Follow us

দ্বিতীয় দফায় ২১ মাদক কারবারির আত্মসমর্পণ

প্রাপ্তি রহমান
ঢাকা
2020-02-04
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
টেকনাফে আত্মসমর্পণকারী মাদক কারবারিদের সাথে কথা বলছেন পুলিশ কর্মকর্তরা। ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
টেকনাফে আত্মসমর্পণকারী মাদক কারবারিদের সাথে কথা বলছেন পুলিশ কর্মকর্তরা। ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০।
[আবদুর রহমান/বেনারনিউজ]

কক্সবাজার জেলার টেকনাফে দ্বিতীয় দফায় আত্মসমর্পণ করেছেন ২১ ইয়াবা কারবারি। মঙ্গলবার মাদক ও অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাঁদের কারাগারে পাঠিয়ে দিয়েছে পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযানের অংশ ছিল এই আত্মসমর্পণ। যাঁরা এই সুযোগ নেননি, তাঁদের বিরুদ্ধ কঠোর ব্যবস্থা নেবে তারা।

সোমবার টেকনাফ সরকারি ডিগ্রি কলেজ মাঠে এই ২১ জন ইয়াবা ও হুন্ডি কারবারি আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের হেফাজত থেকে ২১ হাজার ইয়াবা ও ১০টি দেশে তৈরি বন্দুক উদ্ধার হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন, বাংলাদেশ পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক খন্দকার গোলাম ফারুক। তিনি বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।

“৯০-এর দশকের শেষ দিকে জঙ্গিবাদ চরমভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। জিরো টলারেন্স নীতির কারণে জঙ্গিবাদ দমনে সফলতা পেয়েছি। ইয়াবাও বন্ধ হবে ইনশাআল্লাহ,” খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন।

তিনি আরও বলেন, দোষ স্বীকার করে যারা আত্মসমর্পণ করেছেন, তাঁদের তিনি সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তবে যারা বাইরে রয়েছেন তাঁদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অব্যাহত থাকবে।

এর আগে গত বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে ১০২ জন মাদককারবারি আত্মসমর্পণ করেন। তাঁদের বিরুদ্ধেও সম্মিলিতভাবে মাদক আইনে একটি এবং অস্ত্র আইনে একটি মামলা করেছিল পুলিশ। সম্প্রতি এ দুটি মামলায় অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে কক্সবাজার পুলিশ।

২০১৮ সালের ১৫ মে মাদকের বিরুদ্ধে দেশের সব কটি বাহিনী অভিযান শুরু করে। শুধু কক্সবাজার জেলাতেই কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ২১০ জন। এই তালিকায় দুই নারীসহ ৬৩ জন রোহিঙ্গা শরণাণার্থী রয়েছেন।

সোমবার দ্বিতীয় দফা আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মাসুদ হোসেন বলেন, অনেকেই ভালো মানুষের মুখোশ পরে ইয়াবার কারবার চালাচ্ছেন। তাঁদের কেউই আইনের চোখকে ফাঁকি দিতে পারবেন না।

“বন্দুকযুদ্ধে শুধু কক্সবাজারেই নিহত হয়েছেন দুইশরও বেশি মানুষ। তারপরও টেকনাফের কিছু লোক ইয়াবা ব্যবসা করার সাহস দেখাচ্ছে। নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে অভিযান আরও জোরদার হবে,” মাসুদ হোসেন বলেন।

এ প্রসঙ্গে মাসুদ হোসেন বেনারকে বলেন, “আত্মসমর্পণের সুযোগ দিয়ে আমরা লাভবান হয়েছি। তাঁদের কাছ থেকে আমরা প্রচুর তথ্য পেয়েছি। তাঁরা ছয়শতাধিক ইয়াবা কারবারির নাম জানিয়েছেন। সে নামগুলো যাচাই–বাছাই করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

তবে, বন্দুকযুদ্ধ বা আত্মসমর্পণ কোনো প্রক্রিয়াতেও মাদকের প্রবেশ বন্ধ হয়নি।

গত জানুয়ারি মাসে পুলিশ, বিজিবি ও র‍্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ছয় রোহিঙ্গাসহ নয়জন মাদক কারবারি নিহত হন। জানুয়ারিতে কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে সাত লাখের বেশি ইয়াবা উদ্ধার হয়। গতবছরের ডিসেম্বরে উদ্ধার হয় ২৭ লাখ ৩৫ হাজার ইয়াবা। নভেম্বর মাসে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার ১৪টি।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার অবশ্য বলছেন, জোরদার অভিযান ও বড় কারবারিদের আত্মসমর্পণের ফলে ইয়াবা কারবারিরা এখন নতুন নতুন রুট খুঁজছেন। টেকনাফ থেকে ইয়াবা আসার হার এখন আগের চেয়ে কম।

বাকিতে ইয়াবা বিক্রি, নতুন রুটের খোঁজ

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোহাম্মদ ইকবাল হোসাইন বলেন মিয়ারমারের নিরাপত্তা বাহিনী ইয়াবা পাচারের সঙ্গে যুক্ত। সে কারণে এই ব্যবসা যেকোনো উপায়ে টিকিয়ে রাখতে মরিয়া। ভবিষ্যতে টাকা শোধ করা হবে এই প্রতিশ্রুতিতে তাঁরা ইয়াবা পাঠাচ্ছেন বাংলাদেশে।

“মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মধ্যে নাফ নদী। নাফ নদী দিয়ে ইয়াবার চালান ঢুকিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে রাখা হয়। তারপর সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয়,” ইকবাল হোসাইন বলেন।

তিনি আরও বলেন, ও প্রান্ত থেকে বিনা পয়সায় বাংলাদেশে পাঠানো হয়। বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বাংলা দৈনিক প্রথম আলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উদ্ধৃত করে বলছে, রোহিঙ্গা শিবিরের ভেতরে ৭০০টি ইয়াবা কেনাবেচার স্থান রয়েছে।

এদিকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, এখন ভারত থেকেও ইয়াবা আসছে। নয়াদিল্লীতে গত ২৫ থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলা মহাপরিচালক পর্যায়ের বৈঠকেও এই প্রসঙ্গটি আলোচিত হয় বলে জানান বিজিবির জনসংযোগ কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম।

“বিজিবি মহাপরিচালক বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতের অভ্যন্তরে ফেনসিডিল ও ইয়াবার কারখানা পরিচালনার বিষয়টি উত্থাপন করেছিলেন,” শরীফুল ইসলাম বেনারনিউজকে বলেন। তিনি আরও জানান, এ ব্যাপারে বিএসএফ সুনির্দিষ্ট তথ্য চেয়েছে।

বিজিবি কর্মকর্তারা বলছেন, ইয়াবা পাচারে সিলেট সীমান্ত এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভারতের মিজোরাম থেকে আসাম ও মেঘালয় হয়ে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ইয়াবা ঢোকার তথ্য তাঁদের কাছে আছে।

চাহিদা না কমালে যোগান কমবে না

পুলিশ বলছে বাংলাদেশে প্রথম ইয়াবা ঢোকে ১৯৯৭ সালে। কক্সবাজারের টেকনাফ ছিল এর উৎস। দ্রুতই অন্যান্য নেশাদ্রব্যকে পেছনে ফেলে ইয়াবায় আসক্ত হয়ে ওঠেন দেশের বিপুল সংখ্যক তরুণ। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক খোরশিদ আলম বলেন, এ সংখ্যা ৭০ লাখের মতো।

অন্যদিকে জাতিসংঘের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউএনওডিসির মতে, বাংলাদেশে বছরে ইয়াবা বিক্রি হয় ৪০ কোটির বেশি, এর বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। মাদকের বাজার ও আন্তর্জাতিক নেটওযার্ক নিয়ে কাজ করেন নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এমদাদুল হক। তিনি বলেন, চাহিদা কমাতে হবে এবং অভিযান হতে হবে সর্বাত্মক।

“মাদক নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা জরুরি। যারা মাদকব্যবসায়ী তাঁদের সবার বিরুদ্ধেই আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। কাউকে ছাড় দিলে অভিযান সফল হবে না,” এমদাদুল হক বেনারনিউজকে বলেন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন