্তব্য রাখছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। ১৬ এপ্রিল ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুর জবানবন্দি নেওয়ার দায়িত্ব কেবল নারী ম্যাজিস্ট্রেটকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের স্বার্থে মঙ্গলবার এ সার্কুলার জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসন।

প্রধান বিচারপতির নির্দেশে চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ও চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেটদের প্রতি সোমবার এ নির্দেশনা পাঠানো হয়।

“দেশের সকল মুখ্য বিচারিক হাকিম বা মুখ্য মহানগর হাকিমকদের ওই নির্দেশনা অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। দেশের সকল জেলা ও দায়রা জজ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের ওই সার্কুলার পাঠানো হয়েছে,” বেনারকে জানান সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র ও স্পেশাল অফিসার মো. সাইফুর রহমান।

“প্রথমে সুপ্রিম কোর্টের ‘স্পেশাল কমিটি ফর জুডিশিয়াল রিফর্মস’র সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেটি মাননীয় প্রধান বিচারপতির কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি তা অনুমোদন করেন,” বলেন তিনি।

বিচার বিভাগকে শক্তিশালী এবং বিচারিক সমস্যা দূর করতে ২০১০ সালে ইউএনডিপি’র সহযোগিতায় গঠিত হয় ‘স্পেশাল কমিটি ফর জুডিশিয়াল রিফর্মস।’ এই কমিটি সুপ্রিম কোর্টের কাছে বিভিন্ন পর্যালোচনা এবং পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে।

সুপ্রিম কোর্টের এ নির্দেশনাকে ইতিবাচক মনে করছে দীর্ঘ দিন ধরে এমন দাবি জানিয়ে আসা মানবাধিকার সংগঠনগুলো।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বেনারকে বলেন, “বিষয়টি আইনে থাকলেও এতদিন হয়নি। এখন হয়েছে, এটা খুব ভালো লক্ষ্মণ।”

“একজন মহিলার কাছে একজন মহিলা যতটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবেন, যেভাবে তাঁর কথাগুলো বলতে পারবেন তা একজন পুরুষের কাছে পারবেন না। আশা করছি যে নারী শুনবেন তিনিও সংবেদনশীল হিসেবেই শুনবেন।”

পুরুষের কাছে বর্ণনা করতে সংকোচবোধ হওয়ায় নারী ভিকটিমদের অনেক কথা না বলা থেকে যায় বলেও মনে করেন এলিনা খান।

সর্বোচ্চ আদালতের এই সিদ্ধান্তকে বিরাট পদক্ষেপ বলে মনে করেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সাবেক নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী।

এই মানবাধিকারকর্মী বেনারকে বলেন, “ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের মতো স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগীর ফরেনসিক পরীক্ষা ও তদন্তসহ আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে নারী প্রতিনিধির উপস্থিতি নিশ্চিত করার খুবই জরুরি। কারণ, অভিযোগ করতে গিয়ে প্রতিটা পদে আবারও নিপীড়নের শিকার হয় নারীরা।”

“এখন সুপ্রিম কোর্টের এই আদেশ শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে,” বলেন সালমা আলী।

সুপ্রিম কোর্টের সার্কুলারে বলা হয়, বর্তমানে বেশ কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুদের জবানবন্দি পুরুষ ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক নেওয়ার বিষয়টি ‘স্পেশাল কমিটি ফর জুডিশিয়াল রিফর্মস’ জানতে পেরেছে।

এতে বলা হয়, “একজন পুরুষ ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট নারী বা শিশু ভিক্টিম ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের বর্ণনা দিতে সংকোচ বোধ করে। ফলে এরূপ নির্যাতনের শিকার শিশু বা নারী ঘটনার প্রকৃত বিবরণ দিতে অনেক সময় ইতস্তত বোধ করে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার নারী বা শিশুদের জবানবন্দি একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক লিপিবদ্ধ করা আবশ্যক।”

সংশ্লিষ্ট জেলায় বা মহানগরীতে নারী ম্যাজিস্ট্রেট না থাকলে অন্য কোনো যোগ্য ম্যাজিস্ট্রেটকে এ দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে বলেও সার্কুলারে বলা হয়।

সর্বোচ্চ আদালতের এ নির্দেশনা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা দেখা দিলে তা আদালতের নজরে আনার অনুরোধ করা হয়েছে।

সম্প্রতি যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদ করে প্রাণ দেওয়া ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দি নিয়ে ওসির বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ এবং তাঁর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হওয়ার পরে দেশের সর্বোচ্চ আদালত থেকে এই নির্দেশনা এলো।

তবে কারো জবানবন্দি নেবার এখতিয়ার পুলিশের নেই বলে জানান এলিনা খান।

তিনি বলেন, “পুলিশ কারো জবানবন্দি নিতে পারে না। তারা অভিযোগ নেবে। তদন্তের প্রয়োজনে অভিযোগকারীর বয়ান শুনবে। সেটা কোনোভাবেই জবানবন্দি নয়।”

একারণে ফেনীর নুসরাতের ক্ষেত্রে ওসি যে জবানবন্দি নিয়েছেন সেটা বেআইনি বলে জানান তিনি।

এর আগে বিভিন্ন সংগঠনের করা মামলায় ধর্ষণের শিকার ক্ষতিগ্রস্তের মেডিকেল পরীক্ষায় ‘টু ফিঙ্গার’ পদ্ধতি অবৈজ্ঞানিক অভিহিত করে তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। ২০১৮ সালের ১২ এপ্রিল দেওয়া রায়ে কয়েকদফা নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন