Follow us

সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেপ্তার প্রশ্নে ছাড় দিয়ে নতুন আইন

জেসমিন পাপড়ি
ঢাকা
2019-09-30
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ জানুয়ারি ২০১৯।
চতুর্থ মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ১৭ জানুয়ারি ২০১৯।
[সৌজন্যে: জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়]

এখন থেকে ফৌজদারি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেপ্তার করতে সরকার বা নিয়োগ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিতে হবে। সরকারি দায়িত্ব পালন সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলায় এই নিয়ম প্রযোজ্য হবে। মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া সরকারি চাকরি আইনে নতুন এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

অথচ একই অপরাধে যেকোনো সাধারণ মানুষ থেকে জনপ্রতিনিধি পর্যন্ত সকলকে গ্রেপ্তার করতে পারবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

সরকার বলছে, প্রশাসনের কাজে গতি আনাই সরকারি চাকরি আইনের উদ্দেশ্য। তবে আইনজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, আইনটি সংবিধান পরিপন্থী এবং বৈষম্যমূলক।

এমনকি আইনটি কার্যকর হওয়ার পরপরই আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)। সংগঠনটির আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বেনারকে বলেন, “আমরা মনে করছি আইনটি বৈষম্যমূলক।”

“সংবিধানে বলা আছে যেকোনো আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু এই আইনে সরকারি কর্মচারীদের অভিযোগপত্র দেওয়ার আগে গ্রেপ্তার করতে অনুমতি নিতে হবে। অথচ সাধারণ মানুষকে যেকোনো সময় আটক করা যাবে,” বলেন তিনি।

“এই ধরনের আইনের বিরুদ্ধে আমরা আগেও আদালতে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম। এবারও করব। গত বছরের নভেম্বরে আইনটির গেজেট হয়। এরপর থেকেই আমরা এ বিষয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছি,” বলেন তিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে মনজিল মোরসেদ বলেন, “অনুমতির নামে অপরাধ করা সরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে তারা স্বাধীনভাবে অপরাধ করতে পারবে।”

তিনি বলেন, “এমনিতে আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ছেয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দলমত-নির্বিশেষে তিনি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। সেই অবস্থায় এই ধরনের সুরক্ষা সরকারি চাকরিজীবীদের কেন দেওয়া হলো। এ আইনের সাথে জড়িতরা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার বাইরে কাজ করেছেন।”

তবে এ প্রসঙ্গে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বেনারকে বলেন, কাউকে ছাড় দেওয়ার বা অপরাধ করলে সুরক্ষা করার লক্ষ্যে আইনটি করা হয়নি। কেউ অপরাধ করলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইনসহ বিকল্প আইনও তো রয়েছে।”

এই আইনটি জনপ্রশাসনে গতি আনতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করেন তিনি।

তবে সময়ের প্রয়োজনে যেকোনো আইন সংশোধন বা সংযোজন হতে পারে বলেও মন্তব্য করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী।

আইনটির বিষয়ে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব আলী ইমাম মজুমদার বেনারকে বলেন, “সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ফৌজদারি আইনে মামলা, অভিযোগপত্র বা গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে যে সুবিধা রাখা হয়েছে, তার বাইরে নতুন কোনো সুযোগের দরকার নেই।”

তিনি বলেন, “অপরাধমূলক কাজ করা সরকারি চাকরিজীবীদের সংখ্যা খুবই কম। এদের অপরাধের দায় বেশির ভাগ কর্মকর্তা-কর্মচারীর ওপর চাপানোর চেষ্টাটা দুঃখজনক।”

উল্লেখ্য, দেশে বিদ্যমান ফৌজদারি আইনে সরকারি চাকরিজীবীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৯৭ ধারা অনুসারে সরকারি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেলে অভিযোগপত্র দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তরের অনুমোদন লাগবে।

তবে ফৌজদারি আইনে সরকারি চাকরিজীবীদের গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। কিন্তু মঙ্গলবার থেকে কার্যকর হতে যাওয়া সরকারি চাকরি আইন অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে দায়ের করা ফৌজদারি মামলায় আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণের আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে সরকার বা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে।

দুদকের সাথে দন্দ্ব

এর আগে ২০১৩ সালে সরকারের অনুমোদন ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে না—এমন বিধান যুক্ত করে দুদক আইন সংশোধন বিল পাস করে জাতীয় সংসদ।

এর মাধ্যমে দুদকের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের পাশাপাশি দুদক ও জাতীয় সংসদে দফায় দফায় আলোচনা হয়।

তবে ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর বিষয়টি আদালত পর্যন্ত নিয়ে যায় হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ। তাদের পক্ষে সংশোধনী আইন চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন চার আইনজীবী। পরে ২০১৫ সালের ৩০ জানুয়ারি দুদক আইনের সংশোধনী অবৈধ বলে উচ্চ আদালত থেকে রায় আসে।

পরে ওই রায়ের বিরুদ্ধে আর কোনো আপিল করেনি সরকার। ফলে দুদকের আইনটি বহাল রয়েছে।

নতুন আইনে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অনেক

সরকারি চাকরি আইনটি দেশে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য করা প্রথম আইন। এর লক্ষ্য সরকারি কর্মচারীদের জনমুখী করা, দক্ষতা বাড়ানো ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

এই আইনে সরকারি কর্মচারীদের বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে অনেক ক্ষমতা থাকছে। নিয়োগ কর্তৃপক্ষ থেকে লঘু বা গুরুদণ্ড পাওয়া যে কোনো কর্মচারী রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করতে পারবেন। এরপর রাষ্ট্রপতি যে আদেশ দেবেন সেটিই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। রাষ্ট্রপতির আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা যাবে না। তবে আইনে রাষ্ট্রপতির কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন করার কথা বলা হয়েছে।

জানা যায়, সাংবিধানিক পদে ও বিচার বিভাগে নিয়োজিত ব্যক্তিরা, পোশাকধারী শৃঙ্খলিত যেকোনো বাহিনী, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারী, উন্নয়ন প্রকল্পের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ কয়েকটি খাত সরকারি চাকরি আইনের আওতায় পড়বে না। কারণ তাদের নিজস্ব আইন রয়েছে।

আসক, টিআইবির উদ্বেগ

এদিকে সরকারি চাকরি আইন কার্যকর করার সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার ও নাগরিক সংগঠন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, এ আইনটি সংবিধান পরিপন্থী ও বৈষম্যমূলক।

সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইনটি কার্যকর করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আইনটি এভাবে কার্যকর হলে বর্তমান সরকার প্রণীত ও বাস্তবায়নরত ‘জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ এর সাথে বিপরীতমুখী হবে।”

“তা ছাড়া, ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারের পূর্বে সরকারের কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণের বিধান ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ এর ৫৪ ধারার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক,” বলেন তিনি।

এ ছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, “এ আইনটি কার্যকর হলে ক্ষমতার অপব্যবহার বাড়বে এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র সংকুচিত হবে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন