Follow us

নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা আটক

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2019-04-19
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় নারী সংহতির সমাবেশ। ১২ এপ্রিল ২০১৯।
নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে ঢাকায় নারী সংহতির সমাবেশ। ১২ এপ্রিল ২০১৯।
[এএফপি]

ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনকে। তবে গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দিতে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে নাম এলেও শুক্রবার রাত পর্যন্ত গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি তাঁকে।

আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাতকে গত ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার ভেতরে হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। পাঁচদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ১০ এপ্রিল রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায় সে। এ ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় এখন পর্যন্ত ১৮ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। এ মামলার তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।

রুহুল আমিনের আটক প্রসঙ্গে পিবিআইএর ডিজি বনজকুমার মজুমদার বেনারকে বলেন, “আমরা রুহুল আমিনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নিয়েছি। নুসরাত হত্যায় সম্পৃক্ততার ব্যাপারে নিশ্চিত হলে আমরা তাঁকে কাল (শনিবার) গ্রেপ্তার দেখাব।”

এদিকে স্থানীয় পুলিশ ও পিবিআই’র পর এ মামলার তদন্তে যুক্ত হয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির বিশেষ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম এ তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

“নুসরাতের প্রতি দু ধরনের অপরাধ ঘটেছে-শ্লীলতাহানি ও হত্যা। এ ঘটনায় টাকা-পয়সার লেনদেন হয়ে থাকতে পারে। সেদিকটা আমরা খতিয়ে দেখব,” মোল্যা নজরুল ইসলাম বেনারনিউজকে বলেন। তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় সন্দেহভাজন খুনি, স্থানীয় সাংবাদিক ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সিআইডি জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

এদিকে নুসরাত জাহানকে পুড়িয়ে হত্যায় জড়িত থাকার দায়ে গ্রেপ্তার কামরুন্নাহার মণিকে নিয়ে শুক্রবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পিবিআই। তাছাড়া যে দোকান থেকে বোরকা কেনা হয়েছিল, সে দোকানেও তাকে নিয়ে যাওয়া হয়। মণি এই মুহূর্তে রিমান্ডে আছেন।

রিমান্ডে থাকা দুই আসামি জাবেদ হোসেন ও উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পাকে গতকাল ফেনীর জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম শরাফ উদ্দিন আহমেদের আদালতে উপস্থিত করা হয়।

পাঁচ আসামির জবানবন্দি

নুসরাত হত্যার ঘটনায় শুক্রবার পর্যন্ত মোট পাঁচ আসামি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সর্বশেষ শুক্রবার উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন পিবিআইর কর্মকর্তা মইন উদ্দিন।

মইন উদ্দিন জানান, শম্পা স্বীকার করেছেন, তিনি হত্যাকাণ্ডের আগে নুসরাতকে সাইক্লোন সেন্টারে ডেকে আনেন। ওখানেই নুসরাতের গায়ে আগুন ধরানো হয়।

তবে শম্পার জবানবন্দি সম্পর্কে এর বেশি কিছু বলতে রাজি হননি মইন উদ্দিন।

এর আগে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন সোনাগাজী ইসলামিয়া মাদ্রাসার হেফজ বিভাগের শিক্ষক আবদুল কাদের। ঢাকার কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে সম্মত হন।

পিবিআই চট্টগ্রামের বিশেষ পুলিশ সুপার মো ইকবাল সাংবাদিকদের জানান আবদুল কাদেরের সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে।

“আবদুল কাদের শুধু এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারীই নন, তিনি নিজে হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন,” মো. ইকবাল বলেন।

আদালত সূত্র জানায়, স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আবদুল কাদের বলেছেন, তাঁর শোয়ার ঘরে বসেই নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা হয়। এর আগে ২৮ ও ৩০ মার্চ তিনি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যান। সে সময় অধ্যক্ষ তাঁদেরকে তাঁর মুক্তির দাবিতে আন্দোলনের পরামর্শ দেন। সে অনুযায়ী ৪ এপ্রিল সকালের দিকে মাদ্রাসায় তিনি যে কক্ষে ঘুমান সেখানে ‘অধ্যক্ষ সাহেব মুক্তি পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই রাতেই আবার তাঁরা বৈঠক করেন। চূড়ান্ত ওই বৈঠকে হাজির ছিলেন ১২ জন। সেখানে দায়িত্ব বন্টন করে দেওয়া হয়।

আবদুল কাদেরের ভাষ্য মতে, ৬ এপ্রিল পরীক্ষার আগে তিনি নিজে, নুর উদ্দীন, রানা ও আবদুর রহিম ওরফে শরীফ ও ইমরান মাদ্রাসা ফটকে অবস্থান নেন। হত্যার চূড়ান্ত পর্বে যুক্ত ছিল পাঁচজন। উম্মে সুলতানা পপি ওরফে শম্পা নুসরাতকে সাইক্লোন সেন্টারে ডেকে আনেন। সেখানে পৌঁছানোর পর নুসরাতের হাত-পা বেঁধে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন শাহাদৎ হোসেন ওরফে শামীম, জোবায়ের আহমেদ, জাবেদ হোসেন, কামরুন্নাহার ওরফে মণি ও উম্মে সুলতানা ওরফে পপি।

এর আগে এই হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে নুর উদ্দীন, শাহাদৎ ওরফে শামীম ও আবদুর রহিম ওরফে শরিফ জবানবন্দি দেন। তাঁদের জবানবন্দিতে গতকাল বিকেলে আটক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিনের নাম এসেছে। তাঁরা বলেছেন, থানা (পুলিশ) কে ‘ম্যানেজ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই রুহুল আমিন। পুড়িয়ে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তাঁদের সঙ্গে রুহুল আমিনের কথা হয় বলেও উল্লেখ করেছেন তাঁরা।

পুলিশের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে

নুসরাত জাহান রাফি শ্লীলতাহানির অভিযোগ করার পর থেকে হত্যার শিকার হওয়ার পূর্বাপর সব ঘটনাই পুলিশ সদরদপ্তর খতিয়ে দেখছে। এ ঘটনায় পুলিশের দায়-দায়িত্ব নিরূপণে সদরদপ্তর একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটির প্রধান উপমহাপরিদর্শক রুহুল আমিন।

“পাঁচ সদস্যের কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে পুলিশের দায়দায়িত্ব নিরূপণ করবে। প্রতিবেদন চূড়ান্ত হতে আর চার/পাঁচদিন সময় লাগতে পারে,” রুহুল আমিন বেনারনিউজকে বলেন।

নুসরাত জাহান শ্লীলতাহানির শিকার হয়ে যখন থানায় যান, তখন সোনাগাজী থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো মোয়াজ্জেম হোসেন তাঁর ভিডিও ধারণ করেন। মামলার এজাহার দায়েরের ক্ষেত্রেও তিনি অসহযোগিতামূলক আচরণ করেন বলে পরিবারের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়।

পুলিশের পাশাপাশি প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। মাদ্রাসাটির পরিচালনা পরিষদের সভাপতি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল কবীর। শ্লীলতাহানির মামলা দায়েরের পর পরিবারটি তাঁর সঙ্গে দেখা করে সহযোগিতা চায়। এরপর কী হলো তাও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে তদন্তসূত্রগুলো বলছে।

গতকালই মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কী কারণে ভেঙে দেওয়া হলো তার কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি প্রশাসন থেকে।

কোনো উকিল লড়বেন না সিরাজের পক্ষে

এদিকে ফেনীর কোনো আইনজীবি অধ্যক্ষ সিরাজকে আইনি সহায়তা দেবেন না বলে বেনারকে জানিয়েছেন জেলার পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হাফেজ আহমেদ।

তিনি বেনারকে বলেন, “ফেনীর বার অ্যাসোসিয়েশেন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, কোনো আইনজীবীই সিরাজ উদ দৌলার পক্ষে দাঁড়াবেন না।”

এই পরিস্থিতিতে বিচার শুরু হলে সিরাজ উদ দৌলার জন্য সরকার আইনজীবী নিয়োগ করবে বলে জানান পিপি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন