Follow us

নুসরাতের ভিডিও ধারণ ও প্রচার: ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-06-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
গ্রেপ্তারের পর ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। ১৭ জুন ২০১৯।
গ্রেপ্তারের পর ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেনকে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। ১৭ জুন ২০১৯।
[বেনারনিউজ]

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন। মর্মান্তিক নির্যাতনে নিহত মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির অসহায়ত্বের ভিডিও ধারণ ও তা প্রচার করার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় এই পুলিশ কর্মকর্তাকে সোমবার কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত ২৭ মে ঢাকার সাইবার ট্রাইব্যুনালের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির পর ২০ দিন পালিয়ে ছিলেন তিনি। হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলে রোববার আদালত প্রাঙ্গণের বাইরে থেকে মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করে শাহবাগ পুলিশ।

সোমবার দুপুরে তাঁকে ঢাকার সাইবার আদালতে হাজির করা হয়। পরে জামিন আবেদন নাকচ করে মোয়াজ্জেম হোসেনকে কারাগারে পাঠান বিচারক মোহাম্মাদ আস সামছ জগলুল।

একইসাথে আগামী ৩০ জুন তাঁর বিরুদ্ধে আদালত চার্জ গঠনের তারিখ নির্ধারণ করেছে বলে বেনারকে জানিয়েছেন সাইবার ট্রাইব্যুনালের পেশকার শামীম আল মামুন। আগামী ২০ জুন ফেনীর আদালতে রাফি হত্যা মামলার চার্জ গঠনের কথা রয়েছে।

শামীম আল মামুন বলেন, “ওসি মোয়াজ্জেম যৌন নির্যাতনের শিকার নুসরাত জাহান রাফির অসহায়ত্বের বিবরণ নিজের মোবইল ফোনে ভিডিও করে অনলাইনে প্রচার করে ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ভঙ্গ করেছেন এবং তাকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করেছেন।”

তিনি বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬, ২৯ এবং ৩১ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর সর্বোচ্চ সাত বছরের জেল ও জরিমানা হতে পারে।

ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করায় আনন্দিত নিহত রাফির পরিবার।

রাফির ভাই আব্দুল্লাহ আল নোমান বেনারকে বলেন, “ওসি মোয়াজ্জেম কারাগারে যাওয়ায় আমরা আনন্দিত।”

তিনি বলেন, “তাঁর গ্রেপ্তার প্রমাণ করে যে, আইন সবার জন্য সমান। আমরা চাই তাঁর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। তাঁর শাস্তি হলে একটি উদাহরণ সৃষ্টি হবে যে, আইন ভঙ্গ করলে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়, তিনি যেই হোন না কেন।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নোমান বলেন, “ওনার হস্তক্ষেপের কারণে ওসি মোয়াজ্জেম গ্রেপ্তার হয়েছেন।”

তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বেনারকে বলেন, “ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেপ্তার করার জন্য আমি সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। তবে গ্রেপ্তারই সব কথা নয়।”

তিনি বলেন, “তাঁর বিচার করতে হবে। আর বিচার করতে হবে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে।”

রাশেদা চৌধুরী বলেন, “নির্যাতনের শিকার হয়ে ওসির কাছে গিয়েছিলেন রাফি। কিন্তু তাঁকে রক্ষা না করে একজন অসহায় মেয়ের অসহায়ত্ব ভিডিও করে ইচ্ছাকৃতভাবে তা ছেড়ে দেয়া একটি গর্হিত কাজ। আইনের লঙ্ঘন।”

সমালোচনার মুখে গ্রেপ্তার

ফেনীর সোনাগাজী সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলার হাতে যৌন হয়রানির শিকার হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেমের কাছে অভিযোগ করতে যান ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি।

মানসিকভাবে বিপর্যস্ত রাফিকে রক্ষা করার পরিবর্তে তাকে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে থাকতে বলেন মোয়াজ্জেম। এরপর তিনি নিজ মোবাইলে রাফির কান্না এবং তার সাথে কথোপকথন ভিডিও করেন। পরে ভিডিও অনলাইনে ছেড়ে দেন ওসি মোয়াজ্জেম।

পরদিন রাফির মা যৌন নির্যাতনের মামলা করেন সিরাজ উদ দৌলার বিরুদ্ধে। পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে।

তবে অধ্যক্ষের লোকেরা মামলা তুলে নেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। রাফি মামলা তুলে নিতে অস্বীকৃতি জানালে ৬ এপ্রিল সিরাজ উদ দৌলার লোকেরা রাফিকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরে দেয়।

রাফি ছাদ থেকে পালিয়ে আসেন। তবে আগুনে তার শরীরের শতকরা ৮০ ভাগ অংশ পুড়ে যায়। তার অবস্থার অবনতি হলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়। দুদিন পর ১০ এপ্রিল সেখানে মারা যায় রাফি।

রাফি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই)। গত ২৮ মে ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পিবিআই।

নুসরাতের মৃত্যুর পর ওসি মোয়াজ্জেমকে প্রথমে সোনাগাজী থানা থেকে প্রত্যাহার করে রংপুর রেঞ্জে পাঠান হয়। পরে তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় পুলিশ বাহিনী থেকে।

ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ভিডিও প্রচারের দায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ২৭ মে তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে ঢাকার সাইবার আদালত।

কিন্তু তাঁকে গ্রেপ্তার করা নিয়ে ফেনী ও রংপুর পুলিশের মধ্যে বেশ কয়েক দিন ধরে ঠেলাঠেলি চলতে থাকে। এরপর থেকে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না বলে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তারের দাবি ওঠে।

ওসি মোয়াজ্জেমকে নিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবৃতি দেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ওসি মোয়াজ্জেম যাতে পালিয়ে যেতে না পারেন সে জন্য পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এরই মধ্যে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিনের আবেদন করেন ওসি মোয়াজ্জেম। আদালত তাঁর জামিন আবেদনের শুনানি করেনি।

আদালত সূত্র জানায়, রোববার নতুন করে নিয়মিত বেঞ্চে শুনানির জন্য আবেদন করে ফেরার পথে ওসি মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন