Follow us

বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরি: ফিলিপাইনের আকস্মিক দায় অস্বীকার

ঢাকা থেকে জেসমিন পাপড়ি
2016-11-29
ই-মেইল করুন
মন্তব্য করুন
Share
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে রিজার্ভ চুরি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির প্রধান ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ। এপ্রিল ২০, ২০১৬।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে রিজার্ভ চুরি ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন কমিটির প্রধান ড. ফরাস উদ্দিন আহমেদ। এপ্রিল ২০, ২০১৬।
স্টার মেইল

রিজার্ভের অর্থ চুরির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতিকে দায়ী করে এ ঘটনার দায় নিতে অস্বীকার করেছে ফিলিপাইনের রিজাল কমার্শিয়াল ব্যাংকিং করপোরেশন (আরসিবিসি।

এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংককে কোনো অর্থ দেওয়ার পরিকল্পনাও তাদের নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে ব্যাংকটি।

মঙ্গলবার ব্যাংকটির আইনজীবী (কাউন্সেলর) থিয়া দায়েবের এক বিবৃতিকে উদ্ধৃত করে এমন খবর দিয়েছে রয়টার্স।

চুরি হওয়া রিজার্ভ উদ্ধারে বাংলাদেশের আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধিদলের ফিলিপাইন সফরের মধ্যেই এমন কথা জানালো আরসিবিসি। এরই মধ্যে দেশটির প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রতিনিধিদলের পূর্বনির্ধারিত বৈঠকও বাতিল হয়ে গেছে।

শুরু থেকেই চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পেতে বাংলাদেশকে সার্বিক সহযোগিতা দিয়ে আসা ফিলিপাইন, আকস্মিকভাবে ঘুরে যাওয়ায় কিছুটা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা।

তবে দায় চাপিয়ে নয়, আলোচনার মাধ্যমে টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করার পক্ষে মত দিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে রিজার্ভ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশের নিজস্ব তদন্ত ফলাফল প্রকাশ না করাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন আরসিবিসির ওই আইনজীবী। ওই প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় অসন্তোষ জানিয়েছে বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিও।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে সুইফট সিস্টেম ব্যবহার করে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের আট কোটি ১০ লাখ ডলার ফিলিপাইনের আরসিবিসি ব্যাংকের একটি শাখায় সরিয়ে নেয় অজ্ঞাত হ্যাকাররা। এই টাকার বড়ো একটি অংশ দেশটির জুয়ার আসরে ঢুকে পড়ে।

ওই রিজার্ভ চুরির ঘটনায় ‘উদ্দেশ্যমূলকভাবে অবহেলার’ অভিযোগ এনে আরসিবিসির চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলাও করেছে ফিলিপাইনের অ্যান্টি–মানি লন্ডারিং কাউন্সিল।

এদিকে চুরি যাওয়া অর্থের মধ্যে মাত্র দেড় কোটি ডলার নগদ ফেরত দিয়েছে ফিলিপাইন। বাকি ৬ কোটি ৫৮ লাখ ডলার উদ্ধারে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি।

সে বিষয়ে আলোচনা করতে ফিলিপাইন সফরে রয়েছে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল। আগামী ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশটির সরকারের বিভিন্ন প্রতিনিধিদের সঙ্গে তারা আলোচনা করবে।

দায় নিতে রাজি নয় আরসিবিসি

মঙ্গলবার দেওয়া এক বিবৃতিতে আরসিবিসি’র আইনজীবী থিয়া দায়েব বলেছেন, “নিজেদের অবহেলার কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরি গেছে। তাই বাংলাদেশ ব্যাংককে স্বচ্ছতা দেখানোর আহ্বান জানাচ্ছি।”

ফিলিপাইনের সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই ঘটনায় সহায়তার জন্য অনেক কিছু করেছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এখন বাংলাদেশ ব্যাংককেই খুঁজে বের করে দেখাতে হবে, কারা রিজার্ভের ওই অর্থ চুরি করেছে। এজন্য বাংলাদেশ নিজস্ব তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করুক।”

চুরি যাওয়া ওই অর্থ উদ্ধারের জন্য ফিলিপাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ অনায্যভাবে গণমাধ্যমকে ব্যবহার করে ফিলিপাইন সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে চাইছেন বলেও অভিযোগ করেছেন আরসিবিসির এই আইনজীবী।

আরসিবিসি’র কাছে ক্ষতিপূরণের অর্থ দাবি করা হবে বলে সম্প্রতি ফিলিপাইনের এক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন ম্যানিলায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত জন গোমেজ। এর পরেই এমন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ব্যাংকটি।

এ প্রসঙ্গে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান বেনারকে বলেন, “শুরু থেকেই ফিলিপাইন চুরি যাওয়া অর্থ ফেরত পেতে বাংলাদেশকে সহায়তা দিয়ে আসছে। এখন তাদের ঘুরে যাওয়াটা হতাশার।”

“তবে তাদের উপর কোনো ক্ষতিপূরণের দায় না চাপিয়ে আলোচনা ও সহযোগিতার মাধ্যমে বাকি টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালাতে হবে।”- যোগ করেন তিনি।

আরেক অর্থনীতিবিদ, মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বেনারকে বলেন, “সবার আগে খুঁজে বের করতে হবে টাকাটা কার কাছে গেছে। তিনি যদি ফিলিপাইনের বাসিন্দা হয়ে থাকেন, তাহলে সেদেশের আইনে ব্যবস্থা নিয়ে টাকাটা উদ্ধার করতে হবে। এরপরেই দেশটির কেন্দ্রিয় ব্যাংকের মাধ্যমে টাকাটা ফেরত আনা যাবে।”

তবে এর জন্য ফিলিপাইনের সহযোগিতা সবচেয়ে জরুরি বলে অভিমত দেন তিনি।

সংসদীয় কমিটিতে তদন্ত প্রতিবেদন উপস্থাপনের সুপারিশ

এদিকে রিজার্ভ চুরির ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় অসন্তোষ প্রকাশ করে সরকারি প্রতিষ্ঠান সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি শিগগিরই কেন্দ্রিয় ব্যাংককে তা সংসদীয় কমিটিতে উপস্থাপন করতে বলেছে। মঙ্গলবার কমিটির বৈঠকে এই সুপারিশ করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন কিছুদিন আগে এ সম্পর্কিত তদন্ত প্রতিবেদন অর্থমন্ত্রীর কাছে জমা দেন।

এ প্রসঙ্গে কমিটির সভাপতি শওকত আলী বেনারকে বলেন, “তদন্ত প্রতিবেদনটি অর্থমন্ত্রীর কাছে রয়েছে বলে জেনেছি। কিন্তু এটা সংসদ এবং সংসদীয় কমিটিরও দেখার নিয়ম রয়েছে। এজন্য প্রতিবেদনটি সংগ্রহ করে কমিটির পরবর্তি বৈঠকে উপস্থাপন করতে কেন্দ্রিয় ব্যাংককে বলা হয়েছে।”

গত ৩০ মে প্রতিবেদনটি জমা দেওয়ার পরে বারবার প্রকাশ করার কথা বলেও পরে তা থেকে বিরত থাকেন অর্থমন্ত্রী।

তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় রিজার্ভ চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ত থাকার সন্দেহ ঘণিভূত হচ্ছে বলে অভিমত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে মির্জ্জা আজিজ বেনারকে বলেন, “রিজার্ভ চুরির সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জড়িত- সে সন্দেহ সবসময় বিদ্যমান রয়েছে। এরই মধ্যে তদন্ত শেষ হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ না করায় সে সন্দেহ আরো ঘনিভূত হচ্ছে।”

এদিকে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তের সঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের পূর্বনির্ধারিত বৈঠক বাতিল হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের ওই প্রতিনিধি দলে রয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির, অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব ইউনুসুর রহমান। ফিলিপাইনের আইনমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, সিনেটের চেয়ারম্যান, গভর্নরের সঙ্গে প্রতিনিধি দলটির সাক্ষাৎ করার কথা রয়েছে।

পুর্ণাঙ্গ আকারে দেখুন