Follow us

মাদকবিরোধী অভিযানে জানুয়ারিতে নিহত ৬ রোহিঙ্গা, আগের ১৯ মাসে ৫৬

আবদুর রহমান ও শরীফ খিয়াম
কক্সবাজার ও ঢাকা
2020-01-24
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ইয়াবা পাচারের অভিযোগে র‍্যাবের হাতে আটক উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সাইদ উল্লাহ (বামে) ও মো. রফিক। ১৬ জানুয়ারি ২০১৯।
ইয়াবা পাচারের অভিযোগে র‍্যাবের হাতে আটক উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবিরের বাসিন্দা সাইদ উল্লাহ (বামে) ও মো. রফিক। ১৬ জানুয়ারি ২০১৯।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

নতুন বছরে তিন সপ্তারও কম সময়ের ব্যবধানে সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন ছয়জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। এর মধ্যে সর্বশেষজন মারা গেছেন শুক্রবার ভোর রাতে।

সরকারি বিবরণে তাঁরা সবাই আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেছেন বলা হলেও মানবাধিকার কর্মীরা এসব ঘটনাকে আখ্যায়িত করছেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে।

“এই ধরনের অভিযানের লক্ষ্য যাই হোক না কেন, তা আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কেউ বা স্থানীয়–যেই হোক; বিচারবহির্ভূত প্রতিটি হত্যাই রাষ্ট্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে,” বেনারকে বলেন মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন।

এদিকে ২০১৮ সালের মে মাসে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী অভিযানে চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬২ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী নিহত হয়েছেন বলে বেনারকে জানান জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন।

এদের মধ্যে পুলিশের অভিযানে ২৯, বিজিবির অভিযানে ২১ এবং র‍্যাবের অভিযানে ১২ জন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন জানিয়ে ইকবাল হোসেন বলেন, “বিগত এক বছরে কমপক্ষে আরও সাড়ে পাঁচশ রোহিঙ্গাকে মাদক সংশ্লিষ্টতার দায়ে আটক করা হয়েছে; যাদের অনেকে নারী।”

“পুলিশসহ প্রতিটি বাহিনী ইয়াবা রোধে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের গতিবিধির ওপর নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে,” বলেন এএসপি ইকবাল।

টানা তিনবারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর গত মেয়াদের শেষ বছরে (২০১৮ সালের ৩ মে) মাদক প্রতিরোধে সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন।

সেই থেকে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কক্সবাজার জেলায় ৫৬ রোহিঙ্গাসহ মোট ২০৯ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। যার মধ্যে পুলিশের অভিযানে ১৩৩, র‍্যাবের অভিযানে ৩২ এবং বিজিবির অভিযানে ৪৪ জন।

মাদকবিরোধী যুদ্ধে ইতিমধ্যে সারা দেশে সাড়ে চার শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন উল্লেখ করে নূর খান লিটন বলেন, “বন্দুকযুদ্ধের নামে যে বিচারবহির্ভূত হত্যা বা মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে, তা ভবিষ্যতের জন্য শুভ কোনো বার্তা বয়ে আনবে না।”

“বরং মাদকের সাথে যারা যুক্ত তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করাটা জরুরি। বিচার প্রক্রিয়া বা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি হলেও এর সুফলও সুদূরপ্রসারী। অন্য কোনো পথে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়,” যোগ করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের এই সাবেক নির্বাহী পরিচালক।

গত নভেম্বরে এক প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল জানায়, বাংলাদেশে ২০১৮ সালের মাদকবিরোধী যুদ্ধে ৪৬৬ জন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই যুদ্ধ ঘোষণার পর দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে গেছে বলেও দাবি করে তারা।

তবে “নিহতরা অভিযান চলাকালে গোলাগুলির মধ্যে পড়ে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে,” মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ব্যারিস্টার শাহ আলী ফরহাদ বেনারকে বলেন, “এই ধরনের হতাহতের ঘটনাগুলোকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা ঠিক না।”

বছরের শুরুতেই নিহত ছয়

চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি থেকে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিন সপ্তারও কম সময়ে কথিত বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন ছয়জন রোহিঙ্গা শরণার্থী।

শুক্রবারের প্রথম প্রহরে (বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে) বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অভিযানে টেকনাফের হ্নীলা ইউনিয়নের জাদিমুড়া গ্রামের নাফনদী সংলগ্ন এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন এক ইয়াবা পাচারকারী (২৫) রোহিঙ্গা।

তাঁর নাম-পরিচয় নিশ্চিত না হলেও ওই শরণার্থী উখিয়ার থ্যাংখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা বলে দাবি করেছে বিজিবি।

বিজিবির স্থানীয় ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. ফয়সাল হাসান খান বেনারকে জানান, ঘটনাস্থল থেকে এক লাখ ৩০ হাজার ইয়াবা, একটি দেশীয় বন্ধুক ও এক রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে।

একই গ্রামে গত ১৯ জানুয়ারি বিজিবির অভিযানে নিহত হন উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের বাসিন্দা জামাল হোসেনের ছেলে মোহাম্মদ আইয়াস (২৫)।

এর আগে ১৫ জানুয়ারি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ সড়কের শামলাপুর এলাকায় র‍্যাবের অভিযানে নিহত হন কুতুপালং শিবিরে আশ্রয় নেওয়া হোসাইন শরীফের ছেলে আবুল হাসিম (৩০) ও শামসুল আলমের ছেলে মোহাম্মদ আইয়ুব (২৪)।

“তাঁরা দুজনই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী,” বেনারকে বলেন র‍্যাবের হোয়াইক্যং ক্যাম্পের ইনচার্জ (এএসপি) শাহ আলম।

এ ছাড়া গত ৬ জানুয়ারি উখিয়ার ফাঁড়ীরবিল সীমান্তে বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন টেকনাফের উনচিংপ্রাং রোহিঙ্গা শিবিরের মৃত সুলতান আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইসমাইল (২৮) এবং মো. আবু সৈয়দের ছেলে মো. হেলাল উদ্দিন (২০)।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, উত্তেজক মাদক ইয়াবার প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি কক্সবাজারে মাদক পাচার কমেছে তাদের এই কঠোর মনোভাবের কারণে।

বেকারত্বে মরিয়া রোহিঙ্গারা

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী কক্সবাজারে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের ৪২ শতাংশ ১৮ থেকে ৫৯ বছর বয়সী।

“দুই বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোতে বেকার জীবন কাটাচ্ছেন এই কর্মক্ষম রোহিঙ্গারা। পরিবার বা নিজের আর্থিক উন্নতির আশায় মাদক পাচারে জড়িয়ে পড়ছেন তাঁদের অনেকে,” বেনারকে বলেন কুতুপালংয়ের রোহিঙ্গা নেতা ফয়েজ উল্লাহ।

“কুতুপালং সবচেয়ে বড় শিবির হওয়ার কারণে সেখানে জনঘনত্ব অনেক বেশি। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে চাইছে ইয়াবা কারবারিরা। সেখানে টহল ও অভিযান জোরদার করেছি আমরা,” বলেন উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল মনসুর।

টেকনাফ মডেল থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশও রোহিঙ্গা শিবিরগুলোয় নজরদারি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন। বেনারকে তিনি বলেন, “ইয়াবার কারবার থেকে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ায় এখন রোহিঙ্গারাই বেশি ধরা পড়ছে বা মারা যাচ্ছে।”

তবে র‍্যাবের টেকনাফ ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বেনারকে বলেন, “স্থানীয় মাদক-সন্ত্রাসীরাই রোহিঙ্গাদের পাচারের কাজে ব্যবহার করছে এবং তাদের ক্যাম্পগুলোকে ইয়াবা মজুত ও লেনদেনের ঠিকানা হিসেবে বেছে নিয়েছে। কারণ তারা জানে ‘স্পর্শকাতর’ এলাকা হওয়ায় সেখানে যখন-তখন অভিযান চালানো অসম্ভব।”

“তবুও আমরা বিভিন্ন শিবির থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অস্ত্রসহ অনেক অপরাধীকে আটক করতে সক্ষম হয়েছি,” বলেন তিনি।

যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে তাদের একটি বড় অংশ আগে থেকেই ইয়াবা কারবারে যুক্ত ছিল বলে দাবি করেন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থার (মানস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. অরূপ রতন চৌধুরী।

একুশে পদকপ্রাপ্ত এই চিকিৎসক বেনারকে বলেন, “ক্যাম্পগুলোয় ব্যাপকভাবে কোনো অভিযান হয়নি। যার জন্য তারা প্রশ্রয় পেয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করার পরই ইয়াবা যে কোনো সময়ের চেয়ে সহজলভ্য হয়ে গেছে।”

গত বছরের জানুয়ারিতে কক্সবাজারের মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারাও বেনারকে বলেন, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ ও ২০১৮ সালে অনেক বেশি ইয়াবার চালান ও পাচারকারী ধরা পড়েছে।

এর আগে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, “বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের কারণে মানব পাচার, মাদকদ্রব্য চোরাচালানসহ সংঘবদ্ধ অন্যান্য অপরাধের ঝুঁকি বেড়েছে।”

“মাদক নির্মূলে রোহিঙ্গারাই বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা এখন প্রায়ই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর যেভাবে গুলিবর্ষণ করছে, তা শঙ্কার,” বেনারকে বলেন নাগরিক সংগঠন আমরা কক্সবাজারবাসীর সমন্বয়ক এইচএম নজরুল ইসলাম।

“তাদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে,” মনে করেন তিনি।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন