Follow us

নুসরাত হত্যা মামলা: অভিযোগপত্র চূড়ান্ত, আসামি ১৬

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-05-28
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
নুসরাত হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে কয়েকটি সংগঠনের মানববন্ধন। ১২ এপ্রিল ২০১৯।
নুসরাত হত্যার বিচারের দাবিতে ঢাকায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের সামনে কয়েকটি সংগঠনের মানববন্ধন। ১২ এপ্রিল ২০১৯।
[নিউজরুম ফটো]

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র চূড়ান্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ওই ঘটনায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে ‘হত্যার হুকুমদাতা’ হিসেবে আসামি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার ঢাকায় পিবিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান সংস্থাটির প্রধান (ডিআইজি) বনজ কুমার মজুমদার। বুধবার আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়ে সকল আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি চাওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মাত্র ৪৮ দিনের মাথায় আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগপত্র আদালতে জমা হতে যাচ্ছে। বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দ্রুত এসব অপরাধীর বিচার দেখতে চান তাঁরা।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বেনারকে বলেন, “নুসরাত হত্যা মামলাটি একটি স্পর্শকাতর মামলা। এমন অনেক স্পর্শকাতর মামলার মতো সব ধরনের সাক্ষ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও চাপা পড়ে না থেকে বেশ দ্রুততম সময়ে অভিযোগপত্র তৈরি হয়েছে। এটি বেশ ইতিবাচক।”

“তবে এতে উচ্ছ্বসিত বলব না। বলা যায়, আইন অনুযায়ী এ মামলাটির অগ্রগতি হচ্ছে। এটা খুব ভালো। এভাবেই আইনের বিধান অনুযায়ী যথার্থ সময়ে মামলাটির কার্যক্রম যেন শেষ হয় এবং দোষীরা উপযুক্ত সাজা পায়,” বলেন তিনি।

অল্প সময়ে অভিযোগপত্র চূড়ান্ত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবারও।

মামলার বাদী নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বেনারকে বলেন, “এত দ্রুত অভিযোগপত্র চূড়ান্ত হবে ভাবতে পারিনি। এখন দ্রুততম সময়ে আমার বোনের হত্যার বিচার হবে এটাই চাওয়া।”

মামলাটিকে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং পিবিআইকে ধন্যবাদ জানান নোমান।

উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের মামলা করেন। সেই মামলা তুলে না নেওয়ায় গত ৬ এপ্রিল তাঁর অনুগত লোকজন হাত-পা বেঁধে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেদিন নুসরাত ফাজিল পরীক্ষা দিতে ওই কলেজ কেন্দ্রে গিয়েছিলেন।

অ্যাম্বুলেন্সে করে শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়া নুসরাতকে ফেনী থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে আনা হয়। দু’দিন লাইফ সাপোর্টে থেকে ১০ এপ্রিল মারা যান তিনি।

এর আগে ৮ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজকে প্রধান আসামি করে একটি মামলা করেছিলেন নুসরাতের ভাই নোমান। নুসরাতের মৃত্যুর পর সেটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। দেশজুড়ে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের মধ্যে মামলার তদন্তভার পিবিআইয়কে দেওয়া হয়।

নুসরাত জাহান রাফি। ফাইল ছবি। [বেনার নিউজ]
নুসরাত জাহান রাফি। ফাইল ছবি। [বেনার নিউজ]
আসামি যারা

সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই জানায়, নুসরাতকে পুড়িয়ে মারায় সরাসরি অংশ নেওয়া পাঁচজনের পাশাপাশি এই হত্যাকাণ্ডের সাথে বিভিন্নভাবে যারা জড়িত ছিলেন, তাঁদের আসামি করা হয়েছে। মোট আসামির সংখ্যা ১৬।

এরা হলেন- এসএম সিরাজ উদদৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), মাকসুদ আলম কাউন্সিলর (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), মোহাম্মদ শামীম (২০), রুহুল আমিন (৫৫), ও মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

এদের মধ্যে রুহুল আমীন ও মাকসুদ আলম স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা।

অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা কারাগারে থেকেই নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছিলেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। এ জন্য তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।

নুসরাতকে হত্যায় সরাসরি অংশ নেয় তার তিন সহপাঠী কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ও জাবেদ হোসেন এবং তাঁদের সাথে শাহাদাত হোসেন ও জোবায়ের আহমেদ নামে আরো দুজন।

পিবিআই জানায়, আসামিরা চারটি গ্রুপে ভাগ হয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে তাঁকে পুড়িয়েছে। নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার পর পরীক্ষার হলে ঢুকে আলিম পরীক্ষাও দিয়েছে তাঁর তিন সহপাঠী।

ওসির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা

এদিকে নুসরাতকে বেআইনিভাবে জেরা করে তার ভিডিও প্রচারের অভিযোগে সোনাগাজী থানার সাবেক ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন আদালত।

সোমবার ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মাদ আসসামস জগলুল হোসেন এই আদেশ দেন।

এ ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি নজরুল ইসলাম শামীম বেনারকে বলেন, মোয়াজ্জেম হোসেনের (ওসি) বিরুদ্ধে পিবিআইয়ের দেওয়া অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। আগামী ১৭ জুনের মধ্যে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

পিবিআইয়ের তদন্তে বলা হয়, থানায় অভিযোগ করতে গেলে কীভাবে নুসরাত অধ্যক্ষের হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছিলেন, তার বিবরণ নিজের মুঠোফোনে রেকর্ড করে তা প্রচার করেছিলেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। এসময় বিপর্যস্ত নুসরাতকে বারবার বিব্রতকর প্রশ্ন করেছিলেন ওসি।

অভিযোগপত্রে পিবিআই জানায়, ওসি হিসেবে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থেকেও মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়মবহির্ভূতভাবে নুসরাতের বক্তব্যের ভিডিও ধারণ ও প্রচার করে দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের তিনটি ধারায় তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলছিলেন, “একজন আইনজীবীর করা মামলায় ওসির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। এটি ভালো অগ্রগতি। তবে আমরা আরও খুশি হতাম যদি রাষ্ট্র সরাসরি ওই ওসিকে দোষী সাব্যস্ত করত।”

নুসরাত মারা যাওয়ার পরদিন ১১ এপ্রিল ফেসবুকে ওসির ধারণ করা ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিও ধারণের জন্য তাঁর বিরুদ্ধে গত ১৫ এপ্রিল ডিজিটাল আইনে মামলা করেন সৈয়দ সায়েদুল হক নামে একজন আইনজীবী।

আঁকা ছবিতে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর দৃশ্য। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই এ ধরনের চিত্র দিয়ে নুসরাত হত্যার বর্ণনা তুলে ধরে। [সৌজন্যে: পিবিআই]
আঁকা ছবিতে নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর দৃশ্য। মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে পিবিআই এ ধরনের চিত্র দিয়ে নুসরাত হত্যার বর্ণনা তুলে ধরে। [সৌজন্যে: পিবিআই]

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন