ইইউ’র শর্তে বিমানবন্দরে চালু হচ্ছে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2017-06-09
Share
বিমানবন্দরের প্রবেশপথে এক যাত্রীকে তল্লাশি করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। বিমানবন্দরের অদূরে আত্মঘাতী বোমা হামলার পরবর্তী সময়ে ঢাকার হজরত শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রবেশপথে এক যাত্রীকে তল্লাশি করছেন নিরাপত্তাকর্মীরা। ১৭ মার্চ ২০১৭।
AFP

বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোতে সরাসরি কার্গো বিমান চলাচলের ওপর বাড়তি নিরাপত্তার শর্ত আরোপের পর প্রধান বিমানবন্দরে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন বেনারকে জানিয়েছেন, আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নতুন এই বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু হবে।

বাংলাদেশে জঙ্গি হামলা বেড়ে যাওয়া ও ঢাকার হজরত শাহজালাল বিমান বন্দরের নিরাপত্তা ঘাটতির কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই নতুন শর্ত দিয়েছে—এমন মত নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।

বাংলাদেশের ৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানির শতকরা ৬০ ভাগ বা ১৯ বিলিয়ন ডলার আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলো থেকে। তাই নতুন নিরাপত্তা শর্ত ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলেছে। তাঁরা সরকারকে অচিরেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের শর্ত মোতাবেক হজরত শাহ জালাল বিমানবন্দরে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালুর দাবি জানিয়েছেন।

গত ১ জুন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশ থেকে সরাসরি কার্গো বিমান পরিচালনার ওপর বাড়তি নিরাপত্তার শর্ত আরোপ করে।

“আমরা আশা করছি আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে তাদের শর্ত মোতাবেক বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করতে পারব,” রাশেদ খান মেনন বেনারকে বলেন।

তিনি বলেন, ইইউ হঠাৎ কার্গো বিমান চলাচলের ওপর নতুন এই শর্ত দিয়েছে।

“বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা চালু করার পূর্ব পর্যন্ত বিশেষ কুকুর দলের মাধ্যমে প্রতিটি ইউরোপগামী কার্গো বিমানে নিরাপত্তা তল্লাশি চালানো হচ্ছে, যাতে কেউ কোনও বিস্ফোরক বিমানে বা মালামালের মধ্যে রাখতে না পারে,” জানান মন্ত্রী।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ঢাকা অফিসের মুখপাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, ১ জুন থেকে চালু হওয়া নিয়মানুযায়ী বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নগামী সকল কার্গো বিমানকে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে পরীক্ষার পর সদস্য দেশে প্রবেশ করতে হবে। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইনকে নিশ্চয়তা দিতে হবে যে বিমানে কোনো বিস্ফোরক নেই।

তিনি বলেন, ঢাকা বিমানবন্দরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না থাকলে তৃতীয় কোনো বিমানবন্দর থেকে বিস্ফোরক শনাক্তকরণ ব্যবস্থার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নে রপ্তানির শতকরা ৮১ ভাগ তৈরি পোশাক। এই সিদ্ধান্তে পোশাক খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

তৈরি পোশাক শিল্পের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বেনারকে বলেন, “ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই বাড়তি নিরাপত্তা শর্ত আমাদের দেশের জন্য একটি বিরাট ধাক্কা। এর ফলে নিরাপদ ও স্থিতিশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আমাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলো এর সুযোগ নেবে।”

তিনি আরও বলেন, তৈরি পোশাকের শতকরা ৯০ ভাগ সমুদ্রপথে রপ্তানি হয়ে থাকে। যেহেতু এই বাড়তি শর্ত শুধু বিমানের জন্য, সেহেতু সেখানে আমাদের তৈরি পোশাকের বাজারের খুব বেশি ক্ষতি হবে না।

রহমান বলেন, মালামাল সরবরাহের সময় কম থাকলে তারা বিমান ব্যবহার করেন। আর এর পরিমাণ শতকরা ১০ ভাগ।

“দুবাই, সৌদি আরব বা তুরস্কে যদি পুনরায় বিমানটি পরীক্ষার জন্য রাখা হয়, তাহলে বাড়তি সময় ও অর্থ অপচয় হবে বলে জানান সিদ্দিকুর রহমান।

তিনি বলেন, বাড়তি নিরাপত্তার জন্য কয়েক ঘণ্টা অপচয় হলে ক্রেতারা মালামাল গ্রহণ করে না।

বিমানে পরিবহন করা তৈরি পোশাকের মূল্য প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বিআইডিএস এর সিনিয়র গবেষক নাজনীন আহমেদ বেনারকে বলেন, “আমাদের মতো দেশের জন্য দুই বিলিয়ন ডলার অনেক বড় ব্যপার। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই বাড়তি নিরাপত্তা শর্ত আমাদের রপ্তানি বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

“তৈরি পোশাক ছাড়াও আমরা সেখানে শাক-সবজি, মাছ-মাংস, ফল, জীবন্ত প্রাণী ও অন্যান্য পচনশীল সামগ্রী রপ্তানি করি। এগুলোর রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে,” নাজনীন বলেন।

তিনি বলেন, “আমাদের মোট রপ্তানির শতকরা এক ভাগ হলো এ ধরনের পচনশীল দ্রব্য। এটা ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমাদের কৃষক ও রপ্তানীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে; কর্ম সংস্থান ব্যাহত হবে।”

নিরাপত্তা বিশ্লেষক সাখাওয়াত হোসেন বেনারকে বলেন, শাহ জালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনো আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছেনি।

“দেখুন, আমাদের বিমানবন্দরে এখনো অনেক ট্রেড ইউনিয়ন নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অবাধে প্রবেশ করতে পারেন। কাজেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ভয় হতেই পারে যে, এখানকার বিমানে কেউ বোমা রাখতেও পারে।”

সাখাওয়াত বলেন, গত কয়েক বছরের জঙ্গি হামলা, বিদেশীদের হত্যা ও সংখ্যালঘুদের হত্যার ঘটনাগু​লো ইউরোপীয় ও আমেরিকানদের জন্য বড় শঙ্কার বিষয়।

তিনি আরও বলেন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ব্যাপারে বাংলাদেশের সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে।

“বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে ইউ ও অন্যান্য পশ্চিমা দেশের যে শঙ্কা আছে তা দূর করতে হবে। এ ছাড়া বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিতে হবে,” সাখাওয়াত হোসেন বলেন।

মন্তব্য (0)

সব মন্তব্য দেখুন.

মন্তব্য করুন

নিচের ঘরে আপনার মন্তব্য লিখুন। মন্তব্য করার সাথে সাথে তা প্রকাশ হয় না। একজন মডারেটর অনুমোদন দেবার পর মন্তব্য প্রকাশিত হয়। বেনারনিউজের নীতিমালা অনুসারে প্রয়োজানে মন্তব্য সম্পাদনা হতে পারে। প্রকাশিত কোনো মতামতের জন্য বেনারনিউজ দায়ী নয়। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হোন এবং বিষয়বস্তুর সাথে প্রাসঙ্গিক থাকুন।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন