Follow us

‘আলোচনার মাধ্যমে’ চুরি যাওয়া টাকা উদ্ধারে ম্যানিলায় ঢাকার প্রতিনিধিরা

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-03-08
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির তদন্ত দলের সামনে শুনানির আগে দেশটির সিনেটর রেফ রেকটোর সাথে হাত মেলাচ্ছেন ম্যানিলায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ (বামে)। ২৯ মার্চ ২০১৬।
বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরির ঘটনায় ফিলিপাইনের সিনেট কমিটির তদন্ত দলের সামনে শুনানির আগে দেশটির সিনেটর রেফ রেকটোর সাথে হাত মেলাচ্ছেন ম্যানিলায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ (বামে)। ২৯ মার্চ ২০১৬।
[এপি]

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে চুরি যাওয়া সমুদয় অর্থ ‘আলোচনার মাধ্যমে’ উদ্ধারের জন্য শুক্রবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলার উদ্দেশ্যে ঢাকা ছেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধিদল।

ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং কর্পোরেশন (আরসিবিসি) ও সে দেশের ফাইনান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিট কর্মকর্তাদের সাথে আগামী সোমবার ও মঙ্গলবার তাঁরা বৈঠক করবেন বলে বেনারকে জানিয়েছেন প্রতিনিধিদলের প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান।
ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে খোলা বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে উত্তর কোরীয় হ্যাকারদের সহায়তায় হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে লুটে নেওয়া ৮১ মিলিয়ন ডলার উদ্ধারে জন্য নিউ ইয়র্কের আদালতে মামলা হওয়ার এক মাসের মধ্যে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) প্রধান রাজী বলেন, “আগামী ১১ ও ১২ মার্চ আমরা ফিলিপাইনের কর্মকর্তাদের সাথে সভা করব। আমাদের উদ্দেশ্য আলোচনার মাধ্যমে চুরি যাওয়া সমুদয় অর্থ উদ্ধার।”

“আমাদের কথা পরিস্কার, চুরি যাওয়া অর্থ ফিলিপাইনের আরসিবিসি’র মাধ্যমে চোরদের কাছে গেছে। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকও এই চুরির জন্য তাদের দোষী সাব্যস্ত করে অর্থদণ্ড দিয়েছে। তা ছাড়া তাদের শাখা ব্যবস্থাপক মায়া দিগুইতোকে কারাদণ্ড দিয়েছে সে দেশের আদালত,” বলেন এই কর্মকর্তা।

তাঁর দাবি, “আরসিবিসি’কে অবশ্যই আমাদের সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে হবে।”

পাঁচ সদস্যের এই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ফিলিপাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসের কয়েকজন কর্মকর্তা যোগ দেবেন।
২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে খোলা বাংলাদেশ ব্যাংকের চলতি হিসাব থেকে ভুয়া পেমেন্টে আদেশের মাধ্যমে মোট ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরি করে আন্তর্জাতিক হ্যাকাররা। যার ৮১ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় ফিলিপাইনের আরসিবিসি’র একটি ভুয়া হিসাবে।

বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার একটি বেসরকারি সংগঠনের হিসাবে। তবে বেসরকারি ওই সংগঠনের নামের বানান ভুল থাকায় শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই অর্থ ছাড় করেনি।

পরে ফেডারেল রিজার্ভে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে সেই ২০ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেয় শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

অন্যদিকে ফিলিপাইনে পাঠানো ৮১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে মাত্র ১৫ মিলিয়ন ডলার ফেরত আসে। বাকি অর্থের কোনো হদিস নেই।

গত তিন বছর চুরি যাওয়া অর্থ আদায়ে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্কের একটি আদালতে মামলা দায়ের করে বাংলাদেশ ব্যাংক। মামলাটি পরিচালনা করতে ফেডারেল রিজার্ভের সাথে তাদের একটি সমঝোতাও স্বাক্ষরিত হয়।

মামলার বিবরণীতে বলা হয়, “ফেডারেল রিজার্ভের অর্থ চুরি করতে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা ফিলিপাইনের হ্যাকারদের সাথে হাত মেলায়।”

“আরসিবিসি এবং এর আট কর্মকর্তা ফিলিপাইনের ক্যাসিনো পরিচালক, কয়েকজন চীনা নাগরিক ও হ্যাকারদের সাথে চক্রান্ত করে ওই অর্থ চুরি করে,” উল্লেখ রয়েছে সেখানে।

আলোচনার প্রস্তাব বাংলাদেশের
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেই ‘আলোচনার মাধ্যমে সমুদয় অর্থ উদ্ধারের প্রস্তাব’ দেয়া হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিনিধিদলের সদস্য বাংলাদেশ ব্যাংকের আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি বেনারকে বলেন, “মূলত মামলা করার পর ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ আলোচনায় আগ্রহী হয়েছে।”
আরসিবিসি সমুদয় অর্থ ফেরত দিতে রাজি হলে নিউ ইয়র্কের আদালতে করা মামলা তুলে নেয়া হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “এটা নির্ভর করবে আলোচনার অগ্রগতির ওপর।”
হদিস না থাকা অর্থ কোথায় গেছে এবং এই হ্যাকিংয়ের সাথে কারা জড়িত তা বের করতে তদন্ত করছে বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) একটি দল। তারা এখনও প্রতিবেদন তৈরি করতে পারেনি বলে বেনারকে জানিয়েছেন তদন্ত দলের এক সদস্য।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিনিজেন্স ইউনিটের উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ বেনারকে বলেন, “আমরা ফিলিপাইনের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিলিজেন্স ইউনিটের সাথে তিনমাস পর পর সভা করে থাকি। আমাদের মূল লক্ষ্য চুরি যাওয়া সমুদয় অর্থ ফেরত আনা।”

“তবে ফৌজদারি মামলা চলবে কি না সেটা নির্ভর করবে ফৌজদারি তদন্তের ওপর। আমাদের সিআইডি ফৌজদারি তদন্ত করছে,” বলেন তিনি।

অসহযোগিতায় নাকাল তদন্ত দল

সিআইডির তদন্ত দলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “আমাদের দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে কিছু দেশ সহায়তা করলেও অনেক দেশ এ তদন্তে কোনো রকম সহায়তা করছে না।”

“ফিলিপাইনসহ বেশ কিছু দেশ প্রয়োজনীয় তথ্য দিচ্ছে না। হ্যাকিংয়ের সাথে জড়িত মিশরের একটি ‘আইপি এ্যাড্রেসের’ সন্ধান পেয়েছিলাম। কিন্তু অনুসন্ধানে সে দেশের সহায়তা পাইনি,” বলেন তিনি।

সিআইডি মোট ১১ দেশের কাছে হ্যাকারদের তথ্য চেয়েছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা আরো বলেন, “আমাদের মনে হচ্ছে, চুরি যাওয়া অর্থ ক্যাসিনোর মাধ্যমে চীন, হংকং ও অন্যান্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোতে গেছে।”

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন