Follow us

বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরি: আলোচনার মাধ্যমে অর্থ উদ্ধারের পথ রুদ্ধ

কামরান রেজা চৌধুরী
ঢাকা
2019-04-17
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন। ৮ মার্চ ২০১৬।
ঢাকায় বাংলাদেশ ব্যাংক ভবন। ৮ মার্চ ২০১৬।
[রয়টার্স]

বাংলাদেশ মামলা করার পর চুরি যাওয়া অর্থ উদ্ধারে ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। চুরি যাওয়া সমুদয় অর্থ উদ্ধারের জন্য ১ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্কের আদালতে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি) কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

মামলার পাশাপাশি আলোচনার মাধ্যমে টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রস্তাব দেওয়া হলে আরসিবিসি তা প্রত্যাখান করেছে বলে বেনারকে জানান বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর প্রধান কর্মকর্তা আবু হেনা মোহা. রাজী হাসান।

মামলার পরে ১১-১২ মার্চ ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, আরসিবিসিসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের সাথে অর্থ উদ্ধারের ব্যাপারে আলোচনা করতে তাঁর নেতৃত্বে ফিলিপাইন যায় বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল।

রাজী হাসান বলেন, “আলাচনার মাধ্যমে বাকি ৬৬ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তারা বলেছে, যেহেতু তোমরা মামলা করেছে সেহেতু বিষয়টি আদালতের মাধ্যমেই সুরাহা হওয়া উচিত।”

তবে আলোচনায় অংশ নেওয়া এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেনারকে বলেন, “ফিলিপাইন চাইবে, বিষয়টি আইনি প্রক্রিয়ায় ঝুলে যাক। আলোচনা করলে টাকা দিতে হবে। আর আইনি প্রক্রিয়ায় গেলে তারা মনে করে জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।”

তিনি বলেন, “আরেকটি দিক হলো, টাকা দিয়ে দিলে প্রমাণিত হবে যে, আরসিবিসি হ্যাকারদের সহায়তা করেছে। সে ক্ষেত্রে পরোক্ষভাবে দোষ স্বীকার করা হয়। আর দোষী প্রমাণিত হলে ফৌজদারি অপরাধের জন্য তাদের কর্মকর্তাদের সাজা হতে পারে।”

২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১০১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার চুরি করে নেয় আন্তর্জাতিক চক্র।

এর মধ্যে ৮১ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশনের কয়েকটি হিসাবে, যেগুলো চুরির কয়েক মাস আগে খোলা হয়। ওই হিসাবগুলোতে চুরি যাওয়া অর্থ ছাড়া আর কোনো লেনদেন হয়নি।

বাকি ২০ মিলিয়ন ডলার পাঠানো হয় শ্রীলঙ্কার একটি বেসরকারি সংস্থার হিসাবে। তবে ওই সংস্থার নামের বানান ভুল হওয়ায় ওই অর্থ ছাড় করেনি শ্রীলঙ্কার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরে সেই অর্থ ফেরত দেয়া হয় বাংলাদেশকে।

তবে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮১ মিলিয়ন ডলার আরসিবিসি-কে পাঠিয়ে দেয়। ওই টাকা হিসাবধারীদের না দেয়ার আদেশ পাঠানো হলেও খুব দ্রুত সেই টাকা হ্যাকারদের দিয়ে দেয় ব্যাংকটি।

বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তদন্তে নামে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অন্যান্য সংস্থা। তদন্তে জানা যায়, হ্যাকাররা ওই অর্থ ফিলিপাইনের জুয়া খেলার কোম্পানিতে নিয়ে গেছে। একটি জুয়া প্রতিষ্ঠানের প্রধান কিম ওং ১৫ মিলিয়ন ডলার বাংলাদেশকে ফেরত দেন।

বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের উপদেষ্টা দেবপ্রসাদ দেবনাথ বেনারকে বলেন, “কিমের ফেরত দেয়া ১৫ মিলিয়ন ডলার ছাড়াও ফিলিপাইন কর্তৃপক্ষ আরও ৫৪ মিলিয়ন ডলারের খোঁজ পেয়েছে। তবে বাকি ১২ মিলিয়ন ডলারের কোনো হদিস নেই।”

৩৩ দফা সময় নিল সিআইডি

গত তিন বছর তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির মামলায় তেমন কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় বুধবার আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রতিবেদনটি আগামী ২১ মে জমা দিতে বলেছে আদালত।

আদালতে নিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তা জালাল আহমেদ বেনারকে বলেন, “আজ ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সাব্বির ইয়াসিন চৌধুরীর আদালতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ চুরি প্রতিবেদন জমা দেয়ার কথা ছিল। কিন্তু সিআইডির পক্ষ থেকে কোনো কারণ ব্যাখ্যা না করে জানানো হয়েছে, তারা প্রতিবেদন শেষ করতে পারেনি।”

“আগামী ২১ মে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন জমার তারিখ নির্ধারণ করেছে আদালত।” জানিয়ে তিনি বলেন, “সিআইডি এপর্যন্ত কমপক্ষে ৩৩ বার সময় চেয়ে নিয়েছে।”

তথ্য দিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট দেশ

সিআইডির অতিরিক্ত উপ-মহাপরিদর্শক ও তদন্তদলের প্রধান শাহ আলম বুধবার বেনারকে জানান, বিদেশ থেকে হ্যাকারদের ব্যাপারে তথ্য না পাওয়ার কারণে তাঁরা তদন্ত শেষ করতে পারছেন না।

তিনি বলেন, “আমাদের সন্দেহ, হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে এই অর্থ চুরির মধ্যে ১১ দেশের নাগরিক জড়িত আছে। তাদের ব্যাপারে আমরা আট দেশের কাছ থেকে তথ্য চেয়েছি। এখন পর্যন্ত আট দেশের মধ্যে একটি দেশ আমাদের কাঙ্ক্ষিত তথ্য দিয়েছে।”

শাহ আলম জানান, ওই ১১টি দেশের মধ্যে তিনটি দেশের সাথে আলোচনার পর সিআইডি মনে করছে, ওদের কাছ থেকে আর কোনো তথ্যের প্রয়োজন নেই।

বাকি আট দেশের সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রদান চুক্তি রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “তাদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমরা দেশগুলোর নাম বলতে পারছি না।”

“আমরা বলতে পারছি না, কবে নাগাদ আমরা আমাদের প্রতিবেদন প্রস্তুত করতে পারব,” বলেন শাহ আলম।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন